মেসুত ওজিল: আড়ালের নায়ক

মেসুত ওজিল একজন জার্মান শৈল্পিক ফুটবলারের নাম যিনি ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ‘অ্যাসিস্ট কিং’ হিসেবেই পরিচিত। ওজিল খুবই দ্রুতগামী, ক্রিয়েটিভ এবং টেকনিক্যাল প্লেয়ার। তিনি মাঝ মাঠ থেকে আক্রমণভভাগে থাকা তার সতীর্থদের এমনভাবে বল তুলে দেন যে গোল করতে তাদের কোন বেগ পেতে হয় না। আর এজন্যই অনেকেই তার নাম দিয়েছেন ‘অ্যাসিস্ট কিং’ কিংবা মি. ‘অ্যাসিস্ট মেশিন’।

মাঠে তিনি মূলত প্লে-মেকারের ভূমিকা পালন করেন, কখনো কখনো তাকে দেখা যায় বাম অথবা ডান প্রান্তের উইঙ্গার হিসেবে। আবার কখনো কখনো পিচের একেবারে মাঝখানে মধ্যমণি হয়ে সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের ভূমিকা পালন করেন তিনি।

মূলত বলের উপর ওজিলের অসাধারণ কন্ট্রোল, রেঞ্জ পাসে নিখুঁত নিশানা, নিখুঁত ক্রসিং ও দুর্দান্ত ভিশন তাকে করে তুলেছে একজন পারফেক্ট প্লে-মেকার। ওজিল প্রথমদিকে জেলসেনকির্সেনের বিভিন্ন যুব ক্লাবে খেলেন। এরপর তিনি ৫ বছর রট-উইস এসেনের হয়ে খেলেন।

এরপর ২০০৫ সালে ১৮ বছর বয়সে জার্মান ক্লাব শালকা জিরো ফোরের হয়ে সিনিয়র ক্যারিয়ার শুরু ওজিলের। ক্লাব কর্তৃপক্ষের সাথে বনিবনা না হওয়ায় ২০০৮ সালে তিনি শালকে ছেড়ে যোগদেন আরেক জার্মান ক্লাব ওয়েডার ব্রেমেনে।। তিনি তার দলকে ২০০৯ ডিএফবি পোকাল জেতাতে ও উয়েফা কাপের ফাইনালে তুলতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।

২০০৮-০৯ সালের বুন্দেসলিগায় ব্রেমেন ভাল না করতে পারলেও (দশম স্থান), ওজিল প্রতিটি খেলায়ই তার প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন এবং তিনটি গোল ও ১৫ টি গোলে সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে ওজিল তার অসামান্য প্রতিভার জানান দেন।

২০০৯-১০ মৌসুমে ব্রেমেন বুন্দেসলিগায় সম্মানজনক তৃতীয় স্থান লাভ করে; ওজিল ওই মৌসুমে ৩১ খেলায় ৯টি গোল ও ১৭ টি গোলে সহায়তা প্রদান করে।

জার্মানির জাতীয় দলের হয়ে ওজিলের অভিষেক হয় ২০০৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নরওয়ের বিপক্ষে এক ফ্রেন্ডলি ম্যাচে।। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি অ্যাসিস্ট কিং ওজিলকে।।

২০১০ বিশ্বকাপে জার্মানির হয়ে ৩ অ্যাসিস্টের পাশাপাশি গ্রুপ পর্বর গুরুত্বপূর্ণ শেষ ম্যাচে ঘানার বিপক্ষে বক্সের বাইরে থেকে অসাধারণ এক গোল দিয়ে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের জন্য মানে গোল্ডেন বলের জন্য নমিনেটেড হন ওজিল।।

২০১০ বিশ্বকাপে তার অসামান্য পারফরমেন্সে মুগ্ধ হয়ে ইউরোপিয়ান জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ তাকে ১৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে কিনে নেয়।।

রিয়ালের হয়ে প্রথম মৌসুমেই অসাধারণ পারফর্ম করেন ওজিল। সেই সিজনে মেজর লিগ গুলোর মধ্যে সরবোচ্চ ২৫ টি অ্যাসিস্ট করেন ওজিল। ২০১২ ইউরোতে ক্লাবের দুর্দান্ত নৈপুণ্য ধরে রাখেন এবং টুর্নামেন্টে যুগ্মভাবে সর্বো্চ্চ অ্যাসিস্ট মেকার হন (তিনটি)।

রিয়াল মাদ্রিদে ওজিল তিনটি দুর্দান্ত সিজন পার করেন। কিন্তু তারপরেও সবাইকে বিস্মিত করে রিয়াল মাদ্রিদ তাকে আর্সেনালের কাছে বেচে দেয়। রিয়ালের প্রতিটি দর্শককই ক্লাবের এই সিদ্ধান্তের প্রতি ক্রুদ্ধ ছিল।

অার্সেনালে তিনি কত ইউরোর বিনময়ে যোগ দেন তার অফিশিয়াল কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবুও তা ৬৩ মিলিয়ন ও ৫ বছর মেয়াদী বলে ধারনা করা হয়। এর মাধ্যমে তিনি এর মাধ্যমে মেসুত ওজিল জার্মানির সর্বকালের সবচেয়ে দামী খেলোয়াড়ে পরিণত হন।

আর্সেনালের হয়ে প্রথম সিজনেই দারুণ খেলেন ওজিল।। দীর্ঘ নয় বছর পর আর্সেনালকে ট্রফি জেতাতে প্রধান ভূমিকা রাখেন।। এছাড়া সেই বছর উয়েফার বর্ষসেরা দলের সদস্য হওয়ার পাশাপা শি ব্যালন ডি অরের জন্য আবারো নমিনেটেড হন ওজিল।

২০১৪ তে জার্মানির হয়ে বিশ্বকাপ জিতেন ওজিল। ২০১৪ বিশ্বকাপে তিনি দুটি অ্যাসিস্ট ও একটি গোল করেন। আর এই ২০১৪ বিশ্বকাপের কিছু খেলা রমজান মাসে পড়েছিল। আপনি জেনে হতবাক হয়ে যাবেন যে, রোজা রেখেই ওজিল বিশ্বকাপের প্রতিটি খেলা খেলতে মাঠে নেমেছিল। অথচ রোজা রাখার পরেও তার পারফর্মেন্সে একটুও ভাটা পড়েনি।

ওজিল ২০১১ থেকে ১৬ পর্যন্ত মোট ৫ বার জার্মান বর্ষসেরা ফুটবলারের খেতাব অর্জন করেন। একটানা চার বার এই পুরষ্কার জেতার পর মাঝে ২০১৪ তে একবার এই পুরষ্কার রিয়াল মাদ্রিদের তারকা ক্রুসের হাতে উঠে।

জিনেদিন জিদান, রোনালদিনহো, বেকহামের মতো গ্রেট খেলোয়াড়দেরকে ইতো মধ্যেই অ্যাসিস্ট সংখ্যায় ছাড়িয়ে গেছেন ওজিল। বয়স সবে মাত্র ২৮। ইনজুরিতে না পড়লে সর্বকালের সেরা অ্যাসিস্ট মেকার হওয়া সময়ের ব্যপার মাত্র।

হোরে মরিনহোর চোখে, ওজিল একেবারেই অনন্য। তাঁর কোনো জুড়ি পাবেন না। এমনকি কোনো বাজে সংস্করণও না।ওজিলের খেলার সহজাত স্টাইল ও অসাধারণ সব অ্যাসিস্ট এর কারণে মরিনহো ওজিলকে একবার জিনেদিন জিদানের সাথেও তুলনা করেছিলেন।

জাবি আলেনসোর মতে, ‘ওজিলের মত খেলোয়াড় আজকের দিনে পাওয়া যাবেনা।সে খেলাটা খুব ভাল বুঝে এবং তার পর্যবেক্ষন দ্বারা সে সমন্বয় করে দলের আক্রমণের দুয়ার খুলে দেয়।

ফিলিপ লামের দৃষ্টিতে যারা ওজিলের সাথে খেলেছে তারা জানে সে কতটা বুদ্ধিমান। লামের দেখা সে সেরা ভিশনের অধিকারী খেলোয়াড়।

তবে মেসুত ওজিল সম্পর্কে সম্ভবত সবচেয়ে সেরা মন্তব্যটা করেছেন জার্মানি অনূর্ধ্ব দলের ম্যানেজার হোর্স্ট রুবেশ। তিনি মনে করেন, জার্মানির একজন নিজস্ব মেসি আছে, আর সেই মেসি হলেন মেসুত ওজিল!

ওজিলের শৈল্পিক ফুটবলে বিমোহিত হন না, বাতি লাগিয়ে খুঝেও এমন ফুটবলপ্রেমী পাওয়া অসম্ভব। ওজিলের শৈল্পিক ফুটবলে বিমোহিত হয়ে তাকে নিয়ে গ্রেটদের এসব মন্তব্য থেকেই তো স্পষ্ট বোঝা যায় ওজিল কি মাপের খেলোয়াড়!

জাতীয় দলের হয়ে ক্যারিয়ারটা অবশ্য এই ওজিল বুক ভরা আক্ষেপ নিয়েই শেষ করেছেন। সর্বশেষ ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে বাজে পারফরম্যান্সের পর ওজিল ও জার্মানিকে বিদায় নিতে হয় প্রথম পর্ব থেকেই। কলঙ্কজনক এই পারফরম্যান্সের সুবাদে তাঁকে বর্ণবাদী আক্রমণও করে বসে উগ্র সমর্থকরা। আক্ষেপ নিয়ে বিদায় জানান ওজিল। যাওয়ার আগে কেবল বলেন, ‘জিতলে আমি জার্মান, হারলে আমি শুধুই শরণার্থী।’

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।