মৃত্যুও তাঁদের আলাদা করতে পারেনি

এম্পায়ার হাউজ, কলকাতা। ব্যাকস্টেজের পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকলেন সময়ের অন্যতম সেরা সুপুরুষ শশী কাপুর। তাঁর ভালবাসা ভরা দু’টি চোখ আটকে গেল এক তরুণীর ওপর। সাদা-কালো রঙা জামায় সেদিন ইংরেজ অভিনেত্রী জেনিফার কেন্ডালকেও কম আকর্ষণীয় লাগছিল না।

প্রথম দেখায় সেদিন প্রেম হয়ে গিয়েছিল শশী কাপুরের। নি:সন্দেহে বলিউড সুপারস্টার সেদিন ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি যে এই তরুণীই তার জীবন পাল্টে দেবেন।

না, ওই সময় শশী সুপারস্টার ছিলেন না। ১৮ বছর বয়সী এই তরুণ কাজ করতেন থিয়েটারে। জেনিফার ছিলেন তার চেয়ে বছর পাঁচেকের বড়। দেখা হওয়ার পরদিনই ওই থিয়েটারে দু’জনের আলাপ হয়।

জেনিফারের বোন ফেলিসিটি কেন্ডাল তার আত্মজীবনী ‘হোয়াইট কার্গো’-তে সেই সময়ের স্মৃতি চারণা করে গেছেন। জেনিফার কাজ করতেন শেকসপিয়ারানা থিয়েটারে। আর শশী ছিলেন কাপুরদের পৃথিবী থিয়েটারে।

এম্পায়ার হাউজের কতৃপক্ষ একই দিনে দু’টি থিয়েটারের শো’র দিনক্ষণ ঠিক করে রেখেছিল। তাই তো এই কালজয়ী প্রেমকাহিনীটা হল! যদিও, গল্পটা তখন মোটে শুরু, ৮০ দশকে ক্লাসিক ভারতীয় রোমান্টিক সিনেমার মত ক্লাইমেক্সটা তখনও বাকি।

জেনিফারের বাবা, মানে শেকসপিয়ারানা’র কর্ণধার জিওফ্রে কেন্ডাল পৃথিবীরাজ কাপুরের কাছ থেকে ‘ধার’ করে এনেছিলেন তাঁর থিয়েটারের জন্য। তবে, মেয়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার মত অবস্থায় তিনি ছিলেন না।

এমনকি ওই সময় ছেলের পছন্দকে মেনে নিতে চাননি পৃথিবীরাজ। এমনকি, বাবার আজেবাজে মন্তব্যের কারণে তখন শশীর বাড়িতে ঠিক বনিবনাও হত না। বাধ্য হয়ে বাড়ি ছেড়ে দিয়েছিলেন।

জিওফ্রেও তাই চাইতেন শশী ও জেনিফারের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাক। যদিও সেটা হয়নি। অসীম ছাবরার লেখা শশী কাপুরের জীবনী ‘শশী কাপুর: দ্যা হাউজ হোল্ডার, দ্য স্টার’-এ তার মেয়ে সানজানা বলেছেন, ‘ওরা (শশী ও জেনিফার) যখন থিয়েটার করতেন তখন গরিব জীবন যাপন করতেন। তারা রাতে ঘুমাতে পারতেন না, পেট ভরে খেতে পারতেন না। এক-আধটা পরোটার জন্য তারা পারলে রাস্তায় নেমে যেতেন। তারা কোনো খাবারের দোকানের বাইরে দিয়ে হেঁটে যেতেন, আর দেখতেন আমার দাদু জিওফ্রে কেন্ডাল বিয়ারের সাথে পেটপুরে এক গাদা খাবার খাচ্ছে। আমার বাবা ওখানে যেতেন না। কারণ, একই সাথে তিনি ছিলেন দাদুর কর্মচারী। ওই সময় বিবাদে জড়ানোর মত অবস্থাতে তিনি ছিলেন না।’

জিওফ্রে যখন কোনো ভাবেই নিজের অভ্যাস পাল্টাচ্ছিলেন না, তখন বাধ্য হয়ে জেনিফার ও শশী শেক্সপিয়ারানা ছেড়ে দেন। তখন শশীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তার ভাই শাম্মি কাপুর ও তার স্ত্রী গীতা বালি। যদিও তাদের বড় ভাই রাজ কাপুর এই সম্পর্কের ব্যাপারে কিছুই জানতেন না।

একবার বিদেশে গিয়ে শশী জেনিফারের একটি শো ক্যান্সেল হয়ে যায়। শশী তখন বাধ্য হয়ে বড় ভাই রাজের কাছে সাহায্য চায়। তখন তিনি মুম্বাইয়ে দু’টি ফিরতি টিকেট পাঠান। কাপুররাই ১৯৫৮ সালে দু’জনের বিয়ে দিয়ে দেন।

৩৩-এ, সাদ্দার স্ট্রিট, কলকাতার ফেয়ারলন হোটেলের ১৭ নম্বর ঘরে বিয়ের পরের প্রথম কয়েকটা দিন কাটান শশী ও জেনিফার। ঘরটা এখন তাই ‘দ্য শশী কাপুর রুম’ নামে পরিচিত।

১৯৮৩ সালে কানে গিয়ে জেনিফার অ্যামোবিক ডিসেন্ট্রিতে আক্রান্ত হন। পরে ধরা পরে তার শরীরে বাসা বেঁধেছে কোলন ক্যান্সার। উচ্চতর চিকিৎসার জন্য তাকে লন্ডনে পাঠানো হয়। সেখানে একটা সার্জারি করে জানা যায়, ক্যান্সারের শেষ পর্যায় চলছে, এখান থেকে বাঁচানো মুশকিল।

শশী আর তার তিন সন্তান করণ, কুনাল ও সানজানা – সবাই খুব ভেঙে পড়েন। জীবনের শেষ ক’টা দিন বাবা মার সাথে লন্ডনের ব্রিটিশ ক্যাপিটাল হাসপাতালে কাটান জেনিফার।

জেনিফার চলে যান ১৯৮৪ সালে। সাথে সাথে শশী কাপুর হারান নিজের আশ্রয়। স্ত্রী চলে যাওয়ার পর তিনি প্রচণ্ড ভেঙে পড়েন। যেন, মাঝ সমুদ্রে ঝড় ঝাপটার মাঝে আটকে পড়া এক বিপণ্ন নাবিক। ছেলে কুনাল স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘তখনই প্রথমবারের মত বাবাকে কাঁদতে দেখি। সত্যি, ও রীতিমত ফোঁপাচ্ছিল।’

দু:খ ভুলতে রীতিমত রূপালি পর্দার মতই হাতে বোতল নেন। আশির দশকের সেই হ্যান্ডসাম ভদ্রলোকটি অ্যালকোহলের সামনে নিজেকে বিসর্জন দেন। খাদ্যাভ্যাস পাল্টে যায়, শরীরে নানা রকম রোগ বাসা করে নেয়। স্ট্রোক আর হার্ট অ্যাটাকের কারণে বলিউডের শশী নামের বাতিটা তখন নিভু নিভু করে চলছিল। ২০১৭ সালের চার ডিসেম্বর, মৃত্যুর শেষ দিন অবধি তার ডায়ালাইসিস চলে।

ব্রিটিশ চিত্রনাট্যকার হানিফ কুরেশি শশীর জীবনীতে বলে গেছেন, জেনিফার মৃত্যু কখনোই মেনে নিতে পারেননি শশী। তিনি বলেন, ‘জেনিফারের মৃত্যু ছিল ওর জীবনে বড় একটা ধাক্কা। এটা আক্ষরিক অর্থেই ওর জীবনকে ধ্বংস করে দেয়।’

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।