রেখা নামের রহস্য, না বিতর্ক!

রূপালী জগতে পা রাখার ইচ্ছে বা পরিকল্পনা কোনটাই ছিল না তাঁর। প্রচলিত নায়িকাদের মত ফর্শা ছিলেন না। তবে, তিনি ভাঙতে পেয়েছিলেন স্টেরিওটাইপ ধারণাকে। মোহময়তা আর আবেদন দিয়ে তিনি বলিউডে ছড়িয়েছিলেন আশ্চর্য এক মাদকতা।

পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল না থাকায় শৈশবেই স্কুল ত্যাগ করেন, এবং ১৯৬৬ সালে ‘রাঙ্গোলা রত্নাম’ নামের একটি তেলেগু ছবির মধ্য দিয়ে শিশুশিল্পী হিসেবে প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। চলচ্চিত্রে এসে ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে এমনভাবে রূপান্তরিত করেন যে, তা সত্যিই নতুনদের জন্য অনুকরণীয়।

আরেকটা কথা জানিয়ে রাখি, বলিউড তথা গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্রে ‘ডিভা’ শব্দটির প্রচলন হয় মূলত তার কারণেই। এবার বরং তার নামটা জেনে নেয়া যাক, তিনি হচ্ছেন বলিউডের চিরসবুজ আবেদনময়ী অভিনেত্রী—রেখা।

১৯৫৪ সালে ভারতের চেন্নাইয়ে জন্মগ্রহণ করা এই অভিনেত্রীর পারিবারিক নাম ভানুরেখা গণেশন, তবে তিনি ‘রেখা’ নামেই সমধিক পরিচিত। বাবা জেমিনি গণেশন ছিলেন তামিল সিনেমার জনপ্রিয় নায়ক। মা তেলেগু অভিনেত্রী পুষ্পাবলী। তা সত্ত্বেও বলিউডের এই সফল ‘ডিভা’র শৈশবটা আর দশটা শিশুর মত সুখকর ছিল না।

ছোটবেলায়ই তিনি জানতে পারেন, তার মা-বাবার বিয়ে হয়নি। তাই সমাজের প্রথাগত হিসেব-নিকেশে তার জন্মটাও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। তাছাড়া জন্মের পর তার পিতা তাকে মেনে নেননি। পিতৃপরিচয় তাঁকে বরাবরই অপমানিত করেছে। পুরো শৈশবজুড়েই তিনি জানতেনও না তাঁর বাবা কে! সেই ধাক্কা সামলে ওঠতে বেশ সময় লাগে তার। স্কুলে সহপাঠীদের সঙ্গে প্রয়োজন না হলে খুব একটা কথা বলতে চাইতেন না। প্রায় সময় একা একা থাকতেন।

শিশুশিল্পী হিসেবে কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করলেও নায়িকা হিসেবে আবির্ভাব ১৯৬৯ সালে। কান্নাডা ফিল্ম ‘গোয়াদাল্লি সিআইডি- ৯৯৯’ তে অভিনয়ের মাধ্যমে। এরপর বলিউডে পা রাখেন মাত্র ১৫ বছর বয়সে। প্রথম হিন্দি ছবি ‘আনজানা সাফার’-এর শুটিং সেটে এসেই নানাভাবে লাঞ্ছনা ও হেনস্থার শিকার হয়েছেন।

প্রথম দৃশ্যটি ছিল একটি চুম্বন দৃশ্যের, যা তিনি আগে থেকে জানতেন না। জোরপূর্বক এ দৃশ্যটি ধারণ করেছিলেন পরিচালক কুলজিৎ পাল। শোনা যায়, ক্যামেরা চালু হতে না হতেই নায়ক বিশ্বজিৎ জাপটে ধরেন তরুণী রেখাকে এবং চুমু দেন। যা অল্প বয়সী রেখার জন্য বেশ অস্বস্তিকর ছিল।

প্রথম দিকে নায়িকা হিসেবে খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি তিনি। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে অভিনেত্রী হিসেবে সবার নজর কাড়তে সক্ষম হন। বিশেষ করে, ১৯৭৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দো আনজানে’ সিনেমায় অমিতাভের সঙ্গে তার অনবদ্য অভিনয় তাকে ইন্ডাস্ট্রির প্রথম সারির নায়িকার তকমা এনে দেয়।

এই জুটির রাসায়ন বলিউডে নতুন আলোড়নের সূচনা করে। এরপর একে একে ‘মুকাদ্দর কা সিকান্দার’ ‘খুন-পাসিনা’ ‘সুহাগ’ ‘মিস্টার নটবরলাল’ ও ‘সিলসিলা’-সহ বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় ছবিতে তারা জুটিবদ্ধ হয়ে স্কিন শেয়ার করেছেন। এরই মধ্যে বিনোদ মেহরার বিপরীতে ১৯৭৮ সালে  মুক্তি পায় ‘ঘর’ নামক একটি সিনেমা। যা নিয়ে পুরো ভারতে প্রচুর শোরগোল হয়, এ সিনেমায় ধর্ষিতা নারীর চরিত্রে তার অভিনয় ব্যাপক প্রশংসিত হয় এবং বক্স অফিসেও বাজিমাত করে।

প্রায় ৪০ বছরের ক্যারিয়ারে ১৮০ টির অধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন এই কিংবদন্তি অভিনেত্রী। আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ছবি হলো—‘আলাপ’ ‘ঈমান ধরম’ ‘গঙ্গা কি সুগন্ধ’ ‘সোহাগ রাম বলরাম’ ‘খুবসুরাত’ ‘বসিরা’ ‘উৎসব’ ‘খুন ভারি মাং’ ‘ইজাজাত’ ‘কামসূত্র’ এবং ‘জুবায়দা’ ইত্যাদি। স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন তিনবার ফিল্মফেয়ার এওয়ার্ড। এবং ১৯৮২ সালে ‘উমরাও জান’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কারও জেতেন।

লাস্যময়ী এ নায়িকার বাইরের জীবনটাও যেন পর্দার মতই রোমাঞ্চকর, এবং রহস্যময়! এক সময় তাকে বলা হত বলিউডের সেক্স সিম্বল। তার মায়াবী হাসি, সিক্ত রক্তাভ ঠোঁট, নীল চোখের মায়াবী আবেদন কিংবা শিহরণ জাগানো রূপের ইন্দ্রজালে আমজনতা থেকে শুরু করে বলিউড সুপারস্টার, কে-ইবা ডুব দেননি? যিনি ৫২ বছর বয়সেও আইটেম গানের পারফর্মার! তার রূপে নেশায় মজে ছিলেন জিতেন্দ্র, ধর্মেন্দ্র, সুনীল দত্ত ও বলিউডের দীর্ঘকায় সুদর্শন পুরুষ অমিতাভ বচ্চনও। সত্তরের দশক থেকে শুরু করে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সবাই তার রূপের সুধা পান করছে আসছে!

ক্যারিয়ারের তুঙ্গে থাকাকালীন সময়ে মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির পুরুষশাসিত মনোভাবেরও শিকার হয়েছিলেন রেখা। ‘ম্যান-ইটার’ ‘নিম্ফোম্যানিয়াক’ ‘সেক্স কিটেন’-সহ আরও কত শত নেতিবাচক নামে তাকে আখ্যায়িত করা হত, হিসেব নেই। ইতোমধ্যে তার বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে জীবনীগ্রন্থ ‘রেখা: দ্য আনটোল্ড স্টোরি’।

রেখার জীবনের সবচেয়ে আলোচ্য অধ্যায় হল অমিতাভ বচ্চনের সাথে তার প্রণয়োপাখ্যান। বলা হয়ে থাকে, ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম সেরা রোমান্টিক জুটি অমিতাভ-রেখা। যাই হোক, রূপালি পর্দায় এই জুটির সোনালি দিন পেরিয়ে গেছে বহুকাল আগেই। কিন্তু তাদের অসামান্য পর্দা-রসায়ন কিংবা বাস্তবের প্রেমের সম্পর্কের সেই শাশ্বত আবেদন আজও এতটুকু মলিন হয়ে যায়নি।

জানা যায়, ১৯৭৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দো আনজানে’ ছবিতে প্রথমবারের মত একসঙ্গে কাজ করেন অভিতাভ-রেখা। শরীরের মেদ ঝরিয়ে এই সিনেমার মধ্যদিয়ে রেখা সম্পূর্ণ নতুন অবতারে হাজির হয়েছিলেন। রোমান্টিক ঘরানার এ ছবির শুটিং সেটেই রেখাকে দেখে ফিদা হয়ে যান বিগ বি। অথচ, রেখার প্রেমে হাবুডুবু খাওয়ার কয়েক বছর আগেই আরেক বলিউড অভিনেত্রী জয়া ভাদুড়ির সাথে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন সত্তরের দশকের এই ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’।

এরপর, ১৯৭৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘গঙ্গা কি সুগন্ধ’ ছবির শুটিং সেটে প্রোডাকশনের এক লোকের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন অমিতাভ বচ্চন। খবর রটেছিল, প্রোডাকশনের ওই সদস্য নাকি রেখার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করলে তার গায়ে হাত তুলেতে দ্বিধা করেননি অমিতাভ। ওই সময়ের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাঁদের প্রেম নিয়ে অহরহ গুঞ্জনের ডালপালা ছড়াতে শুরু করেছিল। প্রচলিত আছে, মাঝেমধ্যে নাকি হঠাৎ কাউকে কিছু না বলে ছবির সেট থেকে উধাও হয়ে যেতেন তাঁরা।

১৯৮২ সাল মুক্তি পায় পায় এই জুটির শেষ সিনেমা ‘সিলসিলা’। সুপার ডুপার হিট এ ছবি পর থেকে আর কোন ছবিতেই একসঙ্গে দেখা মেলেনি এই দুই মহারথীর। তবুও এই সিনেমায় তাদের সম্পর্কের যে রসায়ন দেখা গেছে, তা আসলে দুজনের মধ্যকার গভীর এক বাস্তব প্রেমেরই প্রতিফলন—এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই!

অমিতাভের স্ত্রী জয়া বচ্চন এই সম্পর্ককে কখনোই ভাল চোখে দেখেতেন না। রেখাকে একবার সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, কোন অবস্থাতেই স্বামীকে ছেড়ে যাবেন না তিনি। এর পর থেকেই মূলত তাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। অমিতাভও ঘর সামলাতে সব গুজবের পাশ কাটিয়ে অনেকটা দূরে সরে আসেন।

বিগ বি’র সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তার বিয়ে নিয়ে বেশ কয়েকটি গুঞ্জন ওঠে, কিন্তু সবগুলো গুঞ্জনই থেকে যায়। ১৯৭৩ সালে খবর রটে রেখা অভিনেতা বিনোদ মেহরাকে বিয়ে করেছেন। কিন্তু ২০০৪ সালের এক সাক্ষাতকারে এই অভিনেত্রী বিনোদকে বিয়ে করার কথা নাকচ করে দেন।

অবশেষে সব কল্পনা জল্পনা পেরিয়ে ১৯৯০ সালে দিল্লীর বিখ্যাত ব্যবসায়ী মুকেশ আগরওয়ালের সঙ্গে হঠাৎ করে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন রহস্যময়ী রেখা। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো বিয়ের এক বছর হতে না হতেই মুকেশ আত্মহত্যা করেন। এবং সুইসাইড নোট লিখে যান, আত্মহত্যার পেছনে কারও দোষ নেই।

কিংবদন্তিতুল্য এই অভিনেত্রীর জন্ম ১৯৫৪ সালের ১০ অক্টোবার। জীবনের এতগুলো বসন্ত কাটিয়ে ফেললেও, তার মোহনীয়-জাদুকরী রূপ ও ব্যক্তিত্ব দেখে আপাত পক্ষে বোঝার উপায় নেই যে বয়স বাড়ছে না কমছে! অজস্র শুভকামনা তাঁর জন্য।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।