মাদার অব আইটেম সং

ফিল্মফেয়ার পুরস্কার তিনি পেয়েছিলেন কেবল একবার। সেটা ১৯৭৯ সালের ‘লাহু কে দো রং’ সিনেমার জন্য। তবে, মনোনয়ন পেয়েছিলেন আরো পাঁচবার। সেটাও সাপোর্টিং ক্যারেক্টারের জন্য। ১৯৯৮ সালে এসে যখন সেই ফিল্মফেয়ার তাকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার দেয়, কিংবা ২০০৯ সালে যখন তাকে ভারত সরকার তাকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার পদ্মশ্রী প্রদান করা যায় তখন বোঝা যায় হেলেন আসলে কোন মানের একজন অভিনয়শিল্পী।

হেলেনকে বলা হয় ভারতের ‘মাদার অব আইটেম সং’। পুরো নাম হেলেন জেইরাগ রিচার্ডসন। সেই অর্থে তিনি ভারতীয়ই ছিলেন না। জন্ম মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে। বাবা ছিলেন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। মানে, ব্রিটিশ বংশদ্ভুত। আর মা ছিলেন বার্মিজ। ১৯৩৮ সালের ২১ নভেম্বর তার জন্ম। বাবা মারা যান অল্প বয়সে।

মা আবার বিয়ে করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন ব্রিটিশ সৈনিক। তার নাম অনুসারে হেলেনের নামের সাথে যোগ হয় ‘রিচার্ডসন’। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে হেলেনর দ্বিতীয় বাবাও মারা যান।

মিয়ানমারে জাপানিজদের হামলার সময় ১৯৪৩ সালে হেলেনের পরিবার মুম্বাই পালিয়ে আসেন। যাত্রাপথটা সহজ ছিল। খেয়ে না-খেয়ে আসতে হয়েছিল। সে সময় হেলেনের মা ছিলেন সন্তানসম্ভবা। কিন্তু, সেই বাচ্চা এই লম্বা ও বিভৎস যাত্রার মাঝেই মারা যায়।

ভারতীয় সিনেমায় তিনি আসেন ১৯৫১ সালে। সাবিস্তান ও আওয়ারা সিনেমায় ড্যান্সার হিসেবে কাজ করেন। তখন তার বয়স মাত্র ১৩ হেলেন সিনেমায় নেমেছিলেন বাধ্য হয়ে। মা ছিলেন সামান্য একজন নার্স, যা আয় করতেন সেটা দিয়ে সংসার চলতো না। বাড়িতে ছিল ছোট দুই ভাই-বোন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি আইটেম গানে কাজ করতে থাকেন।

১৯৫৭ সালে মুক্তি পায় হেলেনের প্রথম সিনেমা বড় সিনেমা হাওরা ব্রিজ। সেই সিনেমার তার ‘মেরা নাম চিন চিন চু’ গানটা আজো জনপ্রিয়। পরবর্তীতে আলিফ লায়লা, হুর-ই আরব, বারিশ ইত্যাদি সিনেমায় তিনি জনপ্রিয়তা পান। ৫০ থেকে ৭০-এর দশকে তিনি এক চেটিয়ে সাফল্য পেয়ে এসেছেন

চিত্রনাট্যকার সেলিম খান ও জাভেদ আখতারের সৌজন্যে তিনি বেশ কিছু সিনেমায় কাজ করার সুযোগ পান। মান ধর্ম, ডন, দোস্তানা কিংবা শোলের মত সিনেমায় তিনি মুগ্ধ করেন। ডন সিনেমার ‘ইয়ে মেরা দিল’ গান জন্য তাকে বলিউডের ইতিহাসে জায়গা করে দেয়। তার বিড়ালের মত চোখ আর চওড়া হাসি তখন কোটি-কোটি তরুরে রাতের ঘুম নষ্ট করেছিল।

১৯৮৩ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে চলচ্চিত্র থেকে অবসর নেন। যদিও, তিনি ১৯৯৬ সালের ‘খামোশি: দ্যা মিউজিক্যাল’ ও ২০০০ সালের ‘মোহাব্বাতে’ সিনেমায় অতিথি শিল্পী হিসেবে কাজ করেন। সর্বশেষ ২০০৬ সালে ‘হামকো দিওয়ানা কার গায়ে’ সিনেমায় তাকে দেখা যায়।

এছাড়াও তিনি ‘হাম দিল দে চুকে সনম’ সিনেমায় সালমান খানের মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেন। কাকতালীয় ভাবে বাস্তবে তিনি সালমান খানের সৎ মা। তিনি সালমানের বাবা ও চিত্রনাট্যকার সেলিম খানের দ্বিতীয় স্ত্রী। যদিও, তার নিজের কোনো সন্তান নেই। তবে, অর্পিতা নামের একটি পালক সন্তান আছে।

১৯৬২ সালে ‘কাবিল খান’ সিনেমার সেটে সর্বপ্রথম সেলিম খানের সাথে পরিচয় হয় হেলেনের। সিনেমাটি সেলিম খান ভিলেন ছিলেন। আর হেলেন ছিলেন কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রে। এরপর দু’জন প্রেমে পড়েন। বিয়ে করেন ১৯৮১ সালে।

এমনকি ‘তিসরি মনজিল’ সিনেমায়ও হেলেন ও সেলিম খান এক সাথে কাজ করেন। শাম্মি কাপুরের সেই সিনেমাটির ‘ও হাসিনা জুলভোওয়ালি’ গানটা বেশ বিখ্যাত হয়েছিল।

এর আগেও অবশ্য হেলেন সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। ১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৭৪ সাল – টানা ১৬-১৭ বছর ধরে তার চলচ্চিত্র পরিচালক পিএন অরোরার সাথে বিবাহিত জীবন কাটিয়েছেন। তার ৩৫ তম জন্মদিনে সেই সম্পর্কের ইতি হয়।

‘কুইন অব দ্যা নাটস গার্ল’ নামে তাকে নিয়ে ১৯৭৩ সালে মারচেন্ট আইভোরি প্রোডাকশন একটি তথ্যচিত্র নির্মান করে। বলা হয়, ভারতের ইতিহাসের প্রথম আইটেম গার্ল তিনি। আমরা বরং বলি, তিনি হলেন বলিউডের ‘মাদার অব আইটেম সং’।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।