যদি বলি তামিমের চেয়ে সৌম্যর পরিসংখ্যান ভাল…

যদি বলি, এই বছর তামিম ইকবালের চেয়ে সৌম্য সরকারেরর টেস্ট রেকর্ড ভালো, অগ্নি দৃষ্টিতে কেউ আমাকে পুড়িয়ে দিতে চাইবেন?

সেটা কেউ করতেই পারেন। শ্রীলঙ্কায় জয়ে টেস্টে চতুর্থ ইনিংসে তামিমের ৮২ রান আমার মতে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা ও গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে ৭১ ও ৭৮ রানের ইনিংস দুটি আরও একবার বুঝিয়ে দিয়েছে তামিমের জাত। তামিমের রানকে তাই শুধু সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে চলবে না।

তবে আমার দাবীও একটা জায়গায় সত্যি। এবছর তামিমের রান ৭ টেস্টে ৪৯৮, গড় ৩৫.৫৭। সৌম্যর রান ৬ টেস্টে ৪৩৯, গড় ৩৬.৫৮। গড় সৌম্যর বেশি। দুজনের কারও সেঞ্চুরি নেই।

অবশ্যই তুলনা করছি না। তুলনার প্রশ্নই আসে না। তামিম আমাদের সবসময়ের সেরা ব্যাটসম্যান। তবে যেটা বলতে চাইছি, সৌম্যকে নিয়ে যেভাবে হুটহাট যাচ্ছেতাই বলা হয়, সেটাও অন্যায়। পারফর্ম করেছে বলেই দলে আছে, দয়ায় নয়।

তবে এটাও বলার অপেক্ষা রাখে না, অস্ট্রেলিয়া সিরিজ সৌম্যর ভালো যায়নি। সবশেষ ৫ টেস্ট ইনিংসে ফিফটি নেই। তার রান দরকার।

এবং তার রান করা উচিত! সৌম্য যে ধরণের ব্যাটসম্যান, তাতে দক্ষিণ আফ্রিকায় তার রান করা উচিত। বল ব্যাটে আসবে দারুণ ভাবে, বাউন্স থাকবে একদম ইভেন। সৌম্যর ভালো করার জন্য আদর্শ।

যদিও আরও বেশি ভালো করার কথা ওয়ানডেতে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ওয়ানডেতে উইকেটে নরম্যালি অনেক ভালো ব্যাটিং উইকেট থাকে। খেলা হয় সাড়ে তিনশর। টেস্টে কিছু মুভমেন্ট থাকার কথা, বিশেষ করে শুরুতে। সেটা সৌম্যকে সামলাতে হবে। সেটুকু পারলে পরে ভালো করার কথা।

আরেকটা ব্যাপারও জরুরী। মেন্টাল টাফনেস। সৌম্যর ব্যাপারে যেটি সবসময়ই বলি। তার ধরণের ব্যাটসম্যানের জন্য সবচেয়ে জরুরী হলো মেন্টালি স্ট্রং থাকা। নিজের ব্যাটিংয়ের ধরণে, নিজের সামর্থ্যে প্রবল ভরসা রাখা। নইলে তার ধরণের ব্যাটসম্যানরা টিকতে পারে না, পারবে না। আমার আশা ও বিশ্বাস, দক্ষিণ আফ্রিকায় সৌম্য ভালো করবে।

রান করা জরুরী ইমরুলের জন্যও। সবশেষ ১৫ ইনিংসে তার একটি ফিফটি। সবশেষ ৫ ইনিংস- ০, ০, ২, ৪, ১৫। এটা ঠিক, তার আসল পজিশন ওপেনিং ছেড়ে তাকে তিনে খেলতে হচ্ছে। সেটিকে বিবেচনায় নিলেও বলতে হবে, দক্ষিণ আফ্রিকা দলে থাকায় নিজেকে ভাগ্যবান ভাবতে পরেন ইমরুল। তিনে যে পারা যাবেই না, তা তো নয়। ২০১৪ সালে যখন আড়াই বছর পর টেস্ট দলে ফিরলেন ইমরুল, তিনে খেলেই সেঞ্চুরি করে ফিরেছেন। এখন না পারার কারণ নেই। স্রেফ মানসিক ভাবে নিজেকে বোঝাতে হবে যে তিনই আপাতত তার জায়গা।

সাইড শট ভালো খেলেন। স্কয়ারে ভালো খেলেন। ইমরুলেরও দক্ষিণ আফ্রিকায় ভালো করা উচিত।

সাব্বিরের ক্ষেত্রেও একই কথা। থ্রু দা লাইন খেলতে পছন্দ করেন। স্কয়ারেও ভালো খেলেন। বল ব্যাটে আসবে ভালো, তার ভালো খেলা উচিত। প্রস্তুতি ম্যাচে দুই ইনিংসে ফিফটি সেটিরই ইঙ্গিত।

সৌম্য-ইমরুল-সাব্বির, তিন জনের জন্যই সবচেয়ে বড় সমস্যা হতে পারে, শরীর তাক করে আসা শর্ট বল। তিনজনই কম্পালসিভ হুকার, শর্ট বলে বেশির ভাগ সময়ই পুল-হুক খেলে ফেলেন। বিশেষ করে ইমরুল, সম্ভবত ৯০ শতাংশ সময়ই শট খেলে ফেলেন। এই করতে গিয়ে বিপদেও পড়েছেন। স্কয়ার লেগ-ফাইন লেগ-লং লেগ-মিড উইকেট মিলিয়ে একজন ফিল্ডার, ইমরুল তার হাতেই ধরা পড়েছেন, এরকম হয়েছে বেশ কবার।

এই জায়গাটায় তিনজনকেই সাবধান থাকতে হবে। পুল-হুকের সঠিক বলটা সিলেক্ট করতে হবে। পুল-হুক ভালো খেলা মানে শুধু শটটি খেলতে পারা নয়, বল ছাড়াও ভালো খেলার অংশ। কোন লাইন-লেংথ আর কোন হাইটের শর্ট বলে হুক-পুল করব, কোনটা ছাড়ব, সেটি ঠিক ভাবে সিলেক্ট করতে পারার ওপর নির্ভর করবে তিন জনের সাফল্য-ব্যর্থতা।

মুমিনুলকে নিয়ে কিছু বলার নেই। কারণ আমি নিশ্চিত, সে ভালো করবে।

খুব আশা ভরে তাকিয়ে আছি রিয়াদের দিকে। সাব্বিরদের মত রিয়াদও এরকম উইকেট পছন্দ করে, যেখানে বল ব্যাটে আসে। তবে এসব হিসাব-নিকাশের বাইরে গিয়েও খুব করে চাই, রিয়াদ ভালো করুক এবং টেস্ট দলে আবার জায়গা পাকা করুক।

৩৩ টেস্টের অভিজ্ঞ একজনকে হারিয়ে ফেলা মানে ওই ক্রিকেটারের নিজের চেয়ে ক্ষতিটা বেশি দেশের ক্রিকেটের। আশা করি, রিয়াদ নতুন ইনিংস সাজাবে পুরোনো অভিজ্ঞতাকে সঙ্গী করে। দেশ তার ওপর ৩৩টা টেস্ট যে আস্থা রেখেছে, পরের ৩৩ টেস্ট বা পরের ৬৬ টেস্ট দেশকে তিনি উপহার দেবেন দারুণ কিছু।

অভিজ্ঞতা অমূল্য। বাংলাদেশ ওয়ানডেতে ভালো করছে ফ্যাবুলাস ফাইভের সৌজন্যে। পাঁচ সিনিয়র। টেস্টে একজন এমনিতেই নেই, আরেকজনকেও হারাতে চাই না। রিয়াদ জায়গা পাকা করুক। টেস্টে থাকুক আমাদের ফ্যাবুলাস ফোর। তাদের হাত ধরে পরের স্তরে পৌঁছে যাক আমাদের টেস্ট ক্রিকেট।

আশার কথা শোনালাম। উল্টোটার জন্যও মানসিক প্রস্তুতি থাকা ভালো। উপমহাদেশের দলগুলির জন্য সবচেয়ে কঠিন টেস্ট সফর সবসময়ই দক্ষিণ আফ্রিকা। এবং সেটি মূলত ব্যাটিংয়ের কারণেই। আর আমাদের ব্যাটিং লাইন আপে তামিম ও মুশি ছাড়া বাকি সবারই কোনো না কোনো ইস্যু আছে। কেউ দলে ফিরছেন, কেউ দলে জায়গা বাঁচাতে লড়ছেন, কেউ ক্যারিয়ার বাঁচাতে। কঠিন কাজটি তাই হয়ে উঠছে কঠিনতর।

স্টেইন-ফিল্যান্ডার-মরিস নেই, বড় স্বস্তি অবশ্যই। তবে রাবাদা বা মর্নে মর্কেল, দুজনের কেউ একাই ধসিয়ে দিতে পারেন বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইন আপ। ডুয়ানে অলিভিয়ের দারুণ সম্ভাবনাময়। কেশভ মহারাজকে পেয়ে মনে হচ্ছে অবশেষে দক্ষিণ আফ্রিকা লম্বা সময়ের জন্য একজন কার্যকরি টেস্ট স্পিনার পেয়েছে। আর কন্ডিশন তো বড় ফ্যাক্টর বটেই। আশার বেলুন বেশি ফোলানোর আগে তাই সব বাস্তবতা মাথায় রাখা ভালো।

ফেসবুক থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।