রুনা লায়লার স্মৃতির পাতায় বলিউড

রুনা লায়লা – উপমহাদেশের কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী। জন্ম ১৯৫২ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে, অধুনা বাংলাদেশের সিলেট। বাবা-মার ইচ্ছে ছিলো মেয়ে নামকরা নৃত্যশিল্পী হবেন। তাই ছোটবেলায় তিনি একটি নাচের স্কুলে ‘কত্থক’ ও ‘ভরত নাট্যম’ শিখেছিলেন। কিন্তু গানের জগতে পদচারণা— যেনো অনেকটা ভাগ্যক্রমেই হয়ে গেলো।

তার ভাষায়, ‘আমার বড় বোন দীনা ক্লাসিক্যাল মিউজিকের তালিম নিতেন, আমি আসলে ওই সুযোগটা লুফে নিয়েছি। চুপি চুপি আশপাশে ঘুরঘুর করে তার সঙ্গে সুর তোলার চেষ্টা করতাম। যাই হোক, কিছুদিন পর তার ওস্তাদ আমাকেও গান শেখানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।’

রুনা লায়লা যেন হারিয়ে গেলেন সেই সব দিনগুলোতে। বলতে লাগলেন, ‘আমার বাবা সৈয়দ মুহম্মদ ইমদাদ আলী ছিলেন করাচির ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা। আমি আর আমার বোন সেখানকার একটা স্কুলে যেতাম। ইন্টার স্কুল মিউজিক কম্পিটিশনে দীনাকে ওই স্কুলের প্রতিনিধি হিসেবে বাছাই করা হলো। কিন্তু প্রতিযোগিতার আগে হঠাৎ করে দীনার গলা ব্যথা শুরু হলে মা আমাকে তাৎক্ষণাত তার পরিবর্তে অংশগ্রহণ করতে বলেন। ঘটনাক্রমে প্রতিযোগিতায় আমি প্রথম হয়ে যাই। তিন বছর পরও লোকজন আমার ভয়েস মনে রাখলো, এবং আমি পাকিস্তানি ফিল্ম ‘জুগনু’তে দুটি গান গাওয়ার সুযোগ পেয়ে গেলাম।’

তার প্রথম গান ‘গুড়িয়াসি মুন্নি মেরি ভাইয়া কি পেয়ারি’ তারই সমবয়সী এক শিশুর লিপে ব্যবহার করা হয়। এরপরেরটা স্যাড সঙ ‘মরনা ভি নাহি আসান’। তিনি বলেন— ‘আমার মা-বাবা আসলে মোটেই নিশ্চিত হতে পারছিলেন না যে, মাত্র ১২ বছর বয়সের এতটুকুন একটি মেয়ে রোমান্টিক গান করতে পারবে। গানটি গাওয়ার সময় পরিচালক আমাকে কান্নার ভাব করে গাইতে বলেছিলেন, কিন্তু আমি সত্যিকার অর্থেই কান্না শুরু করে দিয়েছিলাম!’

বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সঙ্গীত প্রতিভাধর আশোক খান্নার এক পার্টিতে রুনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় সঙ্গীত পরিচালক জয়দেবের, তার মাধ্যমেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্লেব্যাকে যাত্রা শুরু। তিনি বলেন— ‘জয়দেবজি আমাকে ওনার দলে টেনে নিলেন, এবং সব ধরনের গান গাওয়ার সুযোগ দিলেন। এমনকি (ভারতের জাতীয় টেলিভিশন) ‘দূরদর্শনে’ও গাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। আমার এখনো ওই উপলক্ষটি স্মরণ আছে, হেমন্ত কুমার কিছু গান গেয়েছিলেন, দিলীপ সাহেব (কুমার) কবিতা আবৃত্তি করেছেন… আমি এমন অদম্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেছি।’

ডুয়েট গানে তার সহ-শিল্পী ভূপিন্দর সিংয়ের কথাও স্মরণ করতে ভুললেন না প্রখ্যাত এ কণ্ঠশিল্পী। তিনি বলেন, ‘সে খুব কোমলভাষী এবং লাজুক স্বভাবের। তা সত্ত্বেও সে মাইকে বেশ আলোড়ন তুলতে পারতো। মিউজিকই ছিলো তার একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান। আর জয়দেবজি-এর কম্পোজিশন মোটেও সহজ ছিলো না। তাই আমরা লাইভ সঙ্গীতশিল্পীদের সাথে রেকর্ডে অভ্যস্ত ছিলাম। আর সবসময় ভয়ে থাকতাম যে, আমি শেষ লাইনে একটি ভুল করবো এবং এটি আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হবে।’

হিন্দি সিনেমায় তার প্রথম রেকর্ডিং ছিল কল্যাণজি-আনন্দজির সুরে ‘এক সে বড়কার এক’ সিনেমার টাইটেল সঙ। তার রেকর্ডিংয়ের সময় আশির্বাদ দেয়ার জন্য উপস্থিত ছিলেন লতা মুঙ্গেশকর। তার ভাষায়— ‘এটা ছিলো সত্য স্বপ্নের মতো, যখন লতা দিদি আসলেন, এবং আমাকে ফুলের তোড়া দিয়ে আশির্বাদ করলেন। এর চেয়ে ভাল সূচনা আর কী হতে পারে।’

শিল্প-সংস্কৃতিকে সাম্প্রদায়িকীকরণের লক্ষ্যে সম্প্রতি ভারতে বিদেশি শিল্পীদের বিরুদ্ধে এক ধরণের শোরগোল শুরু হয়েছে। কিন্তু তার সাথে এমনটা কখনোই ঘটেনি জানিয়ে রুনা বলেন, ‘আমি এখানে প্রথম আসি ১৯৭৪ সালে। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনসের (আইসিসিআর) আমন্ত্রণে। দিল্লি, মুম্বাই ও কলকাতা তিনটি অনুষ্ঠান করেছিলাম। আমার এখানে কিছু নেই, তবে আছে লোকেদের জন্য অজস্র ভালোবাসা। আমার কখনো এটা মনে হয়নি যে, আমি অন্য দেশে এসেছি।’

তিনি আরও জানালেন, তার প্রথম ট্যুরেই লতার মুঙ্গেশকরের সাক্ষাৎ পেয়েছেন। বললেন, ‘লতা দিদির সাথে দেখা করার ব্যাপারটা ছিলো আমার কাছে দীর্ঘদিনের উচ্চাভিলাষের মতো। মুম্বাইয়ে শান মুখআনন্দ হলের ব্যাক স্টেজের দরোজা দিয়ে তিনি আমার রিহার্সেলে ঢুকলেন। তাকে দেখে আমি যার পর নাই বিস্মিত হয়েছিলাম। তিনি আমাকে দেখেই জড়িয়ে ধরেছিলেন।’

কানাঘুষা আছে, লতা ও আশা ভোসলে – এই দুই বোনের ‘কারসাজি’তে কারণেই বলিউডে নিয়মিত হতে পারেননি রুনা। যদিও, এই কথা হেসেই উড়িয়ে দিলেন তিনি, ‘ওই সময়টার কথা চিন্তা করুন। ভারতে গিয়ে সেই আমলে নিয়মিত গান করা সহজ ছিল না। ওখানে নিয়মিত হতে হলে মুম্বাইয়ে স্থায়ী হতে হত। আমি বাংলাদেশ একেবারে ছাড়তে চাইনি।’

বাপ্পি লাহিড়ীর সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো। লন্ডনে বাপ্পিদা রুনার ভয়েসে ‘সুপারুনা’ নামে একটি পপ অ্যালবাম বের করেন। অ্যালবামটি অভাবনীয় সাফল্যও পেয়েছিলো। এ সঙ্গীতশিল্পী স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলতে লাগলেন, ‘দ্য বিটলস খ্যাত এবি রোড স্টুডিওতে আমরা অ্যালবামটির কাজ করেছি। সম্ভবত আমরাই উপমহাদেশের প্রথম, যারা এটা করতে পেরেছে। এটি একটি চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা ছিলো। গানগুলি অসম্ভব জনপ্রিয় এবং আমি এখনো বিভিন্ন শো-তে এগুলো গেয়ে থাকি।’

গানগুলো প্রকৃতপক্ষে এতোটাই জনপ্রিয় ছিলো যে, বাপ্পি লাহিড়ী ১৯৮৪ সালে ‘দে দে পেয়ার দে’ গানটি ‘শারাবি’ ছবিতে ব্যবহার করে ছিলেন।’ এরপর ১৯৮৫ সালে ‘ঘরদুয়ার’ সিনেমায় রুনার বিখ্যাত গান ‘মেরা বাবু ছেল ছাবিলা’ গানটি প্রকাশ পায়। মূলত এটা ছিল উর্দু একটা সিনেমায় ব্যবহৃত গান। সেই গানটা এখনো ভারতের সিনেমার ইতিহাসে ‘এভারগ্রিন’ একটি গান হিসেবে প্রশংসিত হয়। এরপর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে অমিতাভ বচ্চনের বিখ্যাত সিনেমা ‘অগ্নিপথ’-এ ও জিতেন্দ্র’র ‘সাপনো কা মান্দির’ সিনেমায় গান গান রুনা লায়লা।

ক্যারিয়ারের শুরুতে লাইভ রেকর্ডিংয়ে তার বিশেষ ভীতি ছিলো, এমনটা তিনি বলেছিলেন। অথচ, এটা বিস্ময়কর যে তিনি একদিনে বেশি সংখ্যক গান রেকর্ডিংয়ের জন্যই বিশ্বরেকর্ড গড়েন! মুম্বাইয়ের একটি প্রতিষ্ঠান রুনাকে দিয়ে নিসার বাজমির সুরে প্রতিদিন ১০টি করে তিন দিনে মোট ৩০টি গান রেকর্ড করান। আর এ ঘটনাটি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডে নাম লেখায়। রুনা লায়লা বলেন, ‘মিউজিকে আমার শিক্ষক মেহেদী সাহেবের বড় ভাই ওস্তাদ গোলাম কাদির। তিনি আমাকে কিছু সেরা গজল গাওয়ার সুযোগ দিয়েছেন।’

বেশ কিছুদিন হলো তার মা আমেনা লায়লা প্রয়াত হয়েছেন, যার অনুপস্থিতি তিনি এখনও পুরোপুরিভাবে কাটিয়ে ওঠতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘টিভি শো ‘সুরক্ষেত্র’-এর দুবাইয়ে শুটিং শুরু হওয়ার মুহূর্তেই ওটা ঘটেছিলো। গজেন্দ্র সিং এটা জানার পর আমাকে বললেন— আপাতত শুটিং দরকার নেই। বনিজি (বনি কাপুর, টিভি শোর প্রডিউসার) গভীর সমবেদনা প্রকাশ করলেন, এবং বললেন, যখন তুমি প্রস্তুত হবে তখন শুটিং হবে। সবাই খুবই ভালো এবং সাপোর্টিভ ছিলো, যেটা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।’

বর্তমানে এই কিংবদন্তির জীবন আবর্তিত হচ্ছে স্বামী আলমগীর, মেয়ে তানি এবং দুই নাতি জাইন ইসলাম ও অ্যারন ইসলামকে ঘিরে। জাইন ভালো ফুটবল খেলে, তাকে নিয়ে তিনি খুব উচ্ছোসিত। সম্প্রতি সে ফুটবল ক্লাব আর্সেনালের এক ক্যাম্পের জন্য মনোনীত হয়। তিনি বলেন, ‘জাইন সত্যিই ভালো খেলে। এভাবে যদি সাফল্যর ধারা অব্যাহত রাখতে পারে, তাহলে সে বড় হয়ে ওদের ক্লাবে খেলতে পারবে।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘মেয়ে তানিও আশীর্বাদপুষ্ট গায়ক। কিন্তু ও গানকে প্রফেশনাল হিসেবে নেয়নি। আমার নাতি দুজনও ভালো গান করে। একদিন আমি গুণগুণ করে কিছু একটা গাইতে ছিলাম, তখন ছোট একজন বলে উঠলেন – আমি নাকি সুর থেকে বেরিয়ে গেছি! তার মা ধমক দিয়ে তাকে থামিয়ে দিলেন। কিন্তু সে সঠিকই বলছিলো। আমি গানটা ভালো করে জানতাম না, এলোমেলোভাবে গাচ্ছিলাম। আর এতোটুকু বয়সে ভুল ধরে ফেলা – আসলেই আশ্চর্যজনক ছিলো।’

রুনার জন্ম পূর্ব পাকিস্তানে, শিক্ষা-দীক্ষা পশ্চিম পাকিস্তানে, ১৯৭১ সালের পর সেটেল হয়েছেন বাংলাদেশে। কাজ করেছেন ভারত এবং শো-এর জন্য ঘুরে বেড়িয়েছেন বিশ্বের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। কিন্তু তিনি মূলত কোথাকার? এমনটা জানতে চাওয়া হলেও তিনি বলেন, ‘আর্টিস্টরা হচ্ছেন বাতাসের মতো। আমাদের নির্দিষ্ট কোনো বাসস্থান কিংবা শেকড় নেই। আর নির্দিষ্ট কোনো গণ্ডির ভেতর আমাদের আবদ্ধ করাটা বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। যারা আমাদের এবং আমাদের শিল্প-কর্মকে গ্রহণ করে, আমরা আসলে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আমি নিজেকে ছিন্নমূল ভাবি না, আমি বরং পুরো বিশ্বেরই অন্তর্গত।’

ফিল্মফেয়ার অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।