মাঠের নায়ক, জীবনের নায়ক

সাবেক রোডেশিয়ার হয়ে পূর্বপুরুষরা প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন বিস্তর। ছিলেন জাতীয় পর্যায়ের ছিলেন পরিচিত ক্রিকেটার। বড় ভাই শন আরভিনকে মনে করা হয়, জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের অন্যতম সেরা অল রাউন্ডার। ছোট ভাই রায়ানও আছেন পাইপ লাইনে; সাউদার্ন রকসের হয়ে বছর সাতেক হল অভিষেক হয়ে গেছে তার। হয়তো তার গায়েও একদিন উঠে যাবে জাতীয় দলের জার্সি।

তারপরও ক্রেইগ আরভিনের ক্রিকেটে আসাটাই বড় এক বিস্ময়। কি, চমক লাগছে তো! ইতিহাসটা জানতে চলে যেতে হবে প্রায় দেড় যুগ পিছনে।

জিম্বাবুয়ের রাজধানী হারারে। কদিন আগেও নামটা ছিল ভিন্ন – স্যালিসবারি। সত্তুরের দশকের শেষ ভাগে স্বাধীনতা পাওয়ার পর তখন তিলে তিলে গড়ে উঠছে জিম্বাবুয়ে। ক্রিকেটেও আস্তে আস্তে বড় শক্তি হয়ে ওঠার পথে হাঁটছে তারা।

ররি আরভিন তত দিনে ক্রিকেট ছেড়ে দিয়েছেন। পরিবার দিয়ে থাকেন শহরের পাশে চিনহোই এলাকায়। নব্বই দশকের মধ্যভাগ। বড় ছেলে শন বয়স ভিত্তিক ক্রিকেটে নাম-ডাক করে ফেলেছেন। তিন ছেলের পরিবাওে ররির চিন্তা এবার মেঝো ছেলেকে নিয়ে।

কিন্তু দুরন্ত ক্রেইগ কি আর বাবার কথা শোনার পাত্র! সারাদিন নানা রকম দুষ্টুমি কওে কাটিয়ে দেন। ক্রিকেটটাও মন্দ খেলেন না বলে বাবাও তার প্রতি থাকেন নমনীয়। এরই মধ্যে ঘটে যায় ঘটনাটা!

দোতলা বাড়িতে খেলতে গিয়ে পা পিঁছলে পড়ে যান নিচ তলায়। ভাঙা কাচের মেঝেতে পড়ে ডান হাতের তখন যায় যায় অবস্থা। বাবা ররি দৌড়ে ছেলেকে নিয়ে গেলেন হাসপাতালে। চার ঘণ্টা টানা অপারেশন চললো। ডাক্তাররা একবার প্রায় সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছিলেন গোটা হাতটাই কেটে ফেলবেন। তবে, শেষ পর্যন্ত সেটা করার দরকার পড়েনি।

এই অবস্থা থেকে আর যাই হোক ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন দেখাটা বোকামি! কিন্তু সেই অসম্ভব স্বপ্নটাই দেখে ফেললেন ক্রেইগ রিচার্ড আরভিন। তাও আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। জেদ ধরে রেখে পরিশ্রম করে গেলেন। তার ফলাফলটা পেয়ে গেলেন ‘এ’ লেভেলে পড়াশোনা করার সময়। সুযোগ পেয়ে গেলেন জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে।

এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ক্রেইগকে। পারফরম্যান্স দিয়ে খেলে ফেললেন মিডল্যান্ডস দলে। সেখান থেকে অনূর্ধ্ব ১৯ ও জিম্বাবুয়ে ‘এ’ দলের হয়ে পেয়ে গেলেন জাতীয় দলের টিকেট। ২০১০ সালের ২৮ মে ভারতের বিপক্ষে বুলাওয়েতে ওয়ানডে অভিষেক হয়ে গেল তার। বছর খানেক বাদে পেয়ে গেলেন টেস্ট ক্যাপও। অসম্ভবকে জয় করলেন ক্রেইগ। আশৈশব দেখা স্বপ্ন অবশেষে সত্যি হল। আরভিন বলছিলেন, ‘সব পরিশ্রম, সব জেদের কারণ ছিল শুধু একটাই – জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানো। সেই অনুভূতি কোনদিনও ভোলা যাবে না। কে না চায় জাতীয় দলে খেলতে!’

এরপরের পথটাও সহজ ছিল না ক্রেইগ আরভিনের জন্য। অনিয়মিত পারফরম্যান্স আর জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের অস্থিরতার কারণে প্রায়ই থমকে যায় তার ক্যারিয়ার। বোর্ডের সাথে ঝামেলায় জাড়িয়ে প্রায় দেড় বছরের জন্য কেন্দ্রীয় চুক্তির বাইরে ছিলেন আরভিন। আবার ফিরেছেন, ব্যাটিংয়েও রান পাচ্ছেন প্রচুর।

চলতি শ্রীলঙ্কা সফরেও আছেন দারুণ ছন্দে। কলম্বোতে স্বাগতিক বোলিং আক্রমণের সাথে ছেলেখেলা করে পেয়েছেন ১৬০ রানের এক ইনিংস। এর আগে ওয়ানডে সিরিজ জয়েও মূল অবদান তাঁর। বলা যায়, চ্যালেঞ্জটা জিতে গেছেন তিনি।

জীবনের কাছে এই চ্যালেঞ্জ তো তুচ্ছ!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।