যুগপরিবর্তনের ডাক! নেইমার-হ্যাজার্ডরা কি প্রস্তুত?

রোনালদোর জোড়া গোলে ২০০২ বিশ্বকাপ ফাইনাল জিতে ব্রাজিল, এইতো সেদিনের কথা। জিদানের ঢুশে মাতেরাজ্জি ভূপাতিত হলো – লালকার্ড দেখে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল জিদান। ২০০৬ এর কথা। এরপর আর বড় মঞ্চে দেখা যায়নি তাকে। রোনালদিনহোও সেবার হারিয়ে ফেলে স্প্যানিশ দৈনিকের প্রথম পাতার স্থান। পরের তিন বছর চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতে যথাক্রমে এসি মিলান, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড আর এফসি বার্সেলোনা – আর ওই তিন বছরেই হয়ে যায় একটি যুগের হাতবদল। ২০১০ বিশ্বকাপ আসতে আসতে পর পর তিন বছর কাকা, রোনালদো, মেসি ব্যালন ডি অর জিতে নেয়। তখন ব্রাজিলের রোনালদো, জিদানরা হয়ে যায় অতীত। সময়ের সেরা প্লেয়ার বনে যায় মেসি রোনালদোরা। সুচনা হয় নতুন ফুটবল আখ্যানের।

সময় বয়ে যায় – ২০০৬ পরবর্তী সময়ে মেসি রোনালদো প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়তে থাকে, বাড়তেই থাকে। সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা একসময় রুপ নেই দুই দানবের ভয়ঙ্কর কিন্তু সুন্দর যুদ্ধে। পরস্পরকে ছাপিয়ে যাওয়ার নেশায় আসক্ত হয়ে এই দুই অতিমানব তৈরি করেছে পাহাড়সম অর্জন যেটার সামনে ক্ষুদ্র মনে হতে থাকে সমসাময়িক অন্যান্ন যোদ্ধাদের। একসময় মনে হচ্ছিল রোনালদো বোধয় সেই যুদ্ধে হেরেই যাবে। কিন্তু সেটা তিনি হতে দেননি – আর হতে দেননি বলেই ২০১৮ তে এসেও কেউ জোর গলায় বলতে পারছেনা মেসি রোনালদো চেয়েও ভাল কেউ আছে।

সময় বহমান নদীর মতো। সময়ের স্রোতে আলেকজান্ডারকেও একসময় হার মানতে হয়েছে। ছেড়ে দিতে হয়েছে সিংহাসন। আর এটাই নিয়ম – সবারই সময় আসবে চলে যাওয়ার। পেলে, ম্যারাডোনা দেরও বিদায় জানাতে হয়েছে। রোনালদো বা মেসিকে একসময় জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। সময়টা কখন সেটা বলা মুশকিল – তবে আগামি কিছুদিনের মধ্যেই সেরকম কিছু ঘটার একটা মঞ্চ তৈরি হচ্ছে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে।

২০১৩ এর পর থেকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগকে স্পেনের সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছে দুই স্পেনিশ জায়ান্ট। এর মধ্যে রিয়াল মাদ্রিদ একাই নিয়ে গেছে তিন বার, বাকিটা বার্সার ঘরে। সেই চ্যাম্পিয়ন্স লিগের হাত ধরেই বিশ্বসেরার স্বীকৃতিও মিলেছে দুই ক্লাবের সেরা খেলোয়াড়ের। মেসি রোনালদোর ধ্রুপদী লড়াইয়ের এখন পর্যন্ত সত্যিকার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি হয়নি। কিন্তু মেসির তথাকথিত ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজেকে বিশ্বসেরা প্রমাণের উদ্দেশ্যে নেইমারের প্যারিস পাড়ি জমানোর পর দৃশ্যপট পালটে যায়। তবে শ্রেষ্ঠত্বের রেসটা এখনো দুই ঘোড়ার হলেও এই মৌসুমে সেখানে ভালভাবেই যোগ দিয়েছে নেইমার। আর সামনের রিয়াল মাদ্রিদ বনাম পিএসজি ম্যাচ হতে পারে সেই ঐতিহাসিক ম্যাচ যেখানে হয়ে যেতে পারে মুকুটের হাতবদল, প্রজন্মের পালাবদল।

গত কয়েকবছরের চ্যাম্পিয়ন্স লীগে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দু’টো ম্যাচ হতে যাচ্ছে ২০১৭-১৮ চ্যাম্পিয়ন্স লিগের রাউন্ড অফ সিক্সটিনে। নকাউট পর্বের প্রথম রাউন্ডে পিএসজির মুখোমুখি রিয়াল মাদ্রিদ, আর বার্সেলোনা পেয়েছে চেলসিকে। দুইটা ম্যাচই গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই দুই লড়াইয়ে কোনভাবে যদি বার্সেলোনা এবং রিয়াল মাদ্রিদ বিদায় নেয় তাহলে এই দুই প্লেয়ারের ক্যারিয়ার শুরু হবার পর এবারই প্রথম দুইজনকে ছাড়াই দেখতে হবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কোয়ার্টার ফাইনাল। আর চেলসি এবং পিএসজির এই দুইয়েরই এই ম্যাচ জেতার ক্ষমতা আছে – আর সেটা করতে পারলে খেলোয়াড় হিসেবে নিজেদের অবস্থানকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ারও সুযোগ আছে নেইমার এবং হ্যাজার্ডের।

নেইমারের সাথে হ্যাজার্ডের জায়গায় বেল এর নাম থাকতে পারতো। রিয়াল মাদ্রিদেই তৈরি ছিল তার মঞ্চ। স্বয়ং রোনালদোর সতীর্থ হবার সুবাদে তার সুযোগ ছিল তার দায়িত্বটা বুঝে নেওয়ার। কিন্তু ইনজুরি দুর্ভাগ্য তাকে পেয়ে বসে, ঠিক যেন কাকার মতো রেস থেকে ছিটকে যায় গ্যারেথ বেল। রেস মানে, মেসি রোনালদোর যোগ্য উত্তরসূরির রেস। এই মুহুর্তে মেসি রোনালদোর পর আর তিনজন প্লেয়ারের নাম বললে আসবে নেইমার, হ্যাজার্ড আর সুয়ারেজের নাম। কিন্তু সুয়ারেজের সুযোগ নেই মেসিকে ছাপিয়ে যাওয়ার। বাকি থাকে নেইমার আর হ্যাজার্ড। আর প্রকৃতির নিয়মের মতই যেন শেষ ষোলর মরণফাঁদের লড়াইয়ে মুখোমুখি মেসি – হ্যাজার্ড আর নেইমার – রোনালদো।

এটা বলার সুযোগ নেই যে – এই দুই ম্যাচে জিতলেই দুই অনুজ মেসি রোনালদোর চেয়ে সেরা প্লেয়ার হয়ে যাবেন। কিন্তু গত মাসে সাতাশে পা দেয়া হ্যাজার্ড আর এই মাসেই ছাব্বিশে পা দেয়া নেইমার চাইবেন এই ম্যাচ জিতে অন্তত বর্তমান সময়ে হলেও যেন তাদের অতিক্রম করার মতো অর্জন যেন করতে পারে। এক্ষেত্রে অবশ্য হ্যাজার্ডের চেয়ে নেইমার সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। পিএসজির হয়ে মাঠ মাতাচ্ছেন সেরা প্লেয়ারদের মতোই। দলের প্রধাণ খেলোয়াড় হিসেবে খেলতে নেমে নেইমার ফিরে পেয়েছে তার পুরনো রূপ। এখন পর্যন্ত তার ২৬ ম্যাচে তার গোলসংখ্যা ২৭।

সিজনের এই পর্যায়ে অনেক সাবেক প্লেয়ার এবং বিশেষজ্ঞ মনে করছেন – এবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিততে পারলেই হয়ত নেইমারই পেতে যাচ্ছেন সামনের ব্যালন ডি অর। কিন্তু সেটা করতে হলে তাকে হারাতে হবে বর্তমান ব্যালন ডি অর উইনারকে। রিয়ালের বর্তমান ফর্ম পিএসজিকে আশা যোগাচ্ছে, নেইমারও মুখিয়ে আছে নতুন জার্সি গায়ে পুরনো শত্রুর মোকাবেলা করার জন্য। এটাই সময় সবাইকে দেখিয়ে দেয়ার – ‘মেসি রোনালদোর পাশাপাশি আমিও বিশ্বের সেরা প্লেয়ার’।

অবশ্য হ্যাজার্ডের জন্য ব্যাপারটা এতো সহজ না। তার আসল যুদ্ধ আসলে নেইমারের সাথে। যদিও মেসি রোনালদোর মতো সেরকম কোন দ্বৈরথ নেই তার আর নেইমারের কিন্তু দুই কিংবদন্তির যোগ্য উত্তরসূরির ছোট লিস্টেই তার নাম উপরের দিকে। তাই তাদের মধ্যে কে সেরা সেটা নিয়ে টুকটাক বিতর্ক হয়ই। লিগ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শুরু করা চেলসির এই মৌসুমটা ভাল যাচ্ছেনা। অনেকটা রিয়াল মাদ্রিদের মতোই টপ ফোর নিয়েই শঙ্কায় আছে লন্ডন ক্লাবটি। কিন্তু সেটা দিয়ে প্লেয়ার হিসেবে হ্যাজার্ডকে মুল্যায়ন করার সুযোগ নেই। কারণ সে ইতিমধ্যেই নিজেকে প্রমাণ করেছে – প্রিমিয়ার লিগের সেরা প্লেয়ার বললেও ভুল হবেনা। এই অবস্থায় বার্সেলোনার সাথে ম্যাচের হেড-টু-হেড এ হ্যাজার্ডের সাথে লড়বে মেসিই। আর চ্যাম্পিয়ন্স লিগে চেলসির জার্সি গায়ে এবারই প্রথম মেসির দেখা পাচ্ছে হ্যাজার্ড। তাই প্রথম দেখাতেই ফুটবল মাস্টারকে হারানোর সুযোগটা কাজে লাগাতে চায়বেন।

চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এই দুই দলের সর্বশেষ দেখা হয় ২০১২ তে। সেবার লিগে ধুঁকতে থাকা চেলসির কাছে হেরেই সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেয় বার্সা। পরের গল্পতো সবার জানা – ফাইনালে বায়ার্নকে ঘরের মাঠে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় চেলসি। এটাকে উদাহারণ ধরলে চেলসির লিগ ফর্মকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে আমলে নেয়াটা বোকামি। অর্থাৎ পিএসজির পাশাপাশি চেলসির পক্ষেও সম্ভব এই বার্সাকে হারানো – যদিও সেটা হবে অনেক কঠিণ কাজ কিন্তু অসম্ভব না। তাই বলা যায় হ্যাজার্ডের জন্যেও মঞ্চ তৈরি আছে নিজেকে সেরার কাতারে নিয়ে আসার।

মেসি আর রোনালদোরা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেই তাদের প্রথম ব্যালন ডি অর জিতেছিলেন। গত দশ বছরের পরিসংখ্যান বলছে শুধুমাত্র ২০১০, ২০১২, ২০১৩ ছাড়া প্রতিবারই চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী দলের খেলোয়াড়রাই বর্ষসেরার পুরষ্কার হাতে নিতে পেরেছে। সেক্ষেত্রে এবারও তার ব্যাতিক্রম হবার সম্ভাবনা কম। তবে এটা বিশ্বকাপের বছর তাই চ্যাম্পিয়ন্স লিগই শেষ কথা না। আর এটাই হয়ত নেইমারের জন্য প্লাস পয়েন্ট। ফিফা র‍্যাঙ্কিং এ ব্রজিলের অবস্থান জার্মানির পরেই। অন্যদিকে প্রথাগত ফেভারিট না হলেও বেলজিয়ামও যথেষ্ট শক্তিশালী দল। তাই হ্যাজার্ডও চায়বে সেই সুযোগটা কাজে লাগাতে।

যদিও ব্যালন ডি অর একজনের হাতেই যাবে – কিন্তু বার্সা এবং রিয়ালকে হারানোর পাশাপাশি এই দুইজন যদি একটা করে বড় শিরোপা এবার নিজেদের নামে লেখাতে পারে তখন হয়ত বলা যাবে যে আমরা মেসি-রোনালদো যুগকে পিছনে ফেলেছি। সেই সাথে ২০০৬ এর মতো করে ২০১৮ তেই হয়ে যেতে পারে যুগের পরিবর্তন। আর সেই মঞ্চতো প্রস্তুত আছেই – কিন্তু সেটার জন্য নেইমার হ্যাজার্ডরা নিজেদের কতটুকু তৈরি করেছেন সেটাই দেখার বিষয়। অপেক্ষা করুন ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।