মেয়েদের খেলাধুলা: সম্মান দিন, সাফল্য আনুন

বর্তমানে নারীরা পুরুষদের চেয়ে কোন অংশেই পিছিয়ে নেই। পুরুষদের সাথে পাল্লা দিয়ে দেশের উন্নতিতে তাঁরাও বিরাট ভূমিকা রাখছে। বিভিন্ন পেশার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও এখন নিজেদের প্রমাণে ব্যস্ত বাংলাদেশের নারীরা। ইতোমধ্যে অনেক নারীই দেখে ফেলেছেন সফলতার মুখখানিও। তবে অন্যান্য পেশার চেয়ে খেলাধুলার সাথে নিজেদের যুক্ত করতে তুলনামূলক বেশি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় এদেশের নারীদের। অনেক পরিবারই তাদের মেয়েদের খেলাধুলা সেক্টরে দিতে চায় না।

এর পেছনে কাজ করে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা। খেলাধুলা করে বলে এখনো কিছু কিছু সমাজ মেয়েদের নিচু চোখে দেখে। খেলাধুলা করে বলে তাঁরা যেন সে সমাজের চোখের বিষে পরিণত হয়ে যায়। এসব সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা পেছনে ফেলে তবেই একজন নারীকে প্রতিযোগিতামূলক খেলার জগতে প্রবেশ করতে হয়। আবার সেখানেও তাদের অনেক সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়। এই যেমন: খেলাধুলার বিভিন্ন শাখায় কম সুযোগ সুবিধা ভোগ করা, অনেকসময় অবহেলার শিকার হওয়া ইত্যাদি। অথচ তাঁরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে এবং দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনে।

সম্প্রতি বিভিন্ন খেলাধুলায় নারীদের অভাবনীয় সফলতার পাশাপাশি তাদেরকে অবহেলা ও অবজ্ঞা করার কয়েকটি ঘটনা সামনে উঠে এসেছে। এইতো গত বছর এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ নারী ফুটবল বাছাইয়ে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ দলের ৯ জন খেলোয়াড়ের সাথে ঘটে যায় এক অপ্রীতিকর ঘটনা। তাঁরা ৯ জনই ময়মনসিংহের কলসিন্দুর গ্রামের বাসিন্দা। এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ নারী ফুটবল বাছাই শেষ করে ঈদের ছুটিতে লোকাল বাসে চেপে বাড়ি ফিরছিলেন তাঁরা।

আর সেই বাসেই চরম অপমানের শিকার হতে হয় তাদের। বাসে অবস্থানরত কয়েকজন তাদের উদ্দেশ্য করে বিশ্রী ভাষায় বকা ও গালিগালাজ করেন। যারা কিনা দেশের জন্য এত বড় সম্মান বয়ে আনলো তাদেরকেই কিনা বাসে ভোগান্তি পোহাতে হয়! এর জন্য দায়টা অবশ্য নিতে হবে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে। দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবেই বাফুফে নারী ফুটবলারদের বাড়ির পথে ছেড়ে দেয়। লোকাল বাসে দুর্ভোগ পোহাতে পোহাতে বাড়ি পৌঁছাতে হয় কলসিন্দুরের ৯ জন নারী ফুটবলারকে।

এমনকি বাসে ছিলো না বাফুফের কোন কর্মকর্তাও। ভূটানের সাথে হেরে যখন আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নির্বাসিত হয় বাংলাদেশ পুরুষরা তখনই এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ মহিলা ফুটবল বাছাইয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশের ফুটবলাঙ্গনে স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছিলেন সানজিদা-তাহুরারা। অথচ লাল সবুজের জার্সি গায়ে সাফল্যের মূল্যায়ন এভাবেই পেতে হয় তাদের।

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে ২০১৬ সালটা ছিলো নারীদের সাফল্যের জয়গাঁথায় পরিপূর্ণ। সে বছরের এসএ গেমসে ভারোত্তোলনে স্বর্ণজয়ের পর জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় মাবিয়া আক্তার সীমান্তের অশ্রুঝরার দৃশ্যটি নিশ্চয়ই ভুলে যাওয়ার কথা নয়। দেশকে একটি স্বর্ণপদক উপহার দেয়ার আনন্দে সেদিন কেঁদেই ফেলেছিলেন তিনি।

সেই এসএ গেমসে মাবিয়া আক্তারের পাশাপাশি আরেকজন নারী প্রতিযোগী মাহফুজা খাতুন শিলা সাঁতারে স্বর্ণপদক জিতেছিলেন। অথচ স্বর্ণপদক জিতে জাতীয় সংগীতের সময় মাবিয়ার কান্নার দৃশ্য বা শিলার স্বর্ণপদক জয়ের দৃশ্য আমরা নাও দেখতে পারতাম। এর পেছনে কারণ ফেডারেশনের বৈষম্য। এসএ গেমসের আগে সাঁতার ফেডারেশনের বৈষম্যের শিকার হয়ে সাঁতার ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত একপ্রকার নিয়েই ফেলেছিলেন মাহফুজা খাতুন শিলা। বিদেশি ট্রেনিং থেকে শুরু করে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার ক্ষেত্রে ফেডারেশনের নানা বৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন তিনি।

ফেডারেশনের অবহেলায় এসএ গেমসের ক্যাম্পেও যোগ না দেয়ার সিদ্ধান্ত মনে মনে নিয়ে রেখেছিলেন শিলা। কিন্তু এসএ গেমসকে সামনে রেখে বিদেশি কোচ পার্ক তেগুনের ঢাকায় আসার খবর শুনে নিজেকে স্থির করেন তিনি। পার্কের ওপর তাঁর বিশ্বাস ছিল যে ফেডারেশনের বৈষম্য তাকে ছু্ঁতে পারবে না। সে ভরসাতেই নিজেকে এসএ গেমসে খেলার জন্য মনস্থির করেন শিলা। তারপর পার্কের অধীনে তিনমাস ক্যাম্প করে ভারতের গৌহাটিতে এসএ গেমসে অংশগ্রহণ করে স্বর্ণপদক জিতে দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনেন মাহফুজা খাতুন শিলা।

একই ঘটনা ঘটে ভারোত্তোলক মাবিয়া আক্তার সীমান্তের ক্ষেত্রে। এসএ গেমসের গত আসরে ভারোত্তোলনের জন্য কোন অ্যাথলেটই পাঠাতে চায়নি বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ)। গত আসরের আগে ভারোত্তোলক সীমান্তের সম্পর্কে নানা কটু কথাও বলেছিলেন বিওএ এর কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্যমতে সীমান্তের সকল স্বর্ণ নাকি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছোটখাটো আসর থেকে এসেছে।

অথচ সেই মাবিয়া আক্তার সীমান্তই সকল কথার জবাব দিয়েছেন এসএ গেমসে স্বর্ণপদক জয়ের মাধ্যমে। একটা সময় সামাজিক বৈষম্যের শিকার হয়ে ভারোত্তোলন ছেড়ে অন্য কোন ডিসিপ্লিন বেছে নেয়ার সিদ্ধান্ত প্রায় নিয়ে ফেলেছিলেন সীমান্ত। ভাগ্যিস সেটা আর হয়নি। তা না হলে ভারোত্তোলনে একজন উজ্জ্বল প্রতিভাবান নারী অ্যাথলেটকে হারাতে হতো আমাদের।

নারী খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়েও আমাদের দেশে প্রচুর শঙ্কা রয়েছে। কয়েকদিন আগে দিনাজপুরে ঘটে যাওয়া এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর সেই শঙ্কা আরো জোরদার হয়েছে। সম্প্রতি দিনাজপুরের বড় ময়দানে প্রশিক্ষণের সময় আহত হন এক শিক্ষানবিশ নারী ক্রিকেটার। তারপর চিকিৎসার জন্য পাশের স্পোর্টস ভিলেজে এই আহত ক্রিকেটারকে নিয়ে গিয়ে তাঁর শ্লীলতাহানি করার চেষ্টা করেন কোচ আবু সামাদ মিঠু।

এ সময় চিৎকার করে নিজেকে রক্ষা করেন শিক্ষানবিশ ওই নারী ক্রিকেটার। এই আবু সামাদ মিঠু দ্বারা পূর্বে আরো অনেক নারী ক্রিকেটার যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া এমন ঘটনা বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এই প্রথম নয়। পূর্বে ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, কাবাডিতেও কোচদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অসংখ্য নারী খেলোয়াড়।

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের সাথে যুক্ত নারীদের বৈষম্য, অবহেলা, অবজ্ঞা ও যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার উদাহরণ ভুরি ভুরি। পারিবারিক, সামাজিক এমনকি নিজ ফেডারেশনের বৈষম্যেরও শিকার হতে হয় এদেশের নারী খেলোয়াড়দের। এখন প্রশ্ন হলো এসবের শেষ কোথায়? এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে তো খেলাধুলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে এদেশের নারীরা। এমনিতেই খেলাধুলার জগতে প্রবেশের পূর্বে পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলার জন্য একপ্রকার যুদ্ধ করতে হয় তাদের।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।