রিয়েল লাভ || ছোটগল্প

মেয়েটা আগে অনেক খারাপ ছিলো। খারাপ মানে খুবই খারাপ। ফালতু মেয়ে একটা। রাত প্রায় দুটো তিনটা পর্যন্ত জেগে আমার সাথে ফোনে বকবক করতো। নিজে তো ঘুমাতোই না, এমনকি আমাকেও ঘুমাতে দিত না। প্রায় সারাদিনই চ্যাট হতো। আমি যদি বলতাম, ‘এখন খাইতে যাবো, বাই’, তাতে ও রেগে যেত। বলতো, ‘আরেকটু কথা বলো প্লিজ। একদিন না খেলে কিছু হয় না।’

মোটকথা ওর জন্য আমার লাইফ টোটাল এলোমেলো হয়ে গেছিলো। ঠিকমতো খাওয়া, ঘুম, গোসল, লেখাপড়া কিচ্ছু হচ্ছিলো না। সবকিছু ধ্বংস হয়ে যেতে বসেছিলো।

আমি জানি সেটা ও সহ্য করতে পারেনি বলেই নিজেকে খুব কম সময়ের মধ্যে চেঞ্জ করে ফেলেছে। আমি জানি সেটা শুধুমাত্র আমার জন্য।

মাত্র অল্প কদিন পরের কথা। এখন সেই খারাপ মেয়ে এতোটা ভালো হয়ে গেছে দেখলে আশ্চর্য হই। হুট করে এতো ভালো একটা মানুষ কিভাবে হতে পারে? এখন সে রাত দশটা বাজতেই ঘুমিয়ে পড়ে। এমনকি তার এতো ঘুম আসে যে ফোনের ডাটা পর্যন্ত অফ করতে ভুলে যায়। এজন্য সারারাত অনলাইনে দেখায় তাকে। ফেসবুকের এই এক বাজে নিয়ম। মানুষ না থাকলেও শুধুমাত্র ডাটা কানেশন অন থাকার জন্য একজনের নামের পাশে সবুজ বাতি জ্বলে। ফেসবুক তো আর বোঝেনা যে মানুষটা তখন গভীর ঘুমে।

এছাড়াও আমার অনেক বেশি খেয়াল রাখে। ফোন দিলে দুই মিনিট কথা বলতে না বলতেই বলে, ‘তুমি এখন খাইতে যাও। গোসলে যাও। অনেক রাত হইছে তুমি ঘুমাও।’

এগুলা বলে জোর করে আমাকে দিয়ে ফোন রাখিয়ে ছাড়ে। আহা! আমার এতো ভালো লাগে, বলে বোঝানোর মতন না। মেয়েটা আমাকে কত্তো ভালোবাসে। কেয়ার নেয়। আমার কথা কত ভাবে!

এমনকি সে এখন আমার এতোই ভালো চায় যে নিজেকেই আমার যোগ্য ভাবে না আর। একজন প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষীর মতন বলে, ‘তুমি আমার চাইতে বেটার মেয়ে ডিজার্ভ করো।’

আমি আমতা আমতা করে বলার চেষ্টা করি যে, ‘না তুমিই ঠিক আছো।’

কিন্তু ও রাজি হয় না। ও আমার জন্য জগতের বেস্ট মেয়েটাকেই চায়। জানি সেটা প্রচন্ড ভালোবাসে বলেই!

তারপর একদিন আমাকে অবাক করে দিয়ে নিজের লাইফের খুব বড় একটা সেক্রিফাইস করে ও। শুধু আমার জন্য। আমি যেটা কখনো ভাবতেও পারিনি।

আমার এক মেডিকেলে পড়ুয়া ছেলের সাথে গ্যাঞ্জাম ছিলো বিশেষ কিছু কারণে। ছেলেটাকে দুই চোখে দেখতে পারতাম না। ও গিয়ে তার সাথেই প্রেম করা শুরু করে। আমি বুঝতে পারি ও আসলে চাচ্ছে ছেলেটার লাইফটা এলোমেলো করে দিতে। আমার সাথে ছেলেটা যে খারাপ ব্যবহার করেছে তার প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছে। কিন্তু ঐ ছেলে যাতে কোনোভাবে টের না পায় যে মেয়ে আসলে আমাকে ভালোবাসে এজন্য সিকিউরিটি হিসাবে আমাকে ব্লক করে দিয়েছে। আমার ফোনও ধরেনা। আমি বন্ধুর নাম্বার থেকে কল দিয়ে দেখি রাত দুটো তিনটে অব্দি ছেলেটার ফোন আর ওর ফোন দুটোই বিজি থাকে। ও ছেলেটাকে না ঘুমাতে দিয়ে কষ্ট দিচ্ছে। প্রতিশোধ নিচ্ছে।

মনে পড়ে, আমি একবার বলেছিলাম, ‘বিজ্ঞানীদের মতে বেশি রাত জাগলে অকাল মৃত্যুর ঝুকি বাড়ে।’ সেই ঝুকি ও আমার শত্রুকে শিক্ষা দেয়ার জন্য নিজের কাধেও নিচ্ছে। আহা! কি ভীষণ স্যাক্রিফাইস। এটা বুঝি শুধু ভালোবাসার ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়!

আমার নিজেকে অনেক সুখি মনে হয়। আমি বুঝতে পারি দুনিয়ার সবাই যে রিয়েল লাভের পেছনে ছুটে বেড়ায় এটাই সেই রিয়েল লাভ। এটাকেই বলে প্রকৃত ভালোবাসা!

বন্ধুরা আমাকে নিয়ে অনেক হাসাহাসি করে। বলে আমি নাকি গাধা। আমি নাকি বোকার স্বর্গে বাস করছি। কিন্তু আমি বুঝতে পারি ওরা আসলে জেলাস। নিজেরা কখনো এরকম রিয়েল লাভ পায়নি বলেই আমাকে হিংসা করছে। আমি সব বুঝি। ওদের গার্লফ্রেন্ডরা ওদের দিয়ে গিফট কেনায়, ওদের টাকায় রেস্টুরেন্টে খায় আর আমার গার্লফ্রেন্ড গিফট বা রেস্টুরেন্টে খাওয়ার জন্য আমার শত্রুকে দিয়ে টাকা খরচ করায়। এটা ওদের সহ্য হয় না। ওদের প্রেমভাগ্য তো আর আমার মত ভালো না।

এজন্য কিছু না পেরে বোকার মত হাসাহাসি করে। আমার ভালোবাসা নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলে, যার অধিকাংশই অশ্লীল। তবে আমি কিছু মনে করিনা। ওরা বড্ড অবুঝ। একদিন ওরা এই ভালোবাসার মর্ম বুঝতে পারবে বলে আশা করতে পারি শুধু।

তারপর একদিন আমার কথাই সত্যি হয়। সেই মেডিকেলের পোলা আমারে ফোন দিয়ে বলে, ‘ভাই আমি স্যরি। যা হইছে ভুলে যান। আর আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন পারলে।’

আমি মনে মনে হাসি। কেমন শিক্ষা দিলো আমার প্রেমিকা, হুম? অবস্থা বেশি খারাপ? আহারে, বেচারা! মুখে বলি, ‘ব্যাপার না, ইটস ওকে। আমি আগেই ভুলে গেছি সব।’

পোলা আমতা আমতা করে বলে, ‘আমরা আগামী মাসের তের তারিখে বিয়ে করছি। দোয়া করবেন।’

আমার এক মুহুর্তের মধ্যে মনে কুচিন্তা জাগে। আমার রিয়েল লাভ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। এক মুহুর্তের জন্য মনে হয়, তাহলে আমার ফ্রেন্ডরা কি সত্যি বলছিলো?

পরক্ষণেই বুঝতে পারি আমি ঐ ছেলেকে মুখে ক্ষমা করলেও আসলে মন থেকে ক্ষমা করতে পারিনি। আর মনের কথা আমার প্রেমিকা তো বুঝতে পারবেই। এজন্য ও ছেলেটাকে আরো শাস্তি দেয়ার জন্য বিয়েই করে ফেলতেছে। এইবার পোলা বুঝবে আসল মজা। হু হু! আমার সাথে বেয়াদবি।

আমি আরো শিওর হই যখন খবর পাই ওরা হানিমুনে সুইজারল্যান্ড যাচ্ছে। সুইজারল্যান্ডে যে শীত। বরফও পড়ে শুনেছি। পোলার একেবারে হালুয়া টাইট হয়ে যাবে এবার। হাহাহা!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।