রুনি মানেই রেড ডেভিলদের প্রতাপ

খেলার জগতে ফুটবল একটি আকর্ষণীয় চুম্বক। যুগে যুগে কালের পরিক্রমায় সেখানে  নানা কিংবদন্তী ছড়িয়েছেন ভালবাসার সৌরভ। একটি আপাদমস্তক দলগত খেলায় ফুলের সৌন্দর্য ছড়ান এই খেলোয়াড়েরাই।

খেলোয়াড়ের পায়ের কারিশমা কারুকার্য দেখে আপনি আমি শুরু করি কোনো একটি দল সমর্থন করা শুরু হয় সেই দলের সঙ্গে এক অবিরাম পথচলার, যেখানে রয়ে যায় অনেক আবেগ ভালবাসা, শুরু হয় বিতর্ক নিজের দলকে সেরা প্রমাণের অদম্য ইচ্ছা।

কিছু কিছু খেলোয়াড় যেন হয়ে ওঠেন তার খেলোয়াড়ী সত্ত্বার চেয়েও বেশি কিছু হয়ে ওঠেন পরিবারের একজন। তাদের প্রতি আবেগ ভালবাসার কমতি হয় না কখনই, দুঃসময়েও না আর সুসময়ে তো প্রশ্নই ওঠে না।

সেই ভালবাসার পরশ নিয়েই একজন এসেছিলেন লন্ডনের থিয়েটার অব ড্রিমস খ্যাত ফুটবল ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে। যুব বয়সে লিভারপুলের যুব দলে ক্যারিয়ার শুরু করা রুনি পরে লিভারপুলকে ভুগিয়েছেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই। ফুটবলে পেশগতভাবে শুরুটা করেছিলেন মার্সিসাইড ক্লাব এভারটনে। দু’বছর সেখানে কাটানোর পর চোখে পড়ে যান স্যার অ্যালেক্স ফারগুসনের।

পাকা জহুরি ফারগুসন ভুল করেননি ইউনাইটেডের ভবিষ্যৎকে বেছে নিতে। ১৮ বছর বয়সে ২০০৪ সালের আগস্ট মাসে এসেছিলেন ড্রিমস অফ থিয়েটারকে মাতাতে। এনার্জেটিক টেকনিক্যাল স্কিলে স্ট্রাইকার হিসেবে বেশিরভাগ সময়ই ছিলেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের অন্য দলগুলোর ত্রাস হয়ে।

সবসময়ই ছিলেন রেড ডেভিলদের জন্য অন্যতম ভরসা আর অন্য দলগুলোর জন্য সাক্ষাৎ ডেভিল! বাইসাইকেল কিক দূরপাল্লার শটে যেন নাভিশ্বাস তুলতেন গোলরক্ষকদের জন্য। বড় ম্যাচে সবসময়ই  ছিলেন অন্যতম ভরসার প্রতীক হয়ে।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে প্রায় সম্ভাব্য সব ট্রফিই জিতেছেন সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক। ২৫.৬ মিলিয়ন ইউরো ট্রান্সফার ফিতে ইউনাইটেডে আসা রুনি ২০০৪ থেকে ২০১৭ – এই ১৩ বছরে জিতেছেন প্রিমিয়ার লিগ পাঁচবার, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ একবার, ফিফা ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপ একবার, এফএ কমিউনিটি শিল্ড চারবার, ফুটবল লিগ কাপ তিনবার, এফএ কাপ একবার ও উয়েফা ইউরোপা লিগ একবার।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে ববি চার্লটনকে ছাড়িয়ে করেছেন সর্বোচ্চ ২৫৩ গোল, প্রিমিয়ার লিগে করেছেন ১৮৩ গোল, পেশাগত ক্যারিয়ারে মোট গোলের সংখ্যা ২৭০। ক্যারিয়ারে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে বড় দল গুলোর মধ্যে বেশি গোল করেছেন আর্সেনাল ও চেলসির বিপক্ষে। রোনালদো তেভেজকে সাথে নিয়ে গড়েছিলেন মূর্তিমান ট্রায়ো।

ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে অবশ্য কিছু জিততে পারেননি। জাতীয় দলের হয়ে গোল করেছেন ৫৩ টি সর্বোচ্চ অর্জন ইউরোর সেমিফাইনাল খেলা। ২০১৩ সালে বিবিসির সাক্ষাৎকারে  ইব্রাহিমোভিচ তার পছন্দের ইংলিশ প্লেয়ার হিসেবে রুনি সম্পর্কে বলেন, ‘আমার কাছে সে প্রতি মৌসুমে ৪০ গোল করা খেলোয়াড় নয় কিন্তু সে তার সতীর্থদের দিয়ে প্রচুর গোল করানোতে পারদর্শী। সেজন্য আমি তার পাশে খেলতে চাই।’

শুরুটা স্ট্রাইকার হিসেবে করলেও বিভিন্ন সময় খেলেছিলেন আক্রমণভাগের বিভিন্ন জায়গায়। এমনকি ভ্যান গালের আমলে তাকে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডের ভূমিকাতেও  দেখা গেছে। বাইসাইকেল কিকটা ছিল তার ট্রেডমার্ক সেই কিকে দারুণ সব গোলে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করেছেন।

‘সাদা পেলে’ তকমা পাওয়া এই কিছুটা রগচটা এই কিংবদন্তিই একমাত্র ফুটবলার যিনি কখনে স্যার ফারগুসনের রোষানলে পড়েননি, যে স্যার আলেক্সের ধমকানো সমন্ধে নিশ্চয়ই কারও অজানা নেই। সেই ওয়েইন রুনি ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ছিল একটি অবিচ্ছেদ্য নাম ।

হ্যা, ‘ছিল’ বলতে হচ্ছে কারণ গত নয় জুলাই রুনি অফিশিয়ালি আবার ফিরে গেছেন তার শৈশবের ক্লাব এভারটনে। হয়তো এটা একসময় হওয়ারই ছিল কিন্তু রুনি খেলবেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে সেটা যেন তার শত্রুর চোখেও ঘোর লাগায়।

সেই ১৮ বছর বয়সেই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে কলি থেকে ফুল ফোটা সমর্থকদের ‘ওয়াজ্জা’ বিদায় নিলেন তাদের মনে রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে। প্রিমিয়ার লিগে যখন এভারটনের হয়ে ইউনাইটেডের বিপক্ষে ওল্ড ট্রাফোর্ডে খেলতে নামবেন স্মৃতির পাতায় কি আবেগাপ্লুত হবেন না ওয়াজ্জা? কি করে খেলবেন ইউনাইটেডের বিপক্ষে? ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জালে শট নেয়ার সময় কি একবারের জন্যও স্মৃতিভ্রম হবে না?

যদি গোলটা পেয়েই যান কর্নার ফ্লাগের দিকে গিয়ে কি জবাব দিবেন তার প্রিয় দর্শকদের উদ্দেশ্যে? হয়তো যাবেনই না। চোখের কোণে চিক চিক করবে একবিন্দু জল। আবারও ইউনাইটেড সতীর্থদের ভালবাসায় সিক্ত হবেন  তার ওল্ড ট্রাফোর্ডের প্রিয় সবুজ মাঠে।

কারণ, যে ভালবাসার জোরে তিনি লালের প্রতীক হয়ে ছিলেন  সেটার জোরেই তিনি  আজীবন সেই প্রতীক বহন করবেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড সমর্থকদের মনে, তা তিনি যেখানেই থাকুন না কেন। থিয়েটার অব ড্রিমসের অন্যতম সেরা অস্ত্রটি যে কেড়ে নিয়েছিলেন অফুরন্ত ভালবাসা, মাতিয়ে রেখেছিলেন থিয়েটারের রঙ্গমঞ্চ।

তাই তো তিনি যাওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সমথর্করা দিন গুনছে আবারো তার ফিরে আসার, হয়তো অন্য আঙ্গিকে নতুন কোনো ভূমিকায়। শিশুরা যেমন মায়ের কোলে সুন্দর তেমনি রুনির সৌন্দর্যও ছড়ায় একমাত্র ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড শিবিরেই।

অনেক অনেক শুভ কামনা রেড ডেভিল ‘ওয়াজ্জা’। যেখানেই থাকুন না কেন আপনি আমি সবাই জানি রুনি মানেই ১০ নম্বর লাল জার্সি, রুনি মানেই বাইসাইকেল কিকে রেড ডেভিলদের দোর্দন্ড প্রতাপ, কোনো ইতিহাসবিদের সাধ্য নেই সেটাকে যুক্তি দিয়ে ভুল প্রমাণ করা!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।