কনস্টেবলের ছেলে থেকে মুম্বাইয়ের মাফিয়া সম্রাট

ভাই, বিগ ব্রাদার কিংবা বস, যার মাথার দাম আড়াই কোটি টাকা, ৭০-এর দশকের কুখ্যাত সিন্ডিকেট ‘ডি কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠাতা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যাবতীয় অবৈধ অবৈধ অর্থ পাচার, মাদক-অস্ত্র ব্যবসা খুন-অপহরণের মূল হোতা – কার কথা বল হচ্ছে পাঠকরা নিশ্চয়ই ধরে ফেলেছেন। তিনি আর কেউ নন, যে ‘ডন কো পাকারনা মুশকিল হি নেহি, নামুমকিন হ্যায়’; তিনি হলেন আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিম কাসকার।

মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে অন্ধকার জগতে

মহারাষ্ট্রের রত্নগিরিতে খুব স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পরিবেশেই ১৯৫৫ সালের জন্ম হয় দাউদের। বাবা ছিলেন পুলিশের হেড কন্সটেবল। মিথ আছে, তিনি চাকরী জীবনে যথেষ্ট সৎ ছিলেন। কে জানতো তারই ছেলে একদিন ভারত-পাকিস্তান কিংবা আরব আমিরাতের আন্ডারওয়ার্ল্ড জগৎ নিয়ন্ত্রন করবে!

দাউদরা ১১ ভাই-বোন ছিলেন। কিন্তু, চারজন বাদে বাকিদের ব্যাপারে বিস্তারিত জানা যায় না। মা ছিলেন গৃহিনী। মুম্বাইয়ের ডোংরিতে টেমকার মহল্লায় থাকতেন তারা। হাইস্কুলের পর আর পড়াশোনা এগোয়নি দাউদের। মাত্র ১৪ বছর বয়সে বিপথগামী হয়ে যান তিনি।

মুম্বাই রেলস্টেশনে এক ব্যক্তি টাকা গোনার সময় তা ছিনিয়ে নিয়ে দৌঁড় দেন। ঘটনা বাবার কানে যায়। বাবা অনেক মারধোর করেন। বাবার এমন কড়া শাসনও সৎ পথে ফেরাতে পারেনি ইব্রাহিমকে।

ওই সময়ই ব্যবসায়ী-গ্যাংস্টার হাজি মাস্তানের সংস্পর্শে আসেন দাউদ। জড়িত হয়ে পড়েন অন্ধকার জগতে। করিম লালা গ্যাংয়ে কাজ করা শুরু করেন। করিম লালা মূলত ছিলেন হাজি মাস্তানেরই লোক। বড় ভাই শাবির ইব্রাহিম আগের থেকেই ছিলেন অপরাধজগতে।

হাজি মাস্তানের সাথে বিরোধ ও ডি-কোম্পানির উত্থান

নজর কাড়তে খুব কম সময় নেন দাউদ। সত্তর দশকে হাজি মাস্তানের ‘ডান হাত’ বনে যান তিনি। ‘ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন মুম্বাই’ সিনেমায় দু’জনের ঘণিষ্টতার চিত্রটা ভালভাবেই এসেছে। তবে, সেই সম্পর্কে এক সময় ভাটা পড়ে। কোনো এক হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে মাস্তানকে ছেড়ে চলে যান দাউদ। ভাই শাবিরের সাথে আলাদা হয়ে গঠন করেন ‘ডি কোম্পানি’।

পরবর্তীতে দাউদের বন্ধু ডেইলি রাজদরের সম্পাদক ইকবাল ন্যাতিককে হত্যা করে হাজী মাস্তানের কাছের লোক সৈয়দ বাটলা। আর বিচার চাইতে গেলে এ হত্যার শাস্তি হিসেবে মাস্তান শুধু একটি থাপ্পড় দেন বাটলাকে, সেটা দাউদের কাছে উপযুক্ত মনে হয়নি। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে বাটলাকে হত্যা করেন দাউদ। এর ফলে দু’জনের মধ্যে বিরোধ আরো বাড়ে।

তবে, এই হ্ত্যা দাউদকে আরো ওপরে নিয়ে যায়। রিয়েল এস্টেট, শিপিং ব্যবসা ও শেয়ারবাজারে এই সময় ব্যাপক বিনিয়োগ শুরু করেন দাউদ ইব্রাহিম ও শাবির ইব্রাহিম। আস্তে আস্তে বড় ভাইয়ের আড়ালে দাউদ ইব্রাহিম হয়ে উঠতে থাকেন মুম্বাইয়ের মাফিয়া সম্রাট।

বড় ভাই শাবিরই দাউদকে নিয়ে এসেছিলেন অপরাধ জগতে। সেই সময় ডোংরি এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী ছিলেন বাসু দাদা। বাসু দাদাকে ঠেকাতে দুই ভাই মিলে তরুণদের নিয়ে এক সন্ত্রাসী গ্রুপ গঠন করেছিলেন, সেটাই কালক্রমে হয়ে ওঠে ডি-কোম্পানি; ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত সন্ত্রাসী সংগঠন।

আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ অপরাধী এই চক্রটি হত্যা, গুম, অপহরণ, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, হুন্ডি ব্যবসা সহ সব রকম অবৈধ কাজের সাথে জড়িত। এই চক্রটি থেকেই ছোটা শাকিল, টাইগার মেমোন, ইয়াকুম মেমোন, আবু সালেম, ছোটা রাজন, ইজাজ লাকডাওয়ালা কিংবা অরুণ গৌলির মত সন্ত্রাসীরা বেড়ে উঠেছে। সেসব রোমহর্ষক ঘটনা না হয় আরেকদিন শোনা যাবে।

চলবে…

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।