মুমিনুলের জন্য আমরা কী করেছি!

তিন নম্বরে ২৩ ইনিংসে রান ৮১১, গড় ৩৬.৮৬

চার নম্বরে ১৭ ইনিংসে রান ৮৭৭, গড় ৬২.৬৪

চার টেস্ট সেঞ্চুরির তিনটিই চারে, একটি তিনে

মুমিনুল হকের পরিসংখ্যান। মুমিনুল আর তিন নম্বর পজিশনের সাধারণ যে ধারণা, সেটির প্রেক্ষিতেই পরিসংখ্যানটি দেওয়া।

বলছি না যে, তিনে মুমিনুল পারেনি বা পারবেন না। না পারার কারণ নেই। তবে নরম্যালি সবাই যেভাবে বলেন, ‘তিনে মুমিনুলের রেকর্ড দারুণ’, বা ‘তিনেই লাগবে মুমিনুলকে’, এসব কথা স্ট্যাটিসটিক্যালি ভুল!

আরেকটটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। চার সেঞ্চুরির মধ্যে প্রথমটিতেই কেবল শুরুতে নতুন বল খেলেছেন মুমিনল। নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে নেমেছিলেন ৮ রানে ২ উইকেট পড়ার পর। চার নম্বরে বাকি দুই সেঞ্চুরির একটিতে নেমেছিলেন যখন দলের রান ৫৫, আরেকটি দলের রান ৮১। মানে বল তখন পুরোনো।

এমনকি তিনে নেমে সেঞ্চুরি করেছেন যে ইনিংসে, সেটিতেও নেমেছিলেন ১৪তম ওভারে। বল যখন একটু পুরোনো…

ক্যারিয়ারের শুরু থেকে নবম টেস্ট পর্যন্ত টানা চারে খেলেছেন মুমিনুল। তখন তার ব্যাটিং গড় ছিল ৬২.৬৪… পরের ১৩ টেস্ট টানা খেলেছেন তিনে। গড় নামতে নামতে হয়েছে ৪৬.৮৮!

মজার ব্যাপার হলো, পরিসংখ্যান দিয়েই আবার একটি উল্টো যুক্তি দেওয়া যায়। চার নম্বরে ১৭ ইনিংসে ৮ বার পঞ্চাশ ছুঁয়েছেন মুমিনুল। এর তিনটিকে নিতে পেরেছেন তিন অঙ্কে। দুটি আবার অপরাজিত। চারে গড় অনেক বেশি হওয়ার একটি একটি বড় কারণ। তিন নম্বরে ২৩ ইনিংসে ৬ বার স্পর্শ করেছেন পঞ্চাশ। কিন্তু এর মাত্র একটিকে নিতে পেরেছেন তিন অঙ্কে। ৫টিই আটকে গেছে ৫৩ থেকে ৮০ রানের মধ্যে! এছাড়া ৪৮, ৪০, ৩৫, ৩০, ২৭, ২৭ আছে। মানে বেশ কটি ইনিংস ছিল সম্ভাবনাময়। বেশ কবার আউট হয়েছেন থিতু হয়ে।

এই পরিসংখ্যান থেকে দুটি দিক দেখতে পারেন। প্রথমত, তিন ও চার নম্বরের আলোচনায় ওপরে যে বলা হয়েছে, নতুন বলে সমস্যা হয়ে থাকতে পারে, সেটি আসলে ঠিক নয়। কারণ নতুন বল সামলেই অনেক কটা ইনিংসে থিতু হয়েছেন মুমিনুল। দ্বিতীয়ত, তিন নম্বরে তার সমস্যাটি হয়েছে বড় ইনিংস খেলতে না পারায়। বারবার থিতু হয়ে আউট হয়েছেন। আগের একশগুলি নেমে এসেছে পঞ্চাশ-ষাটে। আস্তে আস্তে আর কম। এখন একাদশর বাইরে।

এবার আসি মূল বক্তব্যে। মুমিনুল চারে সবশেষ খেলেছেন ২০১৪ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে। অনেকে হয়ত ভুলে গেছেন, সেই সফরেই স্বয়ং আমাদেরই টিম ম্যানেজমেন্ট হঠাৎ একটি তত্ত্ব জন্ম দিয়েছিল, ‘শর্ট বলে মুমিনুলের সমস্যা আছে।’ দেশের ক্রিকেটে সবাই চমকে গেছেন, মুমিনুলের গুরু সালাউদ্দিন ভাই চমকে গেছেন। এ ধরণের কথা আগে কেউ শোনেনি। বরং শর্ট বলটা মুমিনুল ভালোই সামলাতে পারতেন বলে জানত সবাই। এসবে বিতর্ক হয়েছে, আলোচনা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি যেটা হয়েছে, মুমিনুলের আত্মবিশ্বাসে ঘুন ধরেছে।

সেবার দেশে ফেরার পর জিম্বাবুয়ে সিরিজ থেকে মুমিনুলের তিনে খেলা শুরু। ওই সিরিজে একটি সেঞ্চুরি করেছিলেন। ঘুন পোকা হয়ত কেবল কাজ শুরু করেছিল। যেটির কুফল বোঝা গেছে পরে। আত্মবিশ্বাস ঝুরঝরে হয়ে গিয়েছিল, চারের মুমিনুলকে তিনে পাওয়া যায়নি।

মুমিনুল জানতেন, তার ব্যাটিং মাইক্রোস্কোপের নিচে পড়ে গেছে। প্রতিপক্ষ তো বটেই, নিজেদের লোকেরাই খুঁত ধরতে বসে থাকে। খুঁতটা ঠিক করার জন্য নয়, তাকে শুনিয়ে ধাক্কা দেওয়া জন্য। মানসিক ধাক্কা। সবশেষ গত শ্রীলঙ্কা সফরে গল টেস্টের পর বলা হলো মুমিনুলেল অফ স্পিন খেলায় সমস্যা। এবং এক সময়ের অপরিহার্য মুমিনুলকে বাদ দেওয়া হলো শততম টেস্টে। ব্যস, ‘মুমিনুল অমুক খেলতে পারে না, তমুক খেলতে পারে না’ – এই মিশন সাকসেসফুল। ছেলেটার আত্মবিশ্বাস তলানীতে।

ওপরে তিন-চার নম্বরের একটি পরিংসখ্যান দিয়েছিলাম। একই পরিসংখ্যান একটু ঘুরিয়ে দিচ্ছি। ‘বাউন্স খেলতে পারে না’ তত্ত্ব জন্মের আগে মুমিনুলের গড় ছিল ৬২.৬৪। এই তত্ব জন্মের পর মুমিনুলের গড় ৩৬.৮৬! আত্মবিশ্বাসে ঘুন পোকা ছেড়ে দেওয়ার ফলটা দেখেছেন?

আবারও মনে করিয়ে দেই, আমাদের সবশেষ টেস্টে মুমিনুল একাদশ থেকে বাদ পড়েছিলেন! তার সবশেষ সেঞ্চুরির পর পেরিয়ে গেছে ১৭ ইনিংস। এই সময়টায় পঞ্চাশ ছাড়াতে পেরেছেন কেবল চার বার। পারফরম্যান্সে নিশ্চিত ভাটার টান। কিন্তু এটাই কি সব? তার অতীত রেকর্ড, সামর্থ্য, তার সম্ভাবনা, সবচেয়ে বড় কথা, তার আত্মবিশ্বাসটা ধরে রাখার জন্য হলেও তাকে খেলিয়ে যাওয়া কি উচিত ছিল না?

কিন্তু অপেক্ষাই চলছিল কখন এই সময়টা আসে আর তাকে বাদ দেওয়া হবে। কাজেই আরো সময় তাকে কিভাবে দেবে? বরং আজ হোক বা কাল, বাদ দিতই, যদি দিতে চায়!

তিন-চার নিয়ে এত কথা বললাম স্রেফ বলতে হয় বলেই। ক্যারিয়ারই তো মোটে ২২ টেস্টের, এত কাঁটাছেড়া কিসের। কিন্তু এটাই যে হচ্ছে! ২২ টেস্ট… ফর গডস সেক, ৪২-৫২ টেস্ট নয়!

২২ টেস্ট শেষে শচিন টেন্ডুলকারেরও ছিল ৪টি সেঞ্চুরি, গড় ছিল মুমিনুলের চেয়ে ঢের কম, ৩৯.২৫। গ্রাহাম গুচের ছিল ১টি সেঞ্চুরি, গড় ৩৫.২০। রিকি পন্টিংয়ের দুটি সেঞ্চুরি, গড় ৩৬.৬৩। স্টিভ ওয়াহর সেঞ্চুরি ছিল না, গড় ২৮.৭৩। জ্যাক ক্যালিসের ২ সেঞ্চুরি, গড় ৩০.৮৭। মাহেলা জয়াবর্ধনে, ৩ সেঞ্চুরি, গড় ৪২.৮৪। এই যুগের এবি ডি ভিলিয়ার্স ৩ সেঞ্চুরি, গড় ৪১.২০। আরও অনেক নাম বলা যায়।

যাদের নাম বললাম, তাদের অনেকেরই শুরু ভালো হয়নি। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা, অনেক শ্রম ও প্রক্রিয়ায় তারা ওই পর্যায়ে গেছেন। মুমিনুল এখন তাদের তুলনায়ই আসতে পারেন না। কিন্তু তার ত্যাগ-তিতিক্ষা আমরা দেখি, তার শ্রম, তার ঘাম আমরা রোজ দেখি মাঠে গিয়ে। কিন্তু তাকে নিয়ে প্রক্রিয়া কি ঠিক চলছে? আমরা পারছি?

মুমিনুল দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে প্রতিভাবান ও সবচেয়ে পরিশ্রমী ক্রিকেটারদের একজন। ফেরার পথ সে ঠিকই বের করে নেবে। কিন্তু আমরা তাকে কতটা সাপোর্ট দিতে পেরেছি বা পারছি?

চার থেকে তিনে সরিয়ে আমরা হয়ত তার কমফোর্ট জোন কেড়ে নিয়েছি। কিন্তু যেটা বললাম ২২ টেস্ট মাত্র…ওপরে দেখিয়েছি তিন-চার মুখ্য সমস্যা নয়, পাঁচ-ছয়ে খেললেও সমস্যা ছিল না। সমস্যা হলো, আমরা তার মানসিক কমফোর্ট জোন কেড়ে নিয়েছি! আমরা তার ব্যাটিং পজিশন নিয়ে চিৎকার করি। অথচ তার মানসকতার পজিশন নাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে!

ক্রিকেট যতটা শরীরের খেলা, তার চেয়ে বেশি মাথা আর মনের খেলা। মুমিনুলের মাথা আর মনের সংযোগে আমরা গণ্ডগোল পাকিয়ে দিয়েছি। শচিনদের চলার পথ মসৃণ করার চেষ্টা করেছে সংশ্লিষ্টরা, আমরা মুমিনুলের পথ করেছি বন্ধুর।

একজন মুমিনুল হকের জীবন তাই খুব কঠিন!

– ফেসবুক থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।