মোহাম্মদ সালাহ: মিশরিয়ান মেসি

গত ৩০ ডিসেম্বরের কথা। বছরের শেষ লিগ ম্যাচে লেস্টারের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়ে লিভারপুল। প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লিগে যেখানে এক পয়েন্ট হারানো যেখানে অনেক বিপদজনক সেখানে তিন পয়েন্ট হারানোর কোন সুযোগ নেই লিভারপুলের। কিন্তু লিভারপুলে আছেন মেসি। না, আসল মেসি বার্সাতেই খেলেন কিন্তু মিশরের মেসিকে দলে ভেড়ানোর পর থেকে লিভারপুলের অন্তত গোল নিয়ে চিন্তা করতে হয়না ।

ইংরেজি উচ্চারণ মুহামেদ সালাহ (বাংলায় মোহাম্মদ সালাহ বলা যায়), ডাকা নাম মোমো। মেসির মতো ছোটখাটো গড়নের, বাঁ পায়ের খেলোয়াড়। সেই সালাহ লেস্টারের এক গোলের জবাব দিলেন একাই দুই গোল করে। দুইটাই আসে তার সহজাত ড্রিবলিং এবং ফিনিশিং দক্ষতার সৌজন্যে, যেমনটা বার্সায় মেসি করে থাকেন। প্রথম গোলটায় সাদিও মানের দুর্দান্ত ব্যাকহিল পাস থেকে বল পেয়ে ডি বক্সে বোকা বানান চারজন ডিফেন্ডারকে।

তাদের কোন কিছু করার সুযোগ না দিয়ে করেন সমতাসূচক গোল। পরেরটাই কাউন্টারে ডান পাশে বল পেয়ে প্রথম টাচে সেটাকে চিপ করে গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে পাঠিয়ে দেন জালে। দুইটা গোলই মোহাম্মদ সালাহর মিশরের মেসি নামের যথার্থতা প্রমাণ করে। কিন্তু সালাহর জন্য এসব নতুন কিছুনা, তার এই উত্থানের শুরু হয় আরো আগে থেকে।

মিশরের ক্লাব ‘আরব কন্ট্রাক্টর’-এর যুব একাডেমেরি জন্য প্রসিদ্ধ – সেখানে সালাহ ভর্তি হন ১৪ বছর বয়সে। এরপর প্রায় চার বছর পর ২০০৯/১০ মৌসুমে সিনিয়র ডেব্যু হয় ক্লাবের হয়ে। সালাহ আরব কন্ট্রাক্টরের হয়ে প্রথম গোল করেন আফ্রিকার সবচেয়ে বড় ক্লাব আল আহলির বিপক্ষে, আর তাতেই সালাহ চলে আসেন সবার নজড়ে। সেবছর জিতেন আফ্রিকারর সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরষ্কার। আফ্রিকাতে দুর্দান্ত নৈপুণ্য তাকে নিয়ে আসে ইউরোপিয়ান ক্লাবের ফোকাসে।

সুইস ক্লাব এফসি বাসেল মাত্র ২.৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে কিনে নেয় ২০ বছর বয়সী মোহাম্মদ সালাহকে। ২০১২ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত সেখানে ৭৯ ম্যাচ খেলে ২০ গোল এবং ১৭ অ্যাসিস্ট করেন সালাহ।

বাসেলের হয়ে ২০১২/১৩ মৌসুমে ইউরোপা লিগে বেনিতেজের চেলসির সাথে দেখা হয়ে সালাহর, সেখানে তার একটি গোল ছিল। তবে বড় চমক আসে পরের মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ গ্রুপ পর্বে যেখানে বাসেলের গ্রুপে ছিল হোসে মোরিনহোর চেলসি।

গ্রুপ পর্বে বাকি কোন ম্যাচ জিততে না পারলেও চেলসির সাথে দুই লেগেই জিতে বাসেল এবং দুটাই আসে সালাহর গোলে। প্রথম লেগে চেলসির মাঠে ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকে ৭১ মিনিটে সালাহর বাঁকানো শটে সমতায় ফেরে বাসেল এবং পরে ২-১ ম্যাচ জিতে নেয়। সালাহর গোলটা যে কোন অপ্রত্যাশিত কিছু ছিলনা সেটার প্রমাণ আসে ফিরতি লেগে। নিজেদের মাঠে সালাহ ছিল আরো অপ্রতিরোধ্য, এবার ম্যাচের ৮৭ মিনিটে কাউন্টার এটাকে সালাহর গতি এবং ড্রিবলে পরাস্ত হয় চেলসি ডিফেন্স। ১-০ গোলে ম্যাচ জিতে বাসেল আর নায়ক বনে যান ‘দি ফারাও’ খ্যাত মোহাম্মদ সালাহ।

‘যদি তাকে হারাতে না পারো তাহলে তাকে কিনে ফেল – এটা যদি কোন প্রতিযোগীতার নীতি হয় তাহলে সেটার সফল প্রয়োগ ঘটায় চেলসি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে চেলসিকে অনেকটা একক প্রচেষ্টায় হারিয়ে ইউরোপে ইতিমধ্যে পরিচিত সালাহ; আর সেই চেলসিরই নজড় পড়ে উদীয়মান এই ফুটবলারের উপর। ফলশ্রুতিতে ওই মৌসুমের জানুয়ারি ট্রান্সফার উইন্ডোতেই তাকে স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে নিয়ে আসে মরিনহো।

শুরু হয় সালাহর নতুন যাত্রা। আরব কন্ট্রাক্টরের হয়ে ২০০৯ এ অভিষেক হওয়ার পাঁচ বছর পর মোমো এখন ইউরোপের টপ ফ্লাইটের খেলোয়াড়। নিঃসন্দেহে তার এবং মিশরের জন্য অনেক বড় অর্জন। কিন্তু বড় জায়গাতে টিকে থাকাও অনেক চ্যালেঞ্জিং আর চেলসিতে সেই চ্যালেঞ্জেরই মুখোমুখি হন সালাহ।

চেলসির প্রথম একাদশে জায়গা পেতে সমস্যা হচ্ছিল সালাহর। মরিনহো অগ্রাধিকার দিচ্ছিলেন উইলিয়ান, হ্যাজার্ড এবং রামিরেসদের। তবে কি সালাহ হতে যাচ্ছেন আরেক মরিনহো ভিকটিম। চেলসির জন্য অবশ্য তরুণ খেলোয়াড় কিনে লোনে পাঠিয়ে দেয়াটা নতুন কিছু ছিলনা। সালাহর ক্ষেত্রেও তাই ঘটল, মাত্র এক বছরের চেলসি স্পেলে খেলেছেন মাত্র ১৯ ম্যাচ, গোল করেছেন মাত্র দু’টি যেটি বাসেলের হয়ে চেলসির বিপক্ষে করা গোলসংখ্যারও কম।

এমন প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের জন্য এটা সংকটময় সময়ই বলা যায়। সালাহ হারিয়ে যেতে পারতেন, অথবা চেলসিতে বেঞ্চে বসেই কাটিয়ে দিতে পারতেন আরো কয়েক বছর। কিন্তু মাঠে থাকার তীব্র আকাঙ্খা তাকে থামাতে পারেনি। সেই হার না মানা মানসিকতা থেকেই বেরিয়ে আসে আরো পরিপক্ব এবং আরো ভয়ঙ্কর সালাহ।

‘চেলসির সময়টা ছিল আমার ক্যারিয়ার এবং জীবনের জন্য শিক্ষণীয় একটি অধ্যায়’ – সালাহর ভাষ্য ছিল এটি। চেলসিতে বসে থেকে আর চলেনা। দলে নিয়মিত হবার ইচ্ছা থেকে ২০১৫ এর জানুয়ারিতে লোনে আসেন ইতালির ক্লাব ফিওরেন্তিনাতে, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির শহরে, ফ্লোরেন্সে।

সালাহর গতি, ড্রিবলিং এ মুগ্ধ ফিওরেন্তিনা দর্শকরা, দ্রুতই ফ্যান ফেভারিটে পরিণত হন সালাহ। আটলান্টার সাথে বদলি নেমে ডেব্যু হয়। প্রথম একাদশে আসেন সাসুলোর বিপক্ষে। ৩-১ গোলে জয়ের পথে গোল করার পাশাপাশি আরেকটি গোলে অ্যাসিস্টও করেন সালাহ। দুর্দান্ত শুরুর পর ফিওরেন্তিনা দর্শকদের মুখে বেজে উঠে সালাহকে নিয়ে গান। অনেকটা প্রথম দর্শনেই প্রেমের মতো সালাহকে ভালবেসে ফেলে ফ্লোরেন্সবাসি। সেই ভালবাসার প্রতিদান আসে জুভেন্তাসের বিপক্ষে কোপা ইতালিয়ার সেমিফাইনালে দুই গোল করে। তার আগে ইউরোপা লিগে টটেনহামকে ৩-১ গোলে হারানোর পথেও গোল করেন সালাহ। এরপর আবার ইন্টার মিলানের বিপক্ষে করেন ম্যাচজয়ী গোল।

নিজেকে প্রতিনিয়ত উন্নত করতে থাকা সালাহ এখন সিরি এ’র হট কেক। মৌসুম শেষে ফিওরেন্তিনা তাকে একেবারে কিনে ফেলতে চায়, কিন্তু সালাহ সেটাতে রাজি ছিলনা। এবার আরো একটি লোন ডিলে পাড়ি জমান রোমে।

এএস রোমাতে ২০১৫/১৬ মৌসুমে ৪২ ম্যাচে করেন ১৫ গোল, সিস্ট করেন আরো ৯ গোলে। দারুণ মৌসুম উপহার দেবার পর রোমা তাকে একেবারে কিনে ফেলার প্রস্তাব দেয়। এবার সালাহ ইতালির ক্লাবে চুক্তিবদ্ধ হতে দ্বিধাবোধ করেনি।

রোমাতে সালাহর এটাকিং পার্টনার ছিল ইদেন জেকো।। সেখানে ফারাও এর পজিশনে রাইট উইং-এ থাকলেও নাম্বার টেন কিংবা ফলস নাইনেও খেলতে অভ্যস্ত ছিলেন। ২০১৪/১৫ তে এস এস রোমার গোল ছিল যেখানে ৫৪, সালাহ আসার পর সেটা দাঁড়ায় ৮৩ – ওই মৌসুমে সিরি আ’র সর্বোচ্চ দলীয় গোল সংখ্যা। পরের মৌসুমে অর্থাৎ ২০১৬-১৭ তে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০ তে।

সালাহর স্কিল নিয়ে কারো কোন সন্দেহ না থাকলেও তার ফিনিশিং কোয়ালিটি নিয়ে কিছুটা সংশয় ছিল। তার পায়ে গতি ছিল, যেকোন টাইট ডিফেন্স ভেঙ্গে ফেলতে পারতো, পজিশন পরিবর্তন করে খালি জায়গা তৈরি করতো – সবই ঠিক ছিল, কিন্তু তুলির শেষ আঁচড়ে কিছুটা জড়তা ছিল যেটা বড় হয় ২০১৫/১৬ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের সাথে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ নকাউট খেলায়। হ্যাটট্রিক করার সুযোগ ছিল সালাহর, কিন্তু একটার পর একটা সুযোগ নষ্ট করায় হতাশায় শেষ হয় ইউরোপের দৌড়। সেই ম্যাচ পর ইতালি মিডিয়ায় সমালোচিত হন।

এরপর ফিনিশিং এর উপর জোর দেন সালাহ। কঠোর পরিশ্রমে করে ফিরে আসেন পরের মৌসুমে। ২০১৬/১৭ মৌসুমে সালাহর পা থেকে আসে ১৯ গোল এবং ১৫ অ্যাসিস্ট। ক্যারিয়ার সেরা পরিসংখ্যান। ওই সিজনে সালাহর ফিনিশিং রেট ১৯% থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ২২% এ। এমনকি তার ১৯ গোলের মধ্যে ৪টি করেন ডান পায়ে। ওই মৌসুমে অবশেষে সালাহ নিজেকে পরিপূর্ণ ফরোয়ার্ডে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন।

‘চেলসিতে আমি ছোট ছিলাম, চার বছর পর এখন আমার তিনটা ক্লাবে খেলার অভিজ্ঞতা হয়েছে। সবকিছু এখন অন্যরকম।’ – লিভারপুলকে দেয়া একটা সাক্ষাৎকারে ব্যক্ত করেন সালাহ।

সত্যিই সালাহ এখন পরিণত। পুরষ্কার হসেবে মাত্র ৩৪.৩ মিলিয়ন পাউন্ডে ফিরে আসেন ইংল্যান্ডে, তবে নীলের পরিবর্তে বেছে নেন ‘অল রেড’। এরপরের গল্পতো সবারই জানা।

অভিষেকে করেছেন গোল, অবদান ছিল বাকি গোলেও। লিগ রাইভাল আর্সেনালকে ৪-০ গোলে হারানোর পথে তার অদম্য সলো রানে করা গোল তাকে আবারো আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। এক সময়ের প্রিমিয়ার লিগ ফ্লপ কি তবে ফিরে আসল নতুন রুপে?

শুধু নতুন রুপে ফিসে আসেনি সালাহ, সিজনের অর্ধেক শেষ করেছেন প্রিমিয়ার লিগের সর্বোচ্চ গোল দাতা হিসেবে। ইতিমধ্যে করেছেন ক্যারিয়ার সেরা ১৭ লিগ গোল। অ্যাসিস্ট করেছেন আরো ৫ গোলে। শট অ্যাকুরেসি ৫১%। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে করেছেন ৬ ম্যাচে ৫ গোল।

এই সালাহকে আগে দেখেনি কেউ। যেন কোন ব্যাক্তিগত মিশন নিয়ে হাজির হয়েছেন প্রিমিয়ার লিগে। হ্যারি কেইনের সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে এখন লিগ টপ স্কোরারের অবস্থানে আছেন দুই এ। তবে মৌসুম শেষ হবার আগ পর্যন্ত বলা যাচ্ছেনা শেষ পর্যন্ত কে জিতবেন প্রিমিয়ার লিগ গোল্ডেন বল। তবে এই বছরের আফ্রিকান গোল্ডেন বল জিতে নিয়েছেন মুহামেদ মোমো সালাহ। আর জিতবেননা কেন? তার হাত ধরেইতো (পড়ুন ‘পায়ে চড়ে’) ২৮ বছর পর মিশর পৌঁছে গেছে রাশিয়া বিশ্বকাপে। ৯৫ মিনিটে তার নেয়া পেনাল্টি কিকে কঙ্গোকে ২-১ গোলে হারিয়ে পূরণ করেন তার শৈশবের স্বপ্ন। মিশরকে ২০১৮ দেখবে বিশ্বকাপে। সালাহর উত্থানের সাথে যেন হলো মিশরেরও উত্থান।

আর কতদুর যাবেন সালাহ? ইতোমধ্যেই স্প্যানিশ ক্যাপিটালের সাথে গুজব তৈরি হয়েছে। সময়ের সাথে পরিণত ছোট যাদুগর এর লক্ষ্য হয়ত আরো বড় ক্লাবে খেলার, বড় মঞ্চে, বড় উপলক্ষ্যে। তবে আপাতত লিভারপুলকে নিয়েই রুপকথা তৈরি করছেন দুরন্ত গতিতে। তার উত্থানে একই সাথে লিভারপুলও খোঁজে পেয়েছে নতুন গতি। অল রেডে সালাহ এখন আরো ধারালো, আরো উজ্জ্বল।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।