নায়ক নাকি খলনায়ক: রহস্যময় একজন সাঞ্জু বাবা

১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ, একের পর এক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে ভারতের বাণিজ্যিক ও বিনোদন নগরীখ্যাত তৎকালীন বোম্বে শহর। একযোগে প্রায় ১৩টি বোমা বিস্ফোরণে চিরতরে বদলে গেলো শহরের স্বাভাবিক চেহারা। চোখের পলকেই গুঁড়িয়ে গেলো বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ। দক্ষিণের এয়ার ইন্ডিয়া ভবন থেকে পশ্চিমের সি রক হোটেল পর্যন্ত চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল এক মুহূর্তেই। ভারতে জঙ্গিবাদের উত্থান ও সাম্প্রদায়িক এই হামলায় যে বিষয়টি সবাইকে সবচেয়ে বেশি স্তব্ধ করে দিয়েছিল, তা হলো বলিউডের রঙিন ঝলমলে দুনিয়ার একজন মানুষের সম্পৃক্ততা। তিনি হলেন সঞ্জয় দত্ত।

সঞ্জয় দত্ত— ডাক নাম সাঞ্জু। ভক্তরা আদর করে ডাকেন সাঞ্জু বাবা। তিনি একাধারে অভিনেতা, প্রযোজক, রম্য-অভিনেতা, সমাজসেবক ও টিভি উপস্থাপক। রূপালি পর্দায় ‘নায়ক’ – ‘খলনায়ক’ দুই চরিত্রেই বেশ জনপ্রিয়। চার দশক ধরে নিজের বাস্তব জীবনের নানান চড়াই-উৎরাইয়ের পাশাপাশি অ্যাকশন, রোমান্টিক, কমেডি সব ঘরানার সিনেমাতেই সমান পারদর্শীতা দেখিয়েছেন। ‘খলনায়ক’ ‘বাস্তব’ ‘শুটআউট অ্যাট লোখান্ডওয়ালা’ থেকে শুরু করে ‘মুন্নাভাই এমবিবিএস’ ‘পরিণীতা’ ‘লাগে রাহো মুন্নাভাই’ কিংবা ‘অগ্নিপথ’র মতো অসংখ্য সিনেমা তার ঝাঁপিতে রয়েছে।

বলিউডের প্রখ্যাত তারকা সুনীল দত্ত ও নার্গিসের ছোট পুত্র তিনি। বাবা সুনীল শুধু একজন বড় অভিনেতাই ছিলেন না, বরং একজন সৎ রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবকও ছিলেন। মা নার্গিসকে বলা যায়, বলিউডের সর্বকালের সেরাদের একজন। ‘মাদার ইন্ডিয়া’ তে তার অসাধারণ অভিনয় সিনেমাপ্রেমীদের মনে আজও সাড়া জাগায়। যাই হোক, ছোটবেলা থেকে বলিউডি পরিবেশে বেড়ে উঠতে থাকে সঞ্জয়।

জানা যায়, যৌবনের শুরুর দিকে টিনা মুনিম নামে এক অখ্যাত অভিনেত্রীর প্রেমে পড়েন তিনি; কিন্তু প্রেমে ব্যর্থ হলে জীবনে প্রথমবারের মতো বড়সড় একটা ধাক্কা খান। কিছুদিন পর মা নার্গিস ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ব্যর্থ প্রেমের যন্ত্রণা আর মৃত্যুশোক— সবমিলিয়ে একেবারে ভেঙে পড়েন আবেগপ্রবণ সঞ্জু। সব যন্ত্রণা ভুলে থাকতে এক সময় তিনি নেশার অতল গহ্বরে হারিয়ে যান। বাবা সুনীল দত্তের সঙ্গেও কিছুটা দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। এ সবকিছুই সঞ্জয়কে আস্তে আস্তে ঠেলে নিয়ে যায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের দোরগোড়ায়।

ওই সময় মুম্বাইভিত্তিক আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে বড় ত্রাস ছিলেন ডন দাউদ ইব্রাহিম। সঞ্জয়ের এই ‘ব্যাড বয়’ ইমেজটি তার নজরে আসে। গুঞ্জন আছে, ১৯৯১ সালে ‘ইয়ালগার’ ছবির কাজে দুবাই গিয়েছিলেন সঞ্জয়। দাউদের নির্দেশে এই ৩১ বছরের যুবকটির সঙ্গে দেখা করেন দাউদের ছোট ভাই আনিস ইব্রাহিম, আর এভাবেই ধীরে ধীরে মদের আসরে দাউদ-সঞ্জয় সম্পর্কটা গড়ে ওঠে।

পরবর্তীতে, ১৯৯৩ সালের মুম্বাই-অ্যাটাকের পেছনে ভারতীয় অপরাধজগতের মদদ ছিল বলে রিপোর্ট দেয় সিবিআই। মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিম নাকি ছিলো সবকিছুর মূল হোতা। ফলে, বেশ ভালো বিপাকে পড়ে যান সঞ্জয় দত্ত। তাছাড়া, ওই সময় তার কাছে একটি নাইনএমএম পিস্তল ও একে-৪৭ রাইফেল পাওয়া যায়।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়; তিনি ওই সময় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করেছিলেন দাউদ ইব্রাহিমের ভাই আনিস ইব্রাহিমের কাছ থেকে, এবং হামলাতেও এই আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এদিকে, বাবা সুনীল যখন জানলেন যে, তার ছেলেকে পুলিশ হন্য হয়ে খুঁজছে, তখন তিনি পুলিশ স্টেশনে বলেন, ‘সঞ্জয় আজ রাতেই মরিশাস থেকে ফিরবেন।’ প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে এয়ারপোর্ট থেকে গ্রেপ্তার করে তাকে হাজতে নিয়ে আসা হয়। পুলিশি জেরার মুখে সবই অকপটে খুলে বলেন সঞ্জয়।

এখন কথা হলো, সঞ্জয়ের এসব আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহের কারণটা কী ছিল? মুম্বাই হামলার সাথে সঞ্জয়ের কি আসলেই কোনো যোগসূত্র ছিল? নাকি, নিজের নিরাপত্তার স্বার্থেই আগ্নেয়াস্ত্র নিয়েছিলেন তিনি?

তদন্তে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি বেরিয়ে আসে তা হলো, তার বাবা সুনীল দত্ত ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন, এবং মুসলিমপ্রীতির কারণে ততদিনে দত্ত পরিবার উগ্র হিন্দুবাদীদের টার্গেটে পরিণত হয়ে গিয়েছিলো। সুতরাং হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার কারণে নিজের পরিবারকে বাঁচাতেই তিনি ওই অস্ত্রটি কিনেছিলেন।

এরপর ১৯৯৪ সালে তার বিরুদ্ধে টাডা (টেররিস্ট অ্যান্ড ডিজরাপ্টিভ অ্যাক্টিভিটিজ প্রিভেনশন অ্যাক্ট) আইনে মামলা দায়ের করে মুম্বাই পুলিশ। আদালত বোমা হামলার সঙ্গে সঞ্জুর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পায়নি। তারপরও কেবল অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়েই তাকে পাঁচ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়। আর এই ব্যাপারটিকে মানতে পারেননি অনেকেই।

১৯৯৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৪ মাস জেলে কাটানোর পর তার জামিনের আবেদন করা হয়। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সাংসদ অভিনেতা শত্রুঘ্ন সিনহা সঞ্জয়কে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য পার্লামেন্টে আবেদন জানান। এবং তিনি ওই সময় বলেন ‘আমি বিশ্বাস করি, সঞ্জয় দোষী নয়।’

যাই হোক, পরবর্তী দুই দশকে এই মামলায় সঞ্জয়কে আরও তিন দফায় কারাবরণ করতে হয়েছে। এছাড়াও, মামলার শুনানি ও পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের কারণে প্রায়ই আদলতে যেতে হয়েছে।

২০০৬ সালে টাডা কোর্টের চুড়ান্ত রায়ে সঞ্জয়কে অবৈধ অস্ত্র রাখায় ৬ বছর কারাদন্ড দেয়া হয়। এরপর, ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট টাডা কোর্টের দেয়া ওই ৬ বছরের সাজাকে ১ বছর কমিয়ে ৫ বছর করেন। রায়ের বিরুদ্ধে সঞ্জয়ের আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলেও রায়ের পরিবর্তন হয়নি।

আদালত রায় ঘোষণার পর বলিউডের সকল তারকা, পরিচালক, প্রযোজক সঞ্জুবাবাকে সান্তনা দিতে এসেছিলো। অভিনেতা সালমান খান আর অজয় দেবগান তো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সঞ্জয় জেলে থাকাকালীন তারা ভাবী আর বাচ্চাদের দেখাশোনা করবেন। গণমাধ্যম কর্মীরা সঞ্জুর ভাষ্য শোনার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সঞ্জয় আসলেন শোকার্ত এবং ভেজা চোখে। বললেন, ‘আমি বিগত বিশ বছর ধরে প্রতিনিয়ত শাস্তি পেয়েই যাচ্ছি, ১৮ মাস জেল খেটেছি। তারা যদি আমাকে আরো কষ্ট দিতে চায়, তবে আমাকে আরও শক্ত হতে হবে। আজ আমার হৃদয় ভেঙে গেছে, কারণ আমার সঙ্গে আমার স্ত্রী এবং তিন সন্তানও এই শাস্তির ভুক্তভোগী। আমাকে তাদের কথা ভেবে শক্ত থাকতে হবে।’

কোর্টের দেওয়া ৫ বছর কারাদন্ডের ১৮ মাস তিনি আগে জেলে কাটিয়েছেন। সুতরাং তাকে আরও তিন বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়। অবশেষে ‘ভালো আচরণে’র কারণে সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার আট মাস আগেই গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে পুনের ইয়েরওয়াড়া কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।

৫৮ বছর বয়সী এই অভিনেতা কারাগার থেকে বেরিয়েই পুনে বিমানবন্দরে গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘বন্ধুরা, মুক্তির কোনো সহজ পথ নেই।’ মুম্বাইয়ের নিজ বাড়িতেও সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমি সন্ত্রাসী নই। অস্ত্র আইনে আমার কারাদণ্ড হয়েছিল। আমার অনুরোধ, আমাকে ১৯৯৩ সালের মুম্বাইয়ের হামলায় অভিযুক্ত বলবেন না।’

ভারতের বুকে সবচেয়ে বিধ্বংসী জঙ্গী হামলার সঙ্গে যার নাম জড়িয়ে আছে, তিনি জেল থেকে বেরোনোর পর যে পরিমাণে অভ্যর্থনা পাচ্ছেন, তা রীতিমতো এলাহী ব্যাপার-স্যাপারর। তার বিখ্যাত মুন্নাভাই সিরিজের পরিচালক রাজকুমার হিরানি বলেন, ‘আজ আমার জন্য ভীষণ এক খুশির দিন, সঞ্জয়ের সঙ্গে আরো লম্বা ইনিংস খেলার জন্য আমি মুখিয়ে আছি।’

পরিচালক সুভাষ ঘাই সঞ্জয় সম্পর্কে বলেন ‘কারাবাসের দিনগুলো সঞ্জয় দত্তকে আগুনে পুড়িয়ে শুদ্ধ করে তুলেছে। আজ সারা দেশ কেন এত খুশি সেটা বোঝার চেষ্টা করুন। কারণ সবাই জানে সঞ্জয় ভীষণ ভাল মানুষ, দারুণ এক অভিনেতা। বন্ধুর জন্য, পরিবারের জন্য সব সময় ঝাঁপিয়ে পড়ে।’

আর, এই ব্যাপারে সবাই একমত যে, সঞ্জয় দত্ত আসলে পরিস্থিতির শিকার এবং বিগত ২০ বছরে তিনি অনেক যন্ত্রণা সহ্য করেছেন। প্রযোজক-পরিচালক মহেশ ভাট বলেন, ‘আমি একজন মানুষকে দেখতে পাচ্ছি, যে তার দুঃস্বপ্ন থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। সঞ্জয় নিজের দুঃস্বপ্নের কারাগারে আটকা পড়েছে, যতই চেষ্টা করুক না কেন সেখান থেকে সে সহজ মুক্তি পাবে না। সুখ তাকে শুধু দুঃখ দেওয়ার জন্যই আসে। আসলে সাঞ্জুর জীবনে সুখ আর দুঃখ একের পর এক আসে না, তারা একই সময় একই মাত্রায় সবসময় ওর জীবনে বিরাজমান।’

এসব কিছু ছাপিয়ে যে দিক সবকিছুর উর্ধে ওঠে আসে সেটা হলো, তিনি একজন বিশাল হৃদয়ের মানুষ। বিভিন্ন সামাজিক দাতব্য কাজে তার সম্পৃক্ততা অবাক করার মতো। বন্ধু ও আত্মীয় কারোর বিপদে সবার আগে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন। সঞ্জয় দাবী করেন, কারাবাস নাকি তাঁর মানসিকতা আমূল বদলে দিয়েছে, ‘জেলে প্রতি ছয় মাসে সাস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্ত কয়েদিদের সংলাপ বলা, গান, নাচ শিখিয়েছি। কঠিন সময়ে তারাই পরিবার হয়ে ওঠে আমি। আমি হাল ছেড়ে দিতাম, তখন ওরাই আমার পাশে এসে দাঁড়াতো। কারাবাস আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে, অনেক উপলব্ধি এসেছে। এটা দরকার ছিল। কারাগার আমার অহংকার গুড়িয়ে দিয়েছে।’

১৯৫৯ সালের ২৯ জুলাই কিংবদন্তিতুল্য এই অভিনেতা ভারতের মহারাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেন। স্ত্রী মান্যতা আর তিন সন্তান নিয়েই তার সংসার। ক্যারিয়ারের লম্বা একটা সময় কাটিয়ে ফেলেছেন। আলোচিত, সমালোচিত ও বর্ণাঢ্য সেই সময়ে প্রাপ্তির যেমন শেষ নেই, আক্ষেপেরও কোনো কমতি নেই। আশা করি ভবিষ্যতে আক্ষেপ মুছে সেই প্রাপ্তির খাতাটাই আরো দীর্ঘ হবে। ভালো থাকুন সাঞ্জু বাবা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।