লালের আক্ষেপ, লালের প্রর্ত্যাবর্তন

১৫ এপ্রিল, ১৯৯২, ডিফেন্ডিং ইউরোপিয়ান কাপ (বর্তমান উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ) চ্যাম্পিয়নরা আন্দারলেচে গিয়েছে ১৯৯২ ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করতে। এক বছর আগে অলিম্পিক মার্শেইকে পেনাল্টি শুটাউটে হারিয়ে জিতেছিল ইউরোপের সবচেয়ে মর্যাদার শিরোপাটি, এবারো সেটা নিয়েই ফিরতে চায় তারা।

কিন্তু শেষপর্যন্ত তারা আর কখনো সেই ফাইনালে যেতে পারেনি, বেলজিয়ান ক্লাব আন্দারলেচের কাছে ৩-২ এ হেরে বিদায় নেয় রেড স্টার বেলগ্রেড। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন সাম্পোদোরিয়া ফাইনালে উঠে মুখোমুখি হয় বার্সেলোনার। বিদায়টা বেদনাদায়ক ছিল সন্দেহ নাই, কিন্তু কখনো কেউ ভাবেনি রেড স্টার বেলগ্রেড এত দ্রুত হারিয়ে যাবে ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতাগুলো থেকে।

গত সাত ডিসেম্বর রেড স্টার বেলগ্রেড এফসি কোলননকে নিজেদের মাঠে ১-০ গোল হারায় ফলে তারা আর্সেনালের পর দ্বিতীয় হয়ে গ্রুপ পর্ব শেষ করে। এরফলে ১৯৯১/৯২ মৌসুমের পর এই প্রথম তারা ক্রিসমাস পরবর্তি ফুটবল খেলবে, সেই আন্দারলেচের সাথে ম্যাচের পরও এই প্রথম, বছরের হিসেবে ২৬ বছর পর এই প্রথম খেলবে কোন ইউরোপীয় প্রতিযোগীর নাকাউট পর্বে।

সার্বিয়ান ভাষায় রেড স্টার বেলগ্রেডের নাম ‘Crvena zvezda’। ক্লাবটির উত্থান পতনের গল্প যেকোন ট্রেজিক কাহিনীকেও হার মানাতে পারে। যুগোস্লাভিয়ান যুদ্ধ এবং যুদ্ধ পরবর্তি দেশ ভাগ হয়ে যাওয়ার ফলে রেড স্টার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যখন ১৯৯১/৯২ মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে খেলতে যায়। যদিও, নিজেদের মাঠ ‘রাশকো মিটিচ স্টেডিয়াম’ (মারাকানাও নামে পরিচিত) এ খেলতে পারেনি।

সেবার তারা বুদাপেস্ট, সোফিয়া এবং যেগেদে নিজেদের হোম গেমগুলো খেলতে বাধ্য হয়। যুগোস্লাভিয়া ভেঙ্গে গেলে সার্বিয়া এবং মন্টিনিগ্রো মিলে তৈরি হয় ‘ফেডেরাল রিপাবলিক অফ যুগোস্লাভিয়া’। সার্বিয়া এবং মন্টেনিগ্রোতে ক্লাব ছিল শুধু একটাই, সাথে আরেকটা বসনিয়ান ক্লাব মিলে তৈরি হিয় সার্বিয়ান এবং মন্টেনিগ্রো লিগ।

যুগোস্লাভ থেকে বাকি যে রাষ্ট্র গুলো বের হয় তাদের লিগ গুলো ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় সরাসরি খেলতে পারলেও ‘ফেডেরাল রিপাবলিক অফ যুগোস্লাভিয়া’র দলগুলো মহাদেশীয় প্রতিযোগীতায় নিষিদ্ধ ছিল ১৯৯৫/৯৬ মৌসুন পর্যন্ত। অর্থাৎ ১৯৯২ এর পর রেড স্টার বেলগ্রেডের ইউরোপে ফেরার দরজা বন্ধ হয়ে যায় অন্তত চার বছরের জন্য।

১৯৯৬ তে রেড স্টার বেলগ্রেড নিজেদের লিগে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতা উয়েফা কাপে ফিরে আসে। কিন্তু ততদিনে ১৯৯১ তে ইউরোপীয় কাপ জয়ী দলের কেউই ছিলনা দলে। চার বছরে সার্বিয়ান ফুটবলের মানচিত্র বদলে যায়, সেই সাথে সুইস ক্লাব এর কাছে হেরে উয়েফা কাপের বাছাই পর্ব থেকেই বিদায় নেয় বেলগ্রেড।

ইউরোপিয়ান ফুটবলে তাদের অবস্থান ক্রমাগত নামতে থাকে। সেই সাথে লিগে আগের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীতা না থাকায় অর্থনৈতিকভাবেও দুর্বল হতে থাকে ক্লাব। এ অবস্থায় উঠতি প্লেয়ারদের ধরে রাখাও ক্লাবের জন্য অনেক কঠিণ কাজ হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে ক্লাবেরও টাকার প্রয়োজন, সাথে খেলোয়াড়দের আরো ভাল লিগে খেলার সুযোগ সব মিলে রেডস্টার দের উঠে দাড়াতে সময় লেগেছে অনেক।

শেষ পর্যন্ত অনেক চড়াই উতরাই পার হয়ে লীগে দ্বিতীয় হয়ে এবছত ইউরোপা লিগের কোয়ালিফায়ারের টিকেট পায়। সেখান থেকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। ইউরোপা লিগে কোয়ালিফাইতো হয়েছে, সেই সাথে আর্সেনাল, কোলন, বাতে বরিসভ সমৃদ্ধ গ্রুপ থেকে রানারাপ হয়ে উঠে যায় নকাউট পর্বে।

১৯৯১ এর ইউরোপিয়ান কাপ জয়ের সাথে ইউরোপা লিগের নকাউটে যাওয়াটা নগন্য অর্জন বলা চলে। কিন্তু ওই দলের প্রসিনেচকি, সিনিসা মিহাজলভিচ, সেভিসেভিচ, পানশেভ দের প্রতিভাবান প্লেয়ার দলে নেই। তাছাড়া প্রায় ২৬ বছর পর ইউরোপে খেলতে এসে নকাউটে উঠা অনেক বড় অর্জনই তাদের জন্য। এই দলের মূল শক্তি ডুই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার ভুজাদিন সেভিচ এবং বেবিচ, সাথে গোলকিপার মিলান বোরজান। পুরা ইউরোপা লিগের গ্রুপ পর্বে মাত্র দুই গোল হজম করেছে তারা। স্ট্রাইকার রিচমন্ড বোয়েইকও সঠিক সময়ে গোলের যোগান দিয়ে দলকে এগিয়ে নিয়েছেন।

এই খেলোয়াড়রা পূর্বসূরিদের মত কিংবদন্তি হয়ে উঠেননি এখনো, কিন্তু তাদের দুর্দান্ত ইউরোপ যাত্রা মারাকানার দর্শকরা মনে রাখবে। ২০০১/০২ আর ২০০৬/০৭ মৌসুমে তারা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সবচেয়ে কাছে গিয়েছিল, কিন্তু কোয়ালিফায়ারে পেয়েছিল যথাক্রমে লেভারকুসেন আর এসি মিলানকে।

হয়ত ধরে নেয়া হয়েছিল আর কখনোই ফেরা হবেনা ১৯৯১ এর চ্যাম্পিয়নদের, কিন্তু অবশেষে তারা ফিরে এসেছে ইউরোপে। এবার তারাও ক্রিসমাসের পর ফুটবল উপভোগ করবে। এই উত্থান পতন গল্পের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দিক হচ্ছে, এটি এখনো শেষ হয়ে যায়নি।

শুভকামনা ‘রেড স্টার বেলগ্রেড’, ইউরোপার নাকাউটে তারা প্রতিপক্ষ হিসেবে পেয়েছে সিএসকেএ মস্কোকে। এখন তাহলে সেই ম্যাচের অপেক্ষা করা যাক।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।