রোবট সোফিয়া ও বিজ্ঞানের আশির্বাদ বনাম অভিশাপ

১.

‘টার্মিনেটর টু’ সিনেমাটার নাম প্রথম যখন শোনা হয় তখন সম্ভবত আমি ক্লাস এইটে পড়ি। বাংলাদেশী ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’ তে এটা কিভাবে তৈরী করা হয়েছিল সেটা নিয়ে একটা প্রতিবেদন করা হয়েছিল। সেখান থেকেই আকৃষ্ট হয়েছিলাম সিনেমাটা দেখার বিষয়ে।

তখন সিনেমা সেভাবে দেখা হতো না, ইংরেজি সিনেমাতো আরো না। মাঝে মাঝে বিটিভি তে মুভি অফ দি উইকে কিছু সিনেমা দেখাটাই ছিল সম্বল। বাসায় বলার পর এর ভিডিও ক্যাসেট মামা কিনে নিয়ে আসলো, প্রথমে নিজে একা একা দেখে নিল যে সিনেমাটা আমাদের বয়সীদের দেখতে কোন সমস্যা আছে কিনা। যখন দেখলো সমস্যা নেই তখন আমরা দেখলাম।

সত্যি কথা হচ্ছে প্রথম বার দেখার পর সিনেমাটা বুঝি নি। না বুঝলেও অ্যাকশন কিংবা গ্রাফিক্সের জন্য সিনেমাটা ভালো লেগেছিল। নিজেদের ক্যাসেট থাকার কারণে প্রায় সময়েই সিনেমাটা দেখতাম।

আশ্চর্য হলেও সত্য যে সিনেমাটা পুরোপুরি বুঝতে পারি আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর। মাঝে প্রায় পাচ বছর সময় চলে গিয়েছে। এর মাঝে প্রায় ২০/২২ বার সিনেমাটা দেখাও হয়েছে। কিন্তু এতবার দেখার পরেও বুঝিনি যে বাচ্চাটাকে বাচানোর জন্য আর্নল্ড পৃথিবীতে এসেছিল সেই বাচ্চাটাই আসলে ভবিষ্যত থেকে আর্নল্ডকে পাঠিয়েছে তাকে রক্ষা করার জন্য। ভবিষ্যত থেকে রোবটের দল পাঠিয়েছিল এক ভিলেনকে যে কিনা বাচ্চাটাকে মারতে চায়। সায়েন্স ফিকশন যারা না পড়েছে তাদের কাছে বিষয়টা জটিল।

পুরো বিষয়টা বুঝতে পারার পর সিনেমাটা আরো অসাধারণ লেগেছিল। ততদিনে সায়েন্স ফিকশন পড়া শুরু করে দিয়েছি। সেবা প্রকাশনীর অনুবাদ, জাফর ইকবালের ফিকশন কিংবা হুমায়ুন আহমেদের ফিকশন সব শেষ। ইন্টারে ওঠার পর ধরলাম আজিমভ, আর্থার সি ক্লার্ক। অল্প কয়েকটা উপন্যাস পড়া হয়েছে এদের। খুব বেশী টানেনি আমাকে, মূল কারণ অনুবাদের অদক্ষতা।

পরবর্তীতে ঐতিহ্য প্রকাশনী থেকে চেস্টা করা হয়েছিল কিন্তু সেই অনুবাদ গুলোও ভালো লাগেনি।

সায়েন্স ফিকশনের ক্ষেত্রে তাই বই পড়া বাদ দিয়ে মুভি দেখাটাই ভালো মনে করলাম। মোটামুটি এক থেকে দেড় ঘন্টায় সব কিছু বুঝে ফেলা যায়। সায়েন্স ফিকশনে আমার দেখা সেরা মুভি সম্ভবত ‘আই রোবট’। এছাড়া ‘ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে’ সিনেমাটাও ভাল লেগেছিল।

সায়েন্স ফিকশন সিনেমা গুলোতেই পড়া হয়েছিল যে মানুষের জায়গা একসময় দখল করবে রোবট। এক সময় এই রোবটেরা বিদ্রোহ করার কারণে মানব জাতি ধংস হতে থাকবে কিংবা হুমকির সম্মুখিন হবে। জাফর ইকবাল স্যারের অনেক লেখা এই বিষয়েই।

আমাদের প্রজন্ম প্রযুক্তির অগ্রগতিটা বেশ ভালো ভাবে দেখেছে। আমি নিজেই একসময় ৭০০ টাকা দিয়ে সিডি ক্যাসেট কিনেছি। সেই সিডি একসময় কেনা হয়েছে ৩৫ টাকায়। এখনতো সর্বশেষ কবে সিডি কিনেছি সেটাই মনে নেই। সব কিছু ইন্টারনেটেই পেয়ে যাচ্ছি।

প্রযুক্তির এই অগ্রগতির কারণে একটা সময় মানুষ রুপী রোবট আসবে সেটাও জানা ছিল, কিন্তু সেটা এত তাড়াতাড়ি এসে পড়বে সেটা ভাবিনি।

২০১৭ সালে ‘সোফিয়া’ র আগমনে তাই একটু অবাকই হলাম।

২.

সোফিয়া আসার আগেই আমরা জানি যে মানুষ অনেক আগ থেকেই আসলে যন্ত্রের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এক সময় মানুষ যে যোগ বিয়োগ করার জন্য নিজের মাথা ব্যবহার করতো এখন সেটা অনেক সহজেই ক্যালকুলেটরের মাধ্যমে করে ফেলছে। এতে বাহ্যিক ভাবে মানুষের সময় বেচে যাচ্ছে, কিন্তু ক্ষতি টা হচ্ছে বেশির ভাগ মানুষই নিজের মেধাটা ব্যবহার করতে ভুলে যাচ্ছে।

কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতিটাকেও আপনি ঠেকাতে পারবেন না। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে কিনা প্রোডাকশন হচ্ছে শুধুমাত্র রোবট দিয়ে। মনে করুন আপনি গার্মেন্টস বানাতে চাচ্ছেন। রোবট দিয়ে প্রোগ্রাম করে দিলে স্বয়ংক্রিয় ভাবে কাজগুলো হয়ে যাবে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে রোবটদের কাজ করার জন্য বিদ্যূতেরও প্রয়োজন পড়ছে না। রোবটরা রাতের আধারেও চোখে দেখতে পায় কিংবা তাদের সেভাবেই প্রোগ্রাম করা হয়েছে।

স্বাভাবিক ভাবেই একজন মানুষের চেয়ে বেশি দক্ষভাবে কাজ করতে পারবে একটা রোবট। আপনি আপনার বাসায় কাজের লোক রাখার জন্য যে টাকা ব্যয় করবেন সেই কাজ যদি একটা রোবটকে দিয়েই করাতে পারেন তাহলে স্বাভাবিক ভাবে একটা রোবটকেই রাখবেন।

সেই মূহুর্তে কর্মক্ষেত্রে মানুষের চাহিদা ধীরে ধীরে কমতে থাকবে।

তবে সমস্যা কিন্তু এগুলো নয়। যেহেতু রোবটের নিজস্বতা বলতে কিছু নেই তাই তাদেরকে যেভাবে প্রোগ্রাম করা হবে ঠিক সেভাবেই কাজ করবে। এই কারণে একজন রোবটকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো অনুভূতি সম্পন্ন যন্ত্র বানানো যেমন সম্ভব, ঠিক তেমনিভাবে সবচেয়ে ভয়ংকর অনুভূতির বানানোও সম্ভব।

সায়েন্স ফিকশন গল্পের সব কিছু যেহেতু আস্তে আস্তে বাস্তবে পরিণত হচ্ছে কাজেই একটা সময় দেখা যাবে মানুষ আর রোবটের মাঝে পার্থক্য খুব সীমিত হয়ে যাচ্ছে। খুব দক্ষ মানুষ ছাড়া এই পার্থক্য ধরা যাবে না।

আস্তে আস্তে একসময় আর্মিতেও রোবট এসে যাবে। যে দেশের যত বেশি টাকা তারা সামরিক বাহিনীতে ততটা শক্তিশালী হবে।

এবং আশংকা সত্য হলে একটা সময় টার্মিনেটর টু সিনেমার মতো অবস্থাই আমাদের হবে। যে মানুষ যন্ত্র আবিস্কার করছে তাদেরকেই হয়তো একসময় নিয়ন্ত্রণ করবে তাদের হাতে তৈরী এই যন্ত্রই।

‘বিজ্ঞান – আশির্বাদ নাকি অভিশাপ’ – ছোটবেলায় এই রচনা অনেক পড়া হয়েছে।

আশির্বাদের অংশটুকু তো অনেক দেখা হয়েই গিয়েছে, প্রযুক্তি যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে বেচে থাকতে থাকতে অভিশাপের অংশটুকুও হয়তো দেখা হয়েই যাবে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।