মুশফিকের উইকেটকিপিং কী হুমকির মুখে!

২০১৭ সালের প্রথম তিন মাসে মুশফিকুর রহিম টেস্টে রান করেছেন ৫১৫, যা কিনা ২০০৫ সালে তাঁর অভিষেকের পর থেকে এক ক্যালেন্ডার ইয়ারে সর্বোচ্চ। এক্সট্রা বাউন্স কিংবা স্পিন, উইকেট যেমনই হোক না কেন, উইকেটে মুশফিক এখন আগের তুলনায় অনেক আশ্বাস প্রদানকারী এক ব্যাটসম্যান। কিন্তু মুশফিকের ব্যাটিংয়ের এই উন্নতিটা এসেছে তার উইকেটকিপিংয়ের বিনিময়ে। আর মুশফিকের ছেড়ে আসা জুতায় পা গলানোর জন্য প্রস্তুত হয়ে আছেন দুজন তরুণ উইকেটকিপার।

নুরুল হাসান ও লিটন দাসের এখনো খুব বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সৌভাগ্য হয়নি, কিন্তু সীমিত সুযোগের মধ্যেই দুজন তাদের প্রতিভার ছাপ রেখেছেন। দুজনের মধ্যে নুরুলকে তুলনামূলক ভালো উইকেটকিপার ধরা হয়, আবার লিটনকে তুলনামূলক ভালো ব্যাটসম্যান, কিন্তু জাতীয় দলে কিপারের জায়গাটা এখনো কেউই পাকাপাকিভাবে নিতে পারেননি।

নুরুলকে প্রথমে বাজিয়ে দেখা হয় টি-টোয়েন্টিতে, তারও প্রায় এক বছর পর সুযোগ মেলে ওয়ানডেতে। লিটনের অবশ্য এক ২০১৫ তেই তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে, কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটে যে অমিত সম্ভাবনা দেখিয়ে জাতীয় দলে এসেছিলেন তিনি, সেই প্রতিভার প্রতি সুবিচার তিনি এখনো পর্যন্ত করে দেখাতে পারেননি। তাঁর সবচেয়ে সাম্প্রতিক সুযোগটা এসেছিল এ বছরেরই মার্চে, যখন শ্রীলঙ্কায় মুশফিককে শুধু বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলতে বলা হয়েছিল। গল টেস্টে ব্যাট হাতে ৪০ রান করার পাশাপাশি উইকেটের পেছনে দুইটি ক্যাচও নিয়েছিলেন লিটন, কিন্তু কলম্বো টেস্টের আগে নেট প্র্যাকটিসে পাঁজরে আঘাত পেয়ে কলম্বো টেস্ট থেকে ছিটকে পরেন তিনি।

কলম্বোতেই মুশফিক উইকেটকিপারের ভূমিকায় ফিরে আসেন, এবং গত পাঁচ বছরের তুলনায় যথেষ্ট ভালো কিপিং করেন সে ম্যাচে। এরপর ওডিআই এবং টি-টোয়েন্টিতেও দারুণ কিপিং করেন মুশফিক। তাঁর এমন পারফরম্যান্স বোর্ড প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসানকে পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য করে, মুশফিক দারুণভাবেই ফিরে এসেছেন।

টেস্টে বিবেচনা করা হচ্ছে লিটন দাসকে।

তামিম ইকবালকে যেভাবে ওপেনিং পজিশনের জন্য সৌম্য সরকার ও ইমরুল কায়েসের সাথে লড়াই করতে হয়েছে, মুশফিককেও তেমনি কিপিং পজিশনের জন্য নুরুল ও লিটনের সাথে লড়তে হয়েছে। নুরুল ও লিটনকে আরও অপেক্ষা করতে হবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কতদিন?

লিটন জন্মেছেন এবং বড় হয়েছে ঢাকা থেকে প্রায় ৩০০ কি.মি. উত্তর-পশ্চিমের শহর দিনাজপুরে। সাকিব, মুশফিকদের মত ক্রিকেটার জন্ম দিয়েছে যে প্রতিষ্ঠান, সেই বিকেএসপিতে পাঠানো হয় লিটনকেও। স্কাউটদের নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে মুগ্ধ করে দ্রুতই বয়সভিত্তিক দলে জায়গা করে নেন। ২০১২ এবং ২০১৪ তে দুটো অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপ খেলেছেন। শুধু খেলেনই নি, টুর্নামেন্ট গুলোতে ৫০ এর অধিক গড়ে রানও করেছেন।

২০১৪-১৫ মৌসুমে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের একদিনের ক্রিকেট ভার্শনে ৬৮৬ রান করে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হয়েছিলেন। সাথে জাতীয় লিগে ৮৫.৩৩ গড়ে ১০২৪ রান করে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের খেতাবও জুটেছিল লিটনের গলাতেই।

কিপার-ব্যাটসম্যান হিসেবেও লিটন শুরুতে নিজের ছাপ রেখেছেন, বৃষ্টিবিঘ্নিত অভিষেক টেস্টে ভারতের বিপক্ষে ৪৪ রানের ইনিংস খেলে। কিন্তু প্রথম ১৫ টি আন্তর্জাতিক ইনিংসে মাত্র একটি পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস থাকায় নির্বাচকেরা বাদ দেন লিটনকে। ফার্স্ট ক্লাস ডাবল সেঞ্চুরি করে প্রায় এক বছর পরে কামব্যাক করেছিলেন তিনি, কিন্তু ইনজুরির কারণে আবারো ছিটকে পড়তে হল।

লিটন যেখানে স্ট্রোকপ্লে দিয়ে মাতিয়ে রাখতে পারেন, নুরুল সেখানে একজন প্রফুল্লচিত্ত লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে তুলেছেন। নুরুল প্রথম নজর কাড়েন ২০১৪ তে, বার্বাডোজে বাংলাদেশ এ দলের হয়ে ৮৫ মিনিট ব্যাটিং করে ম্যাচ বাঁচানোর কৃতিত্ব দেখিয়ে। শেষ ব্যাটসম্যান রবিউল ইসলামকে সুরক্ষা দিয়ে শেলডন কটরেল, মিগুয়েল কামিন্স ও কার্লোস ব্র্যাথওয়েটদের ইয়োর্কার ও বাউন্সার সামলে গেছেন। এক পর্যায়ে টেল এন্ডারকে আউট অফ স্ট্রাইক রাখার জন্য ইচ্ছা করে শর্ট বলগুলোতে সিঙ্গেল বের করে গেছেন।

খুলনায় জন্ম নেয়া নুরুল ফুটবলার বাবার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে গোলকিপার হিসেবে খেলা শুরু করেছিলেন। একদিন পাড়ার ক্রিকেট টিমে একজন উইকেটকিপারের সংকট দেখা দেয়, তখন তারা নুরুলকে ডেকে পাঠায়। সাবেক বাংলাদেশি ক্রিকেটার শেখ সালাউদ্দিনের তত্ত্বাবধানে নুরুল ধীরে ধীরে নিজেকে একজন ভরসাযোগ্য কিপারে পরিণত করে তুলেছেন।

সীমিত ওভারের ক্রিকেটে দেখা মিলবে সোহানের।

নুরুলও বয়সভিত্তিক দলে নিজেকে নিয়মিত করে তোলেন। তখন থেকেই লিটন ও অন্য সমসয়াময়িক কিপারদের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে ছিলেন নুরুল। এখন পর্যন্ত নয়টি টি-টোয়েন্টি, দু’টি ওয়ানডে ও একটি টেস্ট খেলেছেন নুরুল। কোন ফরম্যাটেই সাত নম্বরের উপরে ব্যাট করার সুযোগ পাননি। ছোট এই ক্যারিয়ারে বলার মত একটি ইনিংসই খেলতে পেরেছেন, ক্রাইস্টচার্চ টেস্টে ৯৮ বলে ৪৭ রানের ইনিংস। বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্ট এখন মানসম্মত কিপিংয়ের উপর বেশি জোর দিচ্ছে, যা কিনা নুরুলের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।

মুশফিকের ক্যারিয়ারের বড় একটা বাঁকবদল ছিল ২০০৭ বিশ্বকাপের দলে খালেদ মাসুদকে টপকে জায়গা পাওয়া। মূলত মাসুদের চেয়ে ভালো ব্যাটিং গুণাগুণ থাকায় বেছে নেয়া হয়েছিল মুশফিককে। পোর্ট অফ স্পেনে ভারতকে হারানো ম্যাচে অপরাজিত ফিফটি করে নির্বাচকদের আস্থার মান রেখেছিলেন মুশফিক।

এভাবে দল থেকে বাদ পরে মাসুদের ক্যারিয়ারই শেষের পথে চলে যায়। ২০০৭ বিশ্বকাপের পরে আরও ৩ টি টেস্ট খেলেছিলেন তিনি, কিন্তু ততদিনে নিজের ফর্ম হারিয়ে ফেলেছিলেন মাসুদ। এরপর খুব দ্রুতই মাসুদের জায়গাটা নিয়ে নিয়েছিলেন মুশফিক।

মুশফিকুর এখন নিজেকে অনেকটা একই রকম অবস্থায় আবিষ্কার করতে পারেন। প্রতিভাবান কিপারেরা তাঁর জায়গা নেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। জাকির হাসানের মত আরও তরুণেরা পাইপলাইনে অপেক্ষা করছেন, যারা কিনা ঘরোয়া ক্রিকেটেও ভালো করছেন।

কিন্তু মাসুদ নিজে মনে করেন মুশফিকের এই প্রতিযোগিতা নিয়ে ভাবার একটুও দরকার নেই, কেবল সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজের কাজের উপর ফোকাস করাই যথেষ্ট।

কপাল পুড়বে মুশফিকের?

মাসুদ বলছেন, ‘মুশফিক দারুণ ধারাবাহিক একজন ক্রিকেটার, অনেক দিন ধরে সে নিয়মিত পারফর্ম করে চলেছে। অন্য কিপারেরা কি করছে সেটা না ভেবে সে কেবল নিজের পারফরম্যান্সে উন্নতি আনার উপরেই মনোযোগ দিতে পারে। সে এখন যে জায়গায় আছে, সেখান থেকে কেবল আরও ভালো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হওয়ার উপরেই মনোনিবেশ করতে হবে, পাইপলাইনে কে ভালো করছে সেটা তাঁর দেখার দরকার নেই। সে তাঁর উইকেটকিপিংয়ের মানটাকে একটা উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে, বাকি কিপারদের সেখান থেকেই শুরু করতে হবে। বাকিদের জন্য তাই মুশফিককে সরানো এত সহজ হবে না।’

মুশফিকের প্রতিদ্বন্দ্বীদের ব্যাপারে তাঁর অভিমত ‘লিটন খুব ভালো ব্যাটসম্যান, নুরুলও প্রায় কাছাকাছি মানেরই। নিঃসন্দেহে নুরুল ভালো কিপারও। কিন্তু তাদের মুশফিকের মত ধারাবাহিক হতে হবে। এটা অবশ্যই কঠিন, কিন্তু মুশফিক নিজের মান এমন পর্যায়ে তুলে এনেছে, যার সাথে খাপ খাওয়ানোটা আসলেই কঠিন হবে।’

মাসুদ যেখানে উইকেটকিপার মুশফিকের জয়গান গাইছেন, বাকিরা সেখানে মজে আছে ব্যাটসম্যান মুশফিকে। সাম্প্রতিককালের সফরগুলোতে তাঁর ব্যাটিংয়ে পরিণতবোধটা আরও বেড়েছে, যতক্ষণই উইকেটে ছিলেন, দলকে ভরসা যুগিয়েছেন। সব ধরণের কঠিন পরিস্থিতিতেই বুক চিতিয়ে লড়াই করে গেছেন।

উইকেটের পেছনে এই প্রতিযোগিতা মুশফিকের অল-রাউন্ড দক্ষতাকে আরও শাণিতই করবে। এই লড়াইয়ে যেই জিতুন না কেন, লাভবান হবে বাংলাদেশ ক্রিকেটই।

– ইএসপিএন ক্রিকইনফো অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।