হাতুরুসিংহে নামক লাগামহীন ঘোড়াকে বশ করবে কে!

বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সমস্যা অবশ্যই মুশফিকের নেতৃত্ব নয়!

একটি সমস্যা অবশ্যই। বড় সমস্যাই। তবে সেটি নতুন কিছু নয়। এমন ক্যাপ্টেন্সি তার এই প্রথমবার নয়। দক্ষিণ আফ্রিকা বিপর্যয়ের দায় শুধুই মুশফিকের ক্যাপ্টেন্সির নয়।

মুশফিক বরাবর যে ধরণের ক্যাপ্টেন্সি করেন, এই সিরিজেও একইরকম ছিল। এমন নয় যে হুট করে ভয়াবহরকম বাজে হয়ে গেছে। মাঠে একটু প্রোঅ্যাক্টিভ থাকতে না পারা, বোলিং পরিবর্তন বা মাঠ সাজানোয় সৃষ্টিশীল ও উদ্ভাবনী হতে না পারা, প্রয়োজনের সময় দলকে উজ্জীবিত করতে না পারা, দলের মরতে থাকা শরীরী ভাষাকে তাজা করতে না পারা-এই সমস্যাগুলো তার শুরু থেকেই ছিল।

ঠিক এই সমস্যা গুলো নিয়েই ঠিক ২০১৪ সালে একদম পিনপয়েন্ট উদাহরণসহ লিখেছিলাম পত্রিকার পাতায়। তার পর এসব কথা আরও অনেকবার অনেকে বলেছেন, লিখেছেন। শুরুতে টেস্টে দলের অবস্থাই এতটা নাজুক ছিল যে নেতৃত্বের ঘাটতিটা ছাড় পেয়ে যেত অনেক সময়ই। দল টেস্টেও যখন ভালো করতে শুরু করলো, তখনও যখন তার অনফিল্ড ক্যাপ্টেন্সির ব্যাপারগুলো চোখে লাগতে থাকল, তখন সুস্পষ্ট হলো, তার ঘাটতি আসলেই বেশ।

দক্ষিণ আফ্রিকায়ও সেসব ছিল। তবে যেটা বললাম, তার ক্ষেত্রে এটাই স্বাভাবিক। নিজের বোলারদের দৃষ্টিকটু ভাবে একহাত নিয়েছে প্রকাশ্যে। সেই কাজও তিনি আগে করেছেন। এবার গোটা সিরিজে তাই নিজের মানদণ্ডে এমন বাজে কিছু ছিল না যে তার নেতৃত্বই ভয়াবহ কোনো বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

একটা কথা মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে উপমহাদেশের দলগুলির ভরাডুবি নতুন কিছু নয়। সব দলই হারে এবং বেশ বাজে ভাবে হারার নজীরও আছে অনেক। শচিন-শেবাগ-গম্ভীর-লক্ষণ-দ্রাবিড়কে নিয়ে ২০১০ সালে ইনিংসে হেরেছে ভারত। সবশেষ টেস্টেও পুজারা-কোহলি-রাহানেরা কোনোরকমে ইনিংস হার এড়িয়ে হেরেছে ১০ উইকেটে। সবশেষ টেস্টে পাকিস্তান হেরেছে ইনিংস ব্যবধানে। শ্রীলঙ্কা সফর করেছে এইতো গত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে। ৩ টেস্টে হেরেছে ২০৬ রানে, ২৪২ রানে, ইনিংস ও ১১৮ রানে। বাংলাদেশের বিপর্যয়টা তাই মহাবিস্ময় হওয়া উচিত নয়।

বিস্ময়কর বলা যায় টস জয়ের পর সিদ্ধান্ত। যেটিতে মুশফিকের সমালোচনা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু সিদ্ধান্ত যে তার একার ছিল না, সেটা তো ওপেন সিক্রেট। আগেও লিখেছি, প্রথম টেস্টে সিদ্ধান্ত মুশি-কোচ, কারও ছিল না। টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানরাই আগে ব্যাট করতে অস্বস্তি বোধ করেছে। তারপর অধিনায়ক জোর করেন কিভাবে? দ্বিতীয় টেস্টের কারণটি এখনও জানি না। তবে মুশির একার সিদ্ধান্ত নয়, এটা বুঝতে ভেতরের খবর অনুসন্ধান করতে হয় না।

ব্যাটিং বিপর্যয়ের কারণ অনেক আছে। তবে মোটা দাগে বললে, দলে জায়গা সেটেলড, এমন ব্যাটসম্যান প্রথম টেস্টের ব্যাটিং লাইন আপে ছিলেন মাত্র দুজন (তামিম-মুশি)। দ্বিতীয় টেস্টে শুধু মুশি। বাকি সবারই কোনো না কোনো ইস্যু ছিল। এই ব্যাটিং লাইন আপের ভেঙে পড়া অস্বাভাবিক নয়।

ইস্যুওয়ালা ব্যাটসম্যানদের ইস্যুগুলো কে তৈরি করেছে? মুশি অবশ্যই নয়। কেন তারা দলে সেটেলড নয় বা হতে পারেনি বা পারছে না? দায় দিতে হয় কোচকে, তাই নয় কি?

আবারও বলছি, মুশির সমস্যা সবই পুরোনো, নতুন কিছু নয়। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চা-বিরতির সময় যখন বলা হলো পরের সেশনে তামিম ক্যাপ্টেন্সি করবে, ওই টেস্টের পরই মুশির সরে দাঁড়ানো উচিত ছিল। বোর্ড প্রেসিডেন্ট যখন প্রকাশ্যে বলেন, ‘সমস্যা মুশফিকের…’, তার পর মুশির সরে দাঁড়ানো উচিত ছিল। কেন তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন এবং নিজের ওপর দিন দিন এত বেশি চাপ নিচ্ছেন, সেটা তিনিই ভালো বলতে পারবেন।

এই সিরিজে যেটিতে মুশির বেশি সমালোচনা হচ্ছে এবং হওয়া উচিত, সেটি হলো মিডিয়ার সামনে লাগামহীন কথাবার্তা। একজন অধিনায়ক এভাবে বলতে পারেন না। প্রকাশ্যে এর-ওর ওপর দায় চাপাতে পারেন না। তার আবেগ বেশি, তার প্রচণ্ড অভিমান-একজন টেস্ট ক্যাপ্টেনের জন্য যেসব থাকা হারাম। কিন্তু এটাও ভাবা উচিত, একজন অধিনায়ক কখন প্রকাশ্যে এসব বলেন? কতটা অসহায় হলে প্রকাশ্যে বলেন যে তার ফিল্ডিং পজিশনও কোচ ঠিক করে দেন!

আরও একবার বলছি, ড্রেসিং রুমের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা কোচের কাছ থেকে আদায় করা কিংবা নিজের অথোরিটি প্রতিষ্ঠা করা, এসব মুশি পারেননি। তবে এসব তো পুরোনো। নতুন হলো, তিনি প্রকাশ্যে কোচদের নিয়ে বলছেন। তার মানে কি? ওই ড্রেসি রুমের আবহ, হাওয়া ভালো নেই। তার মানে এই ড্রেসিং রুমে দমবন্ধ করা পরিবেশ। তাই প্রেস কনফারেন্সে অধিনায়ক দম ছাড়েন।

এটির দায় কার? মুশির যতটা দায়, তার চেয়ে বেশি দায় কি হাতুরুসিংহের নয়? অভিভাবক তো তিনিই! দুই টেস্টেই যে দলকে একদম ছন্নছাড়াও মনমরা মনে হলো, মাঠে একদমই ছাড়া ছাড়া সবাই, লড়াইয়ের ইচ্ছেই যেন নেই–এটির দায় যদি আমি ড্রেসিংরুমের দমবন্ধ আবহাওয়াকে দেই?

এজন্যই বলছি, শুধু অধিনায়ক বদলে লাভ নেই। কোচকেও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এই সিরিজের পর মুশির অধিনায়ক থাকা বা তাকে রাখার আর কোনো মানে নেই। কিন্তু মুশিকে বদলালেই যে ভোজভাজির মত টেস্টের সব বদলে যাবে, এটা আশা করাও ভুল হবে। টেস্টে একজন মাশরাফি নেই, হাথুরুসিংহে নামক লাগামহীন ঘোড়াকে বশ করার কেউ নেই।

নেতৃত্ব বদলানোর পাশাপাশি তাই কোচকেও নিয়ন্ত্রণ করা জরুরী। আমি যতবার কোচের সমালোচনা করি, একবারও বলিনি তাকে বাদ দিতে। সবসময়ই বলেছি লাগাম পরাতে। কাউকে বিদায় করা সহজ। কিন্তু বিদায় করে দেওয়ার চেয়ে সবসময়ই ভালো সমাধান হলো তার ভালো দিকটা সর্বোচ্চ কাজে লাগানো, খারাপটা নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু দিন দিন আরও বেশি স্বাধীনতায় আরও বেশি লাগামহীন হচ্ছেন কোচ। শুধু মুশি কেন, বিসিবি কর্তাদের তৈরি এই ফ্রাংকেস্টাইনে পিষ্ট হতে পারেন যে দলের কেউ।

বাংলাদেশের ক্রিকেটে একজন মুশির অবদান হাতুরুর চেয়ে অনেক অনেক বেশি। মুশির ওপর কোপ পড়লে তাই যেন হাতুরু ক্রমশ বাড়ন্ত পাখাও কেটে দেওয়া হয়। নইলে মুশি লাউ, তামিম বা সাকিব কদুই থাকবেন। কিংবা ব্যক্তিত্বের সংঘাতে হতে পারে আরও ভয়াবহ কিছু।

– ফেসবুক থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।