যত দাম যাঁর, তত দায়িত্ব তাঁর

ফুটবল মাঠে আপনার প্রতিভা থাকলে আপনার চাহিদাও থাকবে। আর যদি সেই চাহিদা পূরণে সফল হন তাহলেতো কথাই নাই, আপনার পিছনে ছুটবে আরো বড় দল। সেই প্রতিভা এবং চাহিদা পূরণ করে ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার ফিলিপে কৌটিনহো দলবদলের বাজারে খুঁজে পেয়েছে তার ‘স্বপ্নের’ ক্লাব এফসি বার্সেলোনাকে। বর্তমান বাজারে তার চাহিদা এতই বেশি ছিল যে বার্সেলোনার মতো টাকা খরচে অনাগ্রহী দল একই মৌসুমে দ্বিতীয়বারের মতো খরচ করেছে ১০০মিলিয়ন এর বেশি ইউরো – ফলাফল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড়ের তালিকায় কৌটিনহো চলে এসেছেন দুইয়ে।

গত আগস্টে নেইমারের হঠাৎ বার্সা ছেড়ে চলে যাওয়ায় কাতালান দলের স্কোয়াডে সামান্য শুণ্যতা তৈরি হয়। সেটা পূরণ করতে মরিয়া ক্লাব ম্যানেজমেন্ট বেছে নেয় আরেক ব্রাজিলিয়ান এবং লিভারপুল নাম্বার টেনকে। এদিকে দীর্ঘ পাঁচ মৌসুম লিভারপুলকে সার্ভিস দেয়া কৌটিনহো ক্লাবের আস্থা ভালবাসা সব পেলেও সেখানে ট্রফির তালিকা ছিল শুণ্য, তাই বার্সার অফারকে ইতিবাচকভাবেই নেয় সে । কিন্তু দুইয়ে দুইয়ে চার মিলে গেলেও সাফল্য পেতে বধ্য পরিকর জার্গেন ক্লপ তার দলের সেরা খেলোয়াড়কে বেচতে রাজি ছিলেন না, তাই শেষপর্যন্ত দুই ক্লাবের মধ্যে সমযোথা না হওয়ায় প্রক্রিয়াটি থেমে যায়।

লিভারপুল ফ্যানরা আশা করেছিল হয়ত আরো অন্তত এক মৌসুমে পাচ্ছে তাদের যাদুর কৌটাকে। কিন্তু বার্সেলোনা বোর্ড যেন আদা জল খেয়ে নেমেছিল। নেইমারের প্রত্যাখ্যানের জবাব ওরা এর আগেই ডেম্বেলেকে কিনে দিয়েছে, কিন্তু সেটাতে থেমে থাকেনি বার্সা। এই জানুয়ারিতে আবারো তারা যোগাযোগ শুরু করে কৌতিনহোর ব্যাপারে। শুরুতে ব্যাপারটাকে গুজব মনে হলেও শেষ পর্যন্ত কৌটিনহোর ইচ্ছার কাছে হার মেনে উপযুক্ত ফি তে লিভারপুল তাদের যাদুর কৌটাকে বিক্রি করে দেয় বার্সেলোনার কাছে।

মূল্যটা সব মিলিয়ে ১৪৩ মিলিয়ন পাউন্ডের তবে সেটা উপযুক্ত কিনা সেটা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কৌটিনহোর ট্রান্সফার মূল্যের যৌক্তিকতাকে সবচেয়ে সহজভাবে ব্যাখ্যা করেছেন ইতালি কিংবদন্তি আন্দ্রে পিরলো। ব্যাপারটা খুব সহজ, সদ্য যোগ দেয়া লিভারপুল ডিফেন্ডার ভ্যান ডিজক এর মূল্য যদি ৭৫ মিলিয়ন পাউন্ড হয় তবে কৌতিনহোর মূল্য তার ডাবল হওয়া উচিত। হয়েছেও তাই। অর্থাৎ ফুটবল মার্কেটে মুল্যস্ফিতির সময়ে কৌটিনহোর মতো খেলোয়াড়ের জন্য ১৪৩ মিলিয়ন পাউন্ড বা প্রায় ১৬০ মিলিয়ন ইউরো অস্বাভাবিক কোন ঘটনা না।

তো এত বড় টাকার বিনিময়ে কৌটিনহোর এই দলবদল কার উপর কেমন প্রভাব ফেলবে?

লিভারপুলের জন্য এই ট্রান্সফারটা মিশ্র অনুভুতির কেননা ১৬০ মিলিয়ন ইউরো পেলেও জার্মান ম্যানেজার তাকে বেচার পক্ষে ছিলনা। উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এবার লিভারপুলের ভাল করার একটা সুযোগ এসেছে। এই মৌসুমে তাদের আক্রমন যেকোন দলের জন্যই ভীতি জাগানিয়া। ফিরমিনো, মানে, সালাহ এবং কোটা মিলে গোল করে যাচ্ছিলে পাল্লা দিয়ে । ডিফেন্সে তাদের দুর্বলতা ছিল, সেটাও সাউদাম্পটন থেকে ভ্যান ডিজক কে কিনে ইতোমধ্যেই শক্তিশালী করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এমতাবস্থায় কৌতিনহোর দল ছাড়াটা তাদের জন্য একটা বড় ধাক্কা। আবার কৌটিনহোকে বিক্রি করে যে টাকা তাদের অ্যাকাউন্টে এসেছে সেটা দিয়ে সহজে কাছাকাছি লেভেলের প্লেয়ার কিনতে পারে লিভারপুল। এছাড়াও দলের অন্যান্ন দুর্বল জায়গা গুলোকে শক্তিশালী করার পিছনে এই অর্থ ব্যয় করতে পারে তারা।

বার্সার উপর কৌটিনহোর ট্রান্সফারের প্রভাব পুরোটাই ইতিবাচক হবার কথা। সেলেসাও মিডফিল্ডারের আগমনে দলের ট্যাকনিক্যাল কোয়ালিটি আরো সমৃদ্ধ হবে। এদিকে ইনিয়েস্তারও বয়স হয়েছে অনেক, খুব বেশিদিন টপ লেভেলে খেলবেন বলে মনে হয়না। এই অবস্থায় কৌটিনহোই হচ্ছে তার সবচেয়ে যোগ্য উত্তরসূরি। আর এটা ছাড়াও মেসির অনুপস্থিতিতে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা রাখে এই ব্রাজিলিয়ান।

লিভারপুল কিংবা বার্সেলোনার জন্য হয়ত ভাল মন্দ মিলেই থাকবে এই টান্সফারটা। কিন্তু এটার ফলে প্লেয়ার হিসেবে কৌতিনহোর উপর ফ্যানদের প্রত্যাশা বেড়ে যাবে দ্বিগুণ। কোন সন্দেহ নেই যে কৌতিনহো গত দুই বছর যাবত ইংলিশ প্রিমিয়ারলীগের সেরা দুই তিনজন মিডফিল্ডারদের একজন ছিলেন। দূর পাল্লার শটে তার করা গোলগুলা যেকোন ফুটবল রোমান্টিকের হৃদয়ে প্রেম জাগাতে সক্ষম । সাথে চিরাচরিত ব্রাজিলিয়ান স্কিলগুলোতো আছেই। কিন্তু যখন তার প্রাইজট্যাগ ১৬০ মিলিয়ন ইউরো তখন মানুষ শুধু গোল আর পায়ের ঝলকেই সন্তুষ্ট হবেনা।

বর্তমান সময়ে অর্থনৈতিক অবস্থা এবং সাফল্য এই দুইয়ের বিবেচনাতেই বার্সেলোনা বড় ক্লাব লিভারপুলের তুলনায়।। বার্সেলোনা বছরে ছয়টা ট্রফি জিতার জন্য খেলে। লিভারপুল সেখানে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ খেলতে পারলে খুশি থাকে। পুলে তাই কৌটিনহোর উপর চাপটাও ছিল তুলনামূলক কম। অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকতো অল রেড ফ্যানরা। বার্সায় ব্যাপারটা একেবারেই ভিন্ন। এখানে প্রতিটা হারের জন্যও সমালোচনা সহ্য করতে হয় খেলোয়াড়দের। আর কোন চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে বাদ পড়লেতো চাপ আরো বেশি। কৌটিনহো কখনো লিভারপুলে এটার মুখোমুখি হয়নি।

কিন্তু এখন প্রতিটা ক্যামেরার ফোকাস থাকবে বিশ্বের দ্বিতীয় দামি ফুটবলারের উপর। তাই এখানে সামান্য ভুলকে অনেক বড় করে দেখা হবে। আর যদি ভুল করেও ফেলে তাহলে কি হতে পারে সেটা পল পগবা ভাল বলতে পারবে। ফ্রেঞ্চ তারকা গত মৌসুমে ছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড়। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে জয়ে করার পর পগবার পিছনে সবসময়ই মিডিয়ার লোকজন লেগে ছিল। ম্যানইউ কোন ম্যাচ না জিতলে তার পুরো দায়ভার আসতো তার উপর, এটা থেকে বের হতে পারেনি পগবা। তার স্বদেশি নেইমারকেও একেবারে বিতর্ক তাড়া করেনি তা না। রেকর্ড ২২২ মিলিয়ন ইউরোতে প্যারিস পাড়ি দিয়েই কাভানির সাথে জড়িয়ে পড়েন পেনাল্টি আর ফ্রি-কিক সম্পর্কিত বিতর্কে। কিন্তু খেলার মাধ্যমে নেইমার সবার মুখ বন্ধ রাখতে সক্ষম হচ্ছে।

বিভিন্ন স্তর পার করে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে, এখন ফিলিপে কৌটিনহো আর লিভারপুলের যাদুর কৌটা না। একসময়ের ইন্টার মিলানের পরিত্যাক্ত খেলোয়াড় এখন বিশ্বের সেরা ক্লাবের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড়, যেখানে খেলে গেছে তার স্বদেশী পূর্বসূরিরা। তারাতো সফল ছিলেন নিজ নিজ জায়গা থেকে। বার্সেলোনার যুগ পরিবর্তনের ক্ষণে এসে কৌটিনহো কতটুকু বার্সাকে দিতে পারবে সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আসা শুরু করবে আরো তিন সপ্তাহ পর থেকে। আপাতত অভিনন্দন জানাই কৌটিনহোকে ইতিহাসের দামি খেলোয়াড়দের ক্লাবে যোগ দেয়ার জন্য। অভিনন্দনের উত্তরের অপেক্ষাই রইলাম।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।