মুক্তি ও একজন জ্যাকব

ফেসবুকের নিউজফিডে দেখলাম ‘মুক্তি’ নামক একটা শর্ট ফিল্ম বেশ ভাইরাল হয়েছে। সেখানে দেখানো হয়েছে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ঠিক আগের মুহূর্তের কাহিনী যেখানে মেজর জেনারেল জ্যাকব জেনারেল নিয়াজিকে আত্মসমর্পণ করতে রাজি করায়। একেকজন একেকভাবে দেখছে ব্যাপারটাকে।

আমি কোন মুক্তিযুদ্ধ বিশেষজ্ঞ না। তবে কিছুটা জানাশোনা আছে। ঠিক ওই সময়ে কার কি অবস্থা ছিল সেটাও জানা আছে মোটামুটি।

পশ্চিম পাকিস্তান তখনই হেরে গিয়েছে যখন হাদারামের দল ৩ ডিসেম্বরে পশ্চিম ফ্রন্টে ইন্ডিয়ান এয়ারফোরসে বিমান ঘাটিতে হামলা করে বসে। ওরা চেয়েছিল ভারতীয়দের বিমান সব ধ্বংস করে ফেলবে কিন্তু উল্টা নিজেদের যা এয়ার-পাওয়ার ছিল সেটাও হারায় আসে ওই হামলায়। এর পরেই ভারত সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করে বসে।

এর আগে পর্যন্ত তারা আমাদের অস্ত্র দিয়েছে (সোভিয়েত অস্ত্র), গেরিলা ট্রেনিং দিয়েছে ইন্ডিয়ান আর্মির ট্রেইনাররা বিভিন্ন ক্যাম্পে, ইন্ডিয়ান স্পাই এজেন্সির (RAW) ট্রেইনাররা প্ল্যানিং-এর আইডিয়া দিয়েছে কিভাবে পূর্ব পাকিস্তানে হামলা করতে হবে স্পর্শকাতর সব টার্গেটে। কিন্তু এই ৩ ডিসেম্বরের আগে পর্যন্ত এতগুলা কাজ ভারত করলেও ফিল্ডে ছিল কারা? এই হামলা গুলা এক্সিকিউট করেছে কারা?

‘মুক্তিবাহিনী।’

কোন ইন্ডিয়ান ট্রুপ ৩ ডিসেম্বরের আগে পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকে নাই। যা করার সব মুক্তিবাহিনী করেছে।

১০ ডিসেম্বরে ইন্ডিয়ান নেভি আমেরিকান নেভির মেসেজ ইন্টারসেপ্ট করে যেখানে বলা ছিল ওয়াশিংটন গ্রিন সিগন্যাল দিয়েছে, যাতে সপ্তম ফ্লীট ওয়ার জোনে প্রবেশ করে (বে অফ বেঙ্গল)। এটা পাওয়ার সাথে সাথে ভারত তার একমাত্র বন্ধু সোভিয়েত কে জানায়। ওই সময়কার ভারত- সোভিয়েত ট্রিটির একটা পয়েন্ট ছিল এরকম যে ভারত কারও দ্বারা আক্রমণের স্বীকার বা সেরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে সোভিয়েতরা ভারতকে রক্ষা করার জন্য যা যা লাগে করবে। এবং সোভিয়েতরা সাড়াও দেয় সাথে সাথে।

সোভিয়েতরা তাদের নিউক্লিয়ার পাওয়ায়ারড ন্যাভাল ফ্লিট ভারত মহাসাগরের রেডি রেখেছল এরকম পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য। অর্ডার পেয়ে এটা বে অফ ব্যাঙ্গলের মুখে চলে আসে যাতে আমেরিকানরা দেখতে পায় যা তাদের এখানে ঢুকতে হলে রাশিয়ানদের পার হয়ে ঢুকতে হবে। এর পিছনেই ছিল ইন্ডিয়ান নেভি সব শক্তি নিয়ে।

এরকম যখন অবস্থা তখন ঢাকায় ৭০ হাজার পাকিস্তানি আর্মির সদস্য আটকা পড়েছে। কোন এয়ার সাপোর্ট নাই কারন ভারতীয় বিমান বাহিনী ৩ ডিসেম্বরের পর পাল্টা আক্রমণ করে পাকিস্তান এয়ারফরসের মায়ের বাপ করে দিছে। যেই চট্টগ্রাম হয়ে পালাবে সেটাও বন্ধ করেছে মুক্তিবাহিনী। আর সাগরে ইন্ডিয়ান নেভি।

এরকম কন্ডিশনে পাকিস্তানের একমাত্র উপায় ছিল একটা ‘সিজফায়ার চুক্তি’ করে যুদ্ধে বিরতি দিয়ে আরও লোকজন, অস্ত্র নিয়ে আবার হামলা করে সবাইকে কচুকাটা করা। তারা সেটাই করতে যাচ্ছিল। কিন্তু ওখানেই আসে এই ‘জ্যাকব’ – জ্যাকব ফার্জ রাফায়েল।

মেজর জেনারেল জ্যাকব তখন ইন্ডিয়ান আর্মির ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান। এই কমান্ডকেই নির্দেশ দেয়া হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে ঢোকার যখন ভারত যুদ্ধ ঘোষণা করে অফিসিয়ালি। এই লোক অনেক চালাক প্রকৃতির ছিল। আর দশটা আর্মি কমান্ডারের মত না। ১৯৬৫ এর ভারত- পাকিস্তান যুদ্ধে সে কৃতিত্ব দেখিয়েছিল ভালোভাবেই। তো এই লোক নিয়াজিকে কি করে ম্যানেজ করলো এটা আসলে কেউ জানে না। কেউ কখনও প্রকাশও করে নাই।

বাস্তবতার খাতিরে বলতে গেলে, এই জ্যাকব যদি সেদিন নিয়াজিকে আত্মসমর্পণ না করাতো, আর পাকিস্তান যদি জাতিসংঘে সিজফায়ার পাশ করে ফেলতো, আমার সন্দেহ আছে আমরা আসলে কবে ‘বাংলাদেশ’ পেতাম। কারন সিজফায়ার হলে আর কেউ তো যুদ্ধ করতে পারতো না, এক মাস ধরে পাকিস্তান সব জায়গায় শক্তি বৃদ্ধি করে কি যে করতো সেটা যে কেউ অনুমান করতে পারে। এরপর স্বাধীনতা আসলেও ঠিক কত দিন পরে আসতো কেউ জানে না।

এই শর্টফিল্মে যেটা দেখানো হয়েছে সেটা সত্য কিনা আমি জানি না। কেউই জানে না। তবে যেটাই হোক না কেন জ্যাকব পেরেছিল এমন একটা কাজ যেটা ভারত কিংবা পাকিস্তানের কোন কুতুবই চিন্তাও করতে পারে নাই, বাস্তবে আনা তো পরের কথা।

এবং ওই একটা দুঃসাহসিক কাজের জন্য তার প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞতা। ওই একটা কাজেই দেখায় দিছে সে যতটা না ভালো মিলিটারি কমান্ডার, তার থেকেও সাহসী একজন মানুষ।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।