যিনি চাইলেই সব নৃশংসতা বন্ধ হয়

মিয়ানমারে কি হচ্ছে, এ সম্পর্কে যদি আপনার ধারণা না থাকে, তবে অং সান সুচিকে নিয়ে আপনি আশ্চর্য হবেন, একইসাথে বিস্মিতও। হ্যা, মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদেদের সাথে যা ঘটে চলেছে, সে ব্যাপারে তার আচরণ খুবই হতাশাজনক। সেখানে মানবাধিকার ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে, এর দায় একজন স্টেট কাউন্সিলর হিসেবে তিনি কোনোমতেই এড়াতে পারেন না। রোহিঙ্গাদের পক্ষ হয়ে তার অবশ্যই কিছু বলা উচিৎ ছিলো।

তবে, তিনি যে রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিরুদ্ধে কিছুই বলছেন না, এর জন্যও আপনি তাকে দোষারোপ করতে পারেন না। শান্তিতে নোবেলজয়ী এই নারীনেত্রীর পুরষ্কারও আপনি কেড়ে নিতে পারেন না, কেননা পুরষ্কার কেড়ে নেবার কোনো ব্যবস্থাই রাখেনি নোবেল কমিটি। তার চেয়েও বড় কথা, এই যে নির্বিচারে রোহিঙ্গা নিধনের পরেও তার মুখে টুঁ শব্দটি নেই, এর পেছনে অন্য কোনো কারণ নেই তো! রোহিঙ্গা নির্যাতনের পেছনে আদতেই তার যোগসাজশ রয়েছে কি?

মিয়ানমার সেনাবাহিনী, যে বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত আছেন কমান্ডার-ইন-চিফ মিন অং হ্লেয়িং। তার নেতৃত্বে বিগত কয়েকদিন ধরে রোহিঙ্গা নাগরিকদের উপর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এর পেছনে তাদের যুক্তি, পুলিশ স্টেশনসহ অনেক সরকারি ভবনে গত ২৫ আগস্ট আক্রমণ চালিয়েছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা।

তারপর থেকেই মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্মমতার সূচনা। সেদিনের পর থেকে আনুমানিক চার লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক বাংলাদেশে সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে এসেছেন। রোহিঙ্গা নাগরিকদের নানা সূত্র হতে জানা যায়, এ চার লাখের বাইরে আরও প্রায় এক লাখ নাগরিক মিয়ানমারের অন্যত্র পালিয়ে গিয়েছেন গত ২০ দিনে। না পালিয়েই বা উপায় কি, এ সময়কালে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা যে ৫ হাজার ছাড়িয়েছে।

নির্যাতনের স্টিম রোলার-ই যেন বেশ আয়োজন করে চলছে রোহিঙ্গা নাগরিকদের উপর। প্রাণদণ্ড, শিরচ্ছেদ তো নৈমিত্তিক ব্যাপারই, যারা এখনো পালিয়ে যেতে পারেননি, নিজ ঘরে গৃহবন্দি অবস্থায় জীবন্ত পুড়ে মরছেন অনেকে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুরতার শিকার অবুঝ রোহিঙ্গা শিশুরাও। পরিস্থিতি সেখানে এতটাই নির্মম, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার জেইদ রা’দ আল হুসেইন এই নির্দয় আক্রমণকে বর্ণনা করেছেন, ‘গোষ্ঠী নিধনের ব্যাকরণিক উদাহরণ’ বলে।

স্টেট কাউন্সিলর হিসেবে অং সান সুচি কোনোভাবেই এ নির্যাতনের দায়ভার এড়াতে পারেন না। তবে গোটা বিশ্ব যখন সুচির বিরুদ্ধে সরব, এ নির্মমতার পেছনের কারিগর কিন্তু পর্দার আড়ালেই রয়ে গিয়েছেন। এমনকি, অং সান সুচির নামে যেসব সংবাদবিজ্ঞপ্তি মিয়ানমার সরকার সরবরাহ করছে কিংবা অং সান সুচি যে বক্তব্য প্রদান করছেন, আদতে তা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ মিন অং হ্লেলিংয়ের চাওয়া ব্যতীত আর কিছুই নয়। গোটা বিশ্ব যখন ‘সুচি নিপাত যাক’ রব তুলতে ব্যস্ত, তখন এই মানুষটি বেশ স্বাধীনভাবেই রোহিঙ্গা নিধনে শশব্যস্ত রয়েছেন।

প্রকৃতপক্ষে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংবিধানানুযায়ী, মিন অংয়ের বিরুদ্ধে উচ্চবাচ্য করার ক্ষমতা কারোরই নেই। মিয়ানমার আর্মি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, যে প্রতিষ্ঠান গোটা দেশের পুলিশ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, জেল, সীমান্ত রক্ষা এবং অন্য সামরিক বিভাগগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। দেশটর সংসদে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জন্য ২৫% কোটা বরাদ্দ রয়েছে। শুধু তাই নয়, বাকি ৭৫% সংসদ সদস্যদের দ্বারা গৃহীত সিদ্ধান্তও রদ হয়ে যেতে পারে, মিন অংয়ের এক ‘না’ উচ্চারণেই। তার নেতৃত্বে, এ যেন সরকারের বাইরে আরেক সরকার।

তবে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে তার অনমনীয় অবস্থানের জন্য, এখন গোটা বিশ্বেই ঘৃণিত এক চরিত্র তিনি। তিনি এমন এক বাহিনীর প্রধান, যে বাহিনীর আষ্টেপৃষ্ঠে লেপ্টে রয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কীর্তি। সর্বশেষ মিলিটারি আক্রমণের পূর্বেই, জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে কিনা, সে ব্যাপারে খতিয়ে দেখতে তদন্তে নেমেছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী কিছুকাল পূর্বে পুনঃসংস্কার হলেও, এখনও মিয়ানমারের সব গৃহযুদ্ধ তথা জাতিগত দাঙ্গায় মিন অংয়ের বাহিনী জড়িত। শুধু রোহিঙ্গা-ই নয়, সাম্প্রতিক কালে তার বাহিনী কাচিন আর শান রাজ্যেও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে এসেছে।

যখন গোটা মিয়ানমার চাচ্ছে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হোক, তা-ও সম্ভব হচ্ছে না একজন মিন অংয়ের জন্য। মিয়ানমারে যুদ্ধাপরাধ আর মানবাধিকার লঙ্ঘন করার মতো অপরাধে অপরাধী তিনি বহুকাল ধরেই। তবে তার পরও যে তিনি বেশ দাপটের সাথেই মিয়ানমারের সর্বেসর্বা হয়ে টিকে রয়েছেন, এর পেছনের কারণ কি!

গোটা বিশ্বে তিনি সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি হলেও, মূল চালিকাশক্তি দেশগুলোর সমর্থন তিনি ঠিকই অর্জন করে নিয়েছেন। বারাক ওবামার শেষ বাজেটে, বড় এক অংশ বরাদ্দ ছিলো মিয়ানমার মিলিটারির জন্য। ব্রিটেন সরকার মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জন্য আয়োজন করেছিলো ট্রেনিংয়ের, তা-ও আবার ব্রিটেনের করদাতাদের অর্থে।

জার্মানি আর অস্ট্রিয়াতে মিন অং-কে সম্মান জানানো হয়েছিলো লাল গালিচা বিছিয়ে, যে সফরে তারা আলোচনা করেছিলেন মিলিটারি ট্রেনিং আর গোলাবারুদ সরবরাহ নিয়ে। গত বছর ইতালিতে, গোলাবারুদ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কারখানাই ঘুরে এসেছিলেন তিনি। যে ইউরোপিয় ইউনিয়ন নির্দেশ দিলো রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধে, তারাও মিন অং-কে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলো ইউরোপিয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সেনাপ্রধানদের বার্ষিক সভায়।

মিন অংয়ের ক্ষমতার হাত যে কতটা লম্বা, তা তো পরিষ্কার-ই।

হাফিংটন পোস্ট অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।