মাহিনের গল্প || ছোটগল্প

পিচ্চি মাহিন এবার স্কুলে ভর্তি হয়েছে। মাহিনের অবাক করা কিছু গুন ছিলো,যা প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে পাওয়া যায়নি। গাজিপুর শহরের হাইওয়ে রাস্তা। মাহিন মায়ের হাত ধরে প্রতিদিন স্কুল থেকে আসা-যাওয়া করে। মাহিন ও মা হাত দেখিয়ে রাস্তা পার হয়।পার হয়ে যাওয়ার পরে, ছোট হাতের ইশারায় থেমে থাকা সব গাড়িকে এগিয়ে যাওয়ার জন্যে ভঙ্গী করে।

মাহিনের কাজকর্ম অনেকের কাছে কোনো ঘটনাই মনে হচ্ছেনা তাই না?এই দেশেরই রাস্তায় চলন্ত গাড়ির  সামনে বাঁদর নাচ নেচে ঠিক সার্কাসরোচিতভাবে রাস্তাঘাট পারাপার করেন। দেশের অনেক জায়গায় এদের দেখা যায়। সেখানে খুদে পথচারী গাড়ির কথা ভাবছে, এটা নিঃসন্দেহে ব্যাতিক্রম বইকি তাই না?

জুনের শেষের দিকে মাহিনের চোখ দু’টি নষ্ট হয়েগেছে।

স্কুল থেকে ফেরার পথে রাস্তা পার হওয়ার সময়, মাতাল ড্রাইভার মাহিনকে চাপা দেয়। সেদিন মাহিনের হাত ইশারা করা হয়নি,এরপরে ঘন্টাখানিক সময়ের মধ্যে দুইটা বাস দুর্ঘটনা করে। এখানেই ৩০-৪০ জনের জীবন কেড়ে নেয়। মাহিন আর কখনোই দেখতে পারবেনা। ডাক্তার ঘোষনা করে দিয়েছেন, দু’টি চোখেই নষ্ট হয়েগেছে।

হসপিটালের বেডে শুয়ে শুয়ে মাহিন, শহরের গাড়ির কথা চিন্তা করে। ভাবে ঠিকভাবে গাড়ি যাওয়া আসা করছে তো? এতো অন্ধকার কেন মা?জিঙ্গেস করে মাকে। মা উওর করতে বুকটা ফেটে যায়।এখন রাত বাবা সকাল হলে তুমি দেখতে পারবে। মা সকাল হলে আমায় তো তুমি স্কুলে নিয়ে যাবে তাইনা?

মা শব্দহীন কান্না করে। উওর করতে পারেনা।শুধু মিথ্যা আশা দেন। মাহিনের আর কখনোই সকাল দেখা হবেনা। দেখা হবেনা সেই চিরচেনা বাস স্ট্রেশন,নদীতে ভেসে যাওয়া ডিঙি নৌকা। হবেনা দেখা নিজ চোখে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নময়ী মুখ।

মাহিনের বন্ধুরা দেখতে আসলে, সে বকা দেয়। তোরা রাতে কেন আসিস? রাতে কি তোদের দেখা যায়? আমি রাতে শুধু জোনাকি পোকার আলো দেখি, শিয়াল মামার ডাক শুনি। তোরা দিনের আলোয় এলে ভালো হয়।মাহিনের কথা শুনে আর পিচ্চিরা ভয় পেয়ে যায়।মাহিনের শুধু রাত, দিন নাই।

চকোলেট প্রেমী মাহিনের জন্যে বন্ধুরা বক্স ভর্তি চকোলেট নিয়ে আসে, যা না দেখেই খেতে হয়। আর খুদে বন্ধুরাও, বন্ধুর জন্যে চোখের জল ফেলে। মায়ের বুকটা চিৎকারে ভেসে যায়। মাহিন কে বুকে জড়িয়ে নিশ্চুপ কাঁদে। আর মাহিন সকালের অপেক্ষায় থাকে, যে সকালে ট্রাফিকের ভুমিকায় হাত ইশারা করবে। এই শহরটা দুর্ঘটনাহীন হবে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।