মা কথা বলতে বারণ করেছে ‘সুবোধ’কে

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেয়াল কখনোই নিছক দেয়াল ছিল না। দেয়ালকে সবসময়ই ভেবে আসা হয়েছে শিল্পের ক্যানভাস হিসেবে, কিংবা কোন মহাকাব্যিক রাজনৈতিক কর্মকান্ডের পান্ডুলিপি হিসেবে। সেই ব্রিটিশ শাসনামল থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমল ও তারপর বাংলাদেশের সামরিক সরকার, দেয়াল লিখন সবসময়ই হয়ে ছিল একটি প্রজন্মের পরিবর্তনের চিহ্নস্বরূপ।

২০১৭ গ্রীষ্মের কোন এক সময়, আগারগাঁওয়ের আশপাশের এলাকায় সিরিজ আকারে বিশেষ এক ধরণের ‘গ্রাফিতি’ চোখে পড়তে থাকে। এই গ্রাফিটিগুলোর একমাত্র চরিত্র ‘সুবোধ’। এর সব কটিতে লেখা: ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, এখন সময় পক্ষে না।’ ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, মানুষ ভালোবাসতে ভুলে গেছে।’ ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, তোর ভাগ্যে কিছু নেই’, কিংবা ‘সুবোধ এখন জেলে, পাপবোধ নিশ্চিন্তে বাস করছে মানুষের মনে’। আর এই প্রতিটি দেয়ালচিত্রের লোগো আকারে ব্যবহার করা হয়েছে একটি শব্দ: ‘হবেকি’ (HOBEKI?)।

এইসব গ্রাফিতির প্রথমটির দেখা মিলবে পুরনো এয়ারপোর্টের পাশে অবস্থিত জাতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের চারিদিকের দেয়াল জুড়ে। দ্বিতীয়টি দেখা যাবে শেরে বাংলা নগর সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের কাছে। আর তৃতীয়টি দেখা যাবে মিরপুর ৭-এ পূরবী সিনেমাহলের কাছে।

কর্মক্লান্ত ঢাকা শহরের কাজের চাপে নিষ্পেষিত তরুণ সমাজ বেশ সাদরেই গ্রহণ করেছে এসব গ্রাফিতি। তরুণ প্রজন্ম তাদের প্রাত্যহিক জীবনের ছাপ খুঁজে পায় এইসব গ্রাফিতির মাঝে। এবং আরেকটু বয়স্ক দর্শকরা এইসব গ্রাফিতি দেখে উপাদান খুঁজে পান তাদের ফেলে আসা অতীত ও স্বর্নালি অতীতের স্মৃতি রোমন্থনের।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

মঙ্গল শোভাযাত্রা ও ফোক কালচার রিচার্চ অ্যান্ড এক্সপ্যানশন সেন্টারের সদস্য সচিব আমিনুল হাসান লিটু বলেন, সুবোধকে নিয়ে তৈরি হওয়া গ্রাফিতিগুলো ৮০ কিংবা ৯০ এর দশকের জনপ্রিয় ধারার গ্রাফিতির চেয়ে কিছুটা ভিন্ন।

লিটু বলেন, আগে গ্রাফিতির দেখা মিলত কেবলই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে, এবং অধিকাংশ গ্রাফিতিরই জনক ছিল চারুকলার শিক্ষার্থীরা, অথবা রাজনৈতিক কর্মীরা।

সুবোধকে তিনি মনে করেন আজকের বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজ বাস্তবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে। তিনি বিশ্বাস করেন সুবোধ অপেক্ষা করছে সেই সুবর্ণ সুযোগের, আর তার হাতে থাকা খাঁচাবন্দি সূর্য নির্দেশ করছে অপেক্ষায় থাকা ইতিবাচক চিন্তাসমূহের – যেটিকে অভিহিত করা যায় ২০১৭ সালের নগরসভ্যতার আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হিসেবে।

লিটু, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছেন এবং ছিলেন দেশের একদম প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার অন্যতম আয়োজক, মনে করেন সুবোধের গ্রাফিতিগুলোর মধ্য দিয়ে যে ক্রোধের বার্তা তুলে ধরা হয়েছে, সেটি মূলত সেই বিষবাষ্পের বহিঃপ্রকাশ যা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে, এবং একইসাথে সংখ্যালঘুদের ওপর অন্যায় অত্যাচারের।

তিনি প্রশ্ন করেন, ‘সুবোধ কি পালাতে পারবে? আমি নিজে কি পালাতে পারব? আমরা পালিয়ে কোথায় যাব?’

হবেকি কি?

এই গ্রাফিটিগুলোর শিল্পীদেরকে খুঁজে বের করার প্রথম উদ্যোগটি একদম মাঠে মারা যায়। ফেসবুকে একদম প্রথম এই গ্রাফিটিগুলোর আলোকচিত্র নিয়ে যেসব পোস্ট দেখা গিয়েছিল, সেগুলো তুলেছিল গ্রাফিটিগুলো দেখে মুগ্ধ-বিমোহিত পথ-চলতি মানুষেরা। তার কিছুদিন পর এই সকল গ্রাফিটির যে মূল থিম অর্থাৎ ‘হবেকি’, তা নিয়ে ফেইসবুকে একটি পেজও খোলা হয়। সেই পেজে খোঁজখবর নেয়ার চেষ্টা করা হলেও কোন প্রত্যুত্তর মেলেনি।

অরমা দত্ত, ঢাকাকেন্দ্রিক একজন সমাজকর্মী, বিশ্বাস করেন সুবোধ প্রতিনিধিত্ব করছে বর্তমান সমাজের সংখ্যালঘু শ্রেণীর মানুষের চরম দুরাবস্থার।

তিনি বলেন, ‘সুবোধ, তোর উচিৎ যত দ্রুত সম্ভব নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে যাওয়া, কারণ এখানে তোর নিজের জীবন নিয়ে ভালো কিছু করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। এখানে কোন নিরাপত্তা নেই, আর তুই এই রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে কিছুই আশা করতে পারিস না।’

অরমা হতাশা প্রকাশ করেন যে কিভাবে এদেশের সংখ্যালঘুরা প্রতিনিয়ত বঞ্চনা আর অত্যাচারের শিকার হচ্ছে, এবং কিভাবে তারা ক্রমান্বয়ে তাদের মৌলিক মানবাধিকার হারাচ্ছে, নিজেদের হয়ে কথা বলার শেষ সুযোগটাও হারাচ্ছে। তিনি মনে করেন সুবোধ হলো এই নৈরাশ্যবাদিতারই প্রতিমূর্তি।

সুবোধ কেন পালাচ্ছে?

গত ১৫ জুন, বৃহস্পতিবার দুপুর দু’টোর দিকে দুইজন সাংবাদিক আবহাওয়া অধিদপ্তরের বাইরে দাঁড়িয়ে গ্রাফিটিটা দেখছিলেন। অতি সম্প্রতি যে দেয়ালে চুনকামের চেষ্টা চালানো হয়েছে, তা ছিল খুবই স্পষ্ট। দিনটা ছিল গরম আর দুঃসহ। ঘর্মাক্ত অবস্থায় ওই দুই সাংবাদিক আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন গ্রাফিতিটার মাধ্যমে ‘কিছু একটা’ বুঝতে পারার। রাস্তার ওপাশ দিয়ে তাদের দিকে লক্ষ্য রাখছিল তিন কিশোর। সাংবাদিকদ্বয় যেই না তাদের ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করলেন গ্রাফিতিটার কয়েকটা ছবি তোলার উদ্দেশ্যে, ছেলেগুলো এগিয়ে এল, আর জিজ্ঞেস করল, ‘আপনারা কি মিডিয়ার লোক?’

এই একটি প্রশ্নের মাধ্যমেই পরবর্তি কয়েক মিনিট ধরে দুই পক্ষের মধ্যে চলল এক ‘র‌্যাপিড ফায়ার’ আলাপচারিতা। দুই পক্ষই বলতে থাকল তারা গ্রাফিতিটা সম্পর্কে কতটুকু কি জানে। ছেলেগুলোও জানত না গ্রাফিটিগুলো কার হাত থেকে আঁকা হয়েছে।

ছেলেগুলোর মধ্যে একজন, সাইফুল (ছদ্মনাম), বলতে শুরু করল গ্রাফিতিগুলো তাকে ঠিক কতটা আকর্ষণ করে, ‘এটা তো আমাদেরই গল্প। এটা আমাদের অসহায়ত্বের গল্প। চারপাশে যা সব হচ্ছে –  খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতি, এমনকি শিক্ষাব্যবস্থায়ও জোর করে বিদ্যা গেলানোর প্রবণতা, এবং পাশ করার পর আমাদেরও কি বেকারত্ব বরণ করে নিতে হবে তা নিয়ে নিত্যদিনের আশংকা, সব মিলিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত ভয়াবহ দিনযাপন করছি।’

কথা চলতে থাকে, ‘আমরা মাত্র কিছুদিন আগেই এইচএসসি পরীক্ষায় বসেছি। পরীক্ষাগুলো ছিল অতি জঘন্য। অনেক চাপ সহ্য করতে হয়েছে আমাদের – পরিবার, শিক্ষক, পরিচিতজন সব মহল থেকে। কোথাও বিন্দুমাত্র অনুপ্রেরণার হদিস পাইনি, কি কারণে কি করছি তাও কখনো জানতে পারিনি। আমরা একটা যান্ত্রিক জীবন যাপন করছি। এটা যেন গতানুগতিকতা আর একঘেয়েমির একটা দুঃসহ চক্র। আমরা যে অবচেতন মনে পালিয়ে যেতে চাই, সুবোধ সেটারই একটা বহিঃপ্রকাশ মাত্র। আমাদের চারপাশে যেসব অন্যায় অনাচার হচ্ছে, সুবোধ সেগুলোকেই নির্দেশ করে।’

সাইফুল পাথরকঠিন চাহনি নিয়ে তাকায়, যা তার কোমল, নিষ্পাপ মুখাবয়বের সাথে একদমই মানায় না। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, নিজের ঠোঁটে দাঁত দিয়ে কামড় দেয়, আর তারপর পায়ের দিকে, পায়ের তলার মাটির দিকে তাকায়। তারপর সে আবারও মুখ তুলে তাকায়। বলে, ‘আপনারা যদি বের করতে পারেন এই সুবোধের পেছনে কে বা কারা আছে, দয়া করে আমাকে জানাবেন। আমি তাদেরকে একটা ধন্যবাদ দিতে চাই।’

ছেলেগুলো সাংবাদিকদের সাথে নিজেদের ফোন নম্বর বিনিময় করে। এবং তারপর তারা বিদায় নিয়ে চলে যায়।

তিনদিন বাদে সাইফুলকে ফোন করা হয় এ প্রসঙ্গে আরও কিছু প্রশ্ন করার জন্য। কিন্তু তার তরফ থেকে কোন সাড়া মেলে না। তাকে বারবার কল করা হতে থাকে, টেক্সট মেসেজও পাঠানো হয়। কিন্তু তারপরও সাইফুলের কোন খোঁজ নেই। এক অজানা ভয় এসে গ্রাস করে সাংবাদিকের মন। এবার অন্য আরেকটা নম্বর থেকে সাইফুলকে ফোন করা হয়।

সাইফুল ফোন ধরে, ‘কে বলছেন?’

– ‘আমি পত্রিকা অফিস থেকে বলছিলাম। সেদিন আমাদের দেখা হয়েছিল আগারগাঁওয়ে। আমরা সুবোধের গ্রাফিটি নিয়ে আলাপ করছিলাম।’

– ‘ওহ, না! আমার মা আমাকে বারণ করে দিয়েছে এই প্রসঙ্গে আর যেন কারও সাথে কথা না বলি। আমি আর এ বিষয়ে কোন কথা বলতে পারব না।’

সে আর কথা না বাড়িয়ে ফোন রেখে দেয়। তার শেষ কয়েকটা শব্দে নিঃসন্দেহে কিছু একটা মিশে ছিল। কি সেটা? ভয়, শঙ্কা নাকি অসহায়ত্ব?

ঢাকা ট্রিবিউন অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।