মেসি করলে লীলাখেলা, রোনালদো করলে পাপ

খ্যাতি যত বেশি, হেটারের সংখ্যাও নাকি সেই অনুপাতে বাড়তে থাকে। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের মধ্যে অন্যতম ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। যাই করেন না কেন দুয়ো তাঁকে শুনতেই হয়। তিনি আগে পেনাল্টি নিলেও বলা হয় চাপ কমাতে আগেভাগে পেনাল্টি নিয়ে নিয়েছেন, পরে নিলেও শুনতে হয় জেতার পর সব লাইমলাইট নিজের দিকে আনার জন্য নিয়েছেন এমনকি দলের অন্য সবাই পেনাল্টি মিস করে তাঁর পেনাল্টি নেয়ার সুযোগ না আসলেও তাঁকে শুনতে হয় তাঁর নাকি পেনাল্টি নেয়ার সাহসই নেই।

তিনি একাধারে গোল করার জন্য এবং না করার জন্য ট্রলের শিকার হন। বাদ যায়না তাঁর পরিবার, সন্তান বা ব্যক্তিগত জীবন। তাঁর সম্মানার্থে তৈরি করা মূর্তিকে নিয়েও ট্রল করা হয়। আর এই ট্রল গুলোর সিংহভাগ আসে রাইভাল বার্সাশিবিরের ফ্যানবেস থেকে। তাঁদের অনেকের মতে মেসি সেরা কিন্তু রোনালদো সেরার তালিকায় দ্বিতীয় হওয়ার যোগ্যতাও রাখেন না।

সকল ট্রফি, সকল অ্যাওয়ার্ডের যথার্থতা নিয়েই প্রশ্ন উঠে যায় যখন রোনালদোর ঘরে সেটি যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়- সেই তালিকায় লিগ শিরোপা থেকে শুরু করে ব্যালন ডি’ওর কিছুই বাদ যায়না। গোল হোক বা না হোক মেসির দেড় মিনিটের ড্রিবলিং করে ৪জন ডিফেন্ডার কে পাশ কাটানোর মধ্যে রোমাঞ্চ আছে, সাস্পেন্স আছে, সৌন্দর্য আছে। আরেকজনের পাস করা বল রোনালদোর মাথায় লেগে গোল হয়ে যাওয়ার মধ্যে কোন সাহিত্য নেই, সৌন্দর্য নেই!

এই প্রতিভা, এই সৌন্দর্য্যের জন্যেই মেসিভক্তদের কাছে তিনি কখনো গোলসংখ্যা, কখনো ব্যালন ডি’অর, কখনো ইউ সি এল বা আন্তর্জাতিক কোন ট্রফি, কখনো বা তাঁর দলের থেকেও ব্যক্তি মেসি বড় হয়ে যান। কিন্তু একজন রোনালদো কখনো গোলসংখ্যার চাইতে বড় হতে পারেন নি। বরং সেই গোলসংখ্যায় কত গুলো পেনাল্টি ছিল, কত গুলো ট্যাপ ইন ছিল এসব পরিসংখ্যান নিয়ে আলোচনা করা হয়। একজন রোনালদো ট্রফি সংখ্যার থেকেও বড় হতে পারেননি।

এই রোনালদোকে দলের সমস্ত ভুলের দায়ভার একাই নিতে হয় নিজের কাঁধে। ইউরো ফাইনালে ইনজুরিতে নিজের ক্যারিয়ার ঝুঁকিতে থাকার আশংকা নিয়েও পর পর তিনবার নিজের দেশের হয়ে মাঠে নামার চেষ্টা করেও যখন পারেন নি, কাঁদতে কাঁদতে নেতৃত্ব দিয়েছেন মাঠের বাইরে থেকেই, তাঁর দলও জিতেছে সেই ট্রফি তবু ‘চিয়ারলিডার’ নামক দুয়ো শুনতে হয়েছে তাঁকে!

রোনালদো ডাইভ দেন- এ নিয়ে তাদের অভিযোগের শেষ নেই, অথচ সকল ফুটবলারই কমবেশি ডাইভ দিয়ে থাকেন। এই তালিকায় নাম নেই এমন ফুটবলার খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বার্সেলোনা তারকা নেইমার, সুয়ারেজ যে রীতিমতো প্রায় ম্যাচেই তা করে থাকেন তা ভুলে বসে থাকেন রোনালদোকে ট্রল করা বার্সা ফ্যানরা। এমনকি মেসিও যে ৩-৪বার ডাইভ দিয়েছেন তার প্রমাণ ইউটিউব ঘাটলেই পাওয়া যাবে।

রোনালদোর বিপক্ষে সবচেয়ে বেশি যেই অভিযোগটি তারা তুলে থাকেন তা হলো রোনালদো নাকি ডি বক্সের বাইরে বের হন না। তিনি ডি বক্সে বলের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন কখন বল তার পায়ে আসবে এবং গোল দেন। এবং শুধুমাত্র এই বক্সে থেকেই তিনি ফুটবল দুনিয়ার সেরা গোল স্কোরারে পরিণত হয়েছেন। আসুন দেখি, চিত্রটা কি ঠিক এমন?

সকার লাডুমা ওয়েবসাইটের মতে ম্যাচ প্রতি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর কভার করা মাঠের দূরত্ব ৮.৩৮ কিলোমিটার, মেসির ক্ষেত্রে এটি ৭.৬ কিলোমিটার। শুধুমাত্র ডি বক্সের ভেতরে থেকে কীভাবে ম্যাচ প্রতি এত দূরত্ব অতিক্রম করা সম্ভব সেটি একটি প্রশ্নই বটে।

মাদ্রিদিস্তা ওয়ার্ল্ড-এর একটি প্রতিবেদনে রোনালদোর এই অপবাদ নিয়ে একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনে দেখা যায়, বার্সা শিবিরের মূল স্ট্রাইকারত্রয়ী এমএসএন এর লা লিগাতে গোলসংখ্যার শতকরা ৮৭ ভাগ এসেছে ডি বক্সের ভেতর থেকে। মেসি, সুয়ারেজ এবং নেইমার শেষ মৌসুমে মোট ৭৯ টি গোল করেন যার মধ্যে ৬৮টি গোলই ছিল ডি বক্সের ভেতর থেকে।

আলাদা আলাদা ভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় নেইমারের ১৩টির মধ্যে ১২টি গোল ছিল বক্সের ভেতর থেকে। সুয়ারেজের মোট ২৯টি গোলের মধ্যে ২৮টি গোলই ছিল ডি বক্সের ভেতর থেকে। শুধু এরা দুজনই নয়, মেসির মোট ৩৭ গোলের মধ্যেও ২৮টি ছিল বক্সের ভেতর থেকে।

এত সব পরিসংখ্যান এটাই প্রমাণ করে যে, যে সকল কারণে রোনালদো সীমা ছাড়াই সমালোচিত, অপমানিত হয়ে যাচ্ছেন – সেই একই কাজগুলো অহরহ করেও অন্যান্য যেকোন খেলোয়াড়ই করে পার পেয়ে যাচ্ছে। এমনকি রোনালদোর প্রতিদ্বন্দ্বী মেসিও। মনের দুঃখে তাই ক্রিশ্চিয়ানো গান ধরতেই পারেন, ‘মেসি করলে লীলাখেলা, আমি করলে পাপ। কিছু হলেই হেটাররা বলে, আমার মুখটা খারাপ।’

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।