মহুয়ার সংসার || রম্যগল্প

মহুয়ার বাবা ইলিয়াস চৌধুরী প্রচণ্ড রাগী মানুষ। এককালে জমিদার ছিলেন, এখন জমিদারি না থাকলেও সেই রাগ আর ব্যক্তিত্ব ধরে রেখেছেন। তার ভয়ে পুরো মহল্লা কাপে থর থর করে। সুতরাং বহু ইচ্ছা থাকা সত্বেও ইন্টার পড়ুয়া মহুয়াকে থাকতে হচ্ছে সিঙ্গেল। এই বয়সটা প্রেম করার জন্য একদম পারফেক্ট। সিনেমা আর সিরিয়াল দেখে দেখে রাতদিন কল্পনায় লাল নিল স্বপ্ন ভাসে মহুয়ার চোখে। কিন্তু ঐ যে রাগী বাবা। এলাকার কোনো ছেলে কখনো সাহস পায় না মহুয়াকে প্রপোজ করার। প্রপোজ তো বহু দূরে, ওর দিকে তাকাতেই সবাই ভয় পায়। ভয় পায় মহুয়া নিজেও। বাবা কোনোভাবে খবর পেলে ওকে টুকরো টুকরো করে আফ্রিকান মাগুর দিয়ে খাইয়ে দেবে। নিজের সম্মানের চাইতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইলিয়াস চৌধুরীর কাছে নাই।

তবে শেষপর্যন্ত কষ্ট দূর হলো মহুয়ার। ইন্টার পরীক্ষার পর কিভাবে কিভাবে যেন ও চাঞ্চ পেয়ে গেলো স্বপ্নের ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে। আর কে পায়! রোকেয়া হলে স্বাধীন জীবনের শুরু। যেখানে নেই বাবার শাসন বা ভয়। এইবার পূরণ হবে স্বপ্ন। শুধু এখন কারো প্রপোজের অপেক্ষা, যাকে শুধুমাত্র ছেলে হলেই হবে, আর কিচ্ছু লাগবে না। তাছাড়া সুন্দরী মহুয়া কম না। জমিদার বংশের মেয়ে বলে কথা।

ক্যাম্পাসের সিনিয়র বড়ভাই তৌহিদের চাহনি দেখে মহুয়া বুঝতে পারে এই ছেলের লক্ষণ খারাপ। সে আর ওর বড়ভাই থাকতে চায় না। মহুয়াও অপেক্ষা করে আছে। ছেলেদের এতো ভীতু হলে চলে?

ফাইনালি সেই দিন আসলো।

তৌহিদ আমতা আমতা করে বললো, ‘ইয়ে মানে মহুয়া আমি তোমার জন্য একটা কবিতা লিখেছি।’

– আচ্ছা ঠিকাছে, তারপর?

– মানে?

– মানে কবিতা পছন্দ হইছে ধরেন। আমি খুশি হইছি। তারপর কি?

– ইয়ে মানে।

– উফ, আমতা আমতা না করে যা বলার বলে ফেলেন তো। আমার টাইম কম।

– কেন, বিজি? কোথাও যাবা? তাহলে পরে কথা বলি?

– আরে নাহ, টাইম নাই বলতে এখনের কথা বুঝাইনি। সারা জীবনের কথা বলেছি। একুশ বছর তো চলে গেল সিঙ্গেল থেকেই। আর কত টাইম নষ্ট করব।

তৌহিদের বুঝতে বেশ কিছুটা সময় লাগলো। বোঝার পর হাসি ফুটলো মুখে। আমাকে তোমার ভাল্লাগে? সত্যি?

হাসলো মহুয়াও, ‘সেটা ইম্পর্টেন্ট না। আমার কেউ একটা হলেই হবে।’

মহুয়ার রসকষহীন জীবনে ফাইনালি আসলো প্রেম। সে তার আবেগ, অনুভূতি, হৃদয়, ভালোবাসা, যা কিছু আছে সব নিয়ে ঝাপিয়ে পড়লো। প্রবল ভালোবাসার তোড়ে ভেসে গেল তৌহিদ। কিন্তু হাজার হোক, সে তো ছেলে। প্রেমের সম্পর্ক থেকে মেয়েরা কেয়ার, ভালোবাসা, গুরুত্ব, কতৃত্ব, গিফট, ট্রিট এন্ড উনসত্তর আদার্স জিনিস চাইলেও ছেলেরা মোস্ট প্রোবাবলি একটা জিনিসই চায়। যেটা সিনেমায় থাকলে শুরুতে লেখা ওঠে অনলি আঠারো প্লাস।

আবারো একদিন আমতা আমতা করে তৌহিদ বললো, ‘জানো মহুয়া, আমার ফ্রেন্ড কৌশিক একা একটা ফ্ল্যাট নিয়ে থাকে।’

– আর সে সারাদিন বাসায় থাকে না, ফ্ল্যাট খালি থাকে, আর তুমি আমাকে নিয়ে সেই ফ্ল্যাটে যেতে চাও কারণ ক্যাম্পাসে পার্কে আর রেস্টুরেন্টে বসে গল্প করতে করতে তুমি বিরক্ত। এসব জায়গায় তুমি ঠিকঠাক প্রাইভেসি পাওনা বলে।

– ওয়াও, হাততালি দিল তৌহিদ। তুমি তো পুরাই ফার্স্ট। উসাইন বোল্টের লেডি ভার্সন। তাইলে কবে যাবো, কালই?

– হুম যাওয়া যায়, কিন্তু তার আগে আমার ছোট্ট একটা শর্ত আছে।

– কি শর্ত বলো?

– আগে আমাকে বিয়ে করতে হবে। তারপর ফ্ল্যাট বাসা, মেস, বন জঙ্গল পাটক্ষেত যেখানে খুশি নিয়ে যাও।

তৌহিদ আশাহত হলো। বললো আচ্ছা, আর কিছুদিন যাক তোমার বাসায় প্রস্তাব পাঠাবো।

– উহু ভুলেও এই কাজ করা যাবে না। আব্বা আমাকে মেরেই ফেলবে। সাথে তোমাকেও।

– তাইলে?

– তাইলে আর কি, আমাকে কাজী অফিসে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করলেই হবে। তোমার যখন ইচ্ছা তখনই।

সুতরাং রোকেয়া হলে গায়ে হলুদ সম্পন্ন হলো। কাজী অফিসে বিয়ে। বিয়ের পর হল ছেড়ে মহুয়া বরের হাত ধরে গিয়ে উঠলো ধানমন্ডির ভাড়া বাড়িতে। শুরু হলো দুজনের সংসার।

মাস চারেক পর যেদিন সকালে মহুয়ার বমি হলো সেদিন রাতে ওর আম্মা কল দিয়ে বললো, ‘দেখ, তোকে ঢাকা পাঠায়ে আমি অনেক টেনশনে আছি। ঐখানে ভুলেও কোনো ছেলের সাথে প্রেম ভালোবাসায় জড়াবি না। তোর আব্বাকে তো তুই চিনিস। একদম খুন করে ফেলবে।’

মহুয়া মিষ্টি হেসে বললো, ‘ঠিক আছে আম্মা, তুমি কিচ্ছু চিন্তা কোরো না।’

যখন ওর ছয় মাস চলছে তখন ছুটিতে বাসায় গেলো। সবাই দেখে বললো, ‘বাহ ভালোই তো মোটা হয়ে গেছিস হলের খাবার খেয়ে। ভুড়িও বের হইছে।’

যেদিন ম্যাটারনিটি ওয়ার্ডে মহুয়ার নর্মাল ডেলিভারি হলো সেদিন ওর আম্মা ফোন দিয়ে বললো, ‘তোর আব্বা তোর জন্য ছেলে খুঁজতেছে। তোর কোনো অমত নেই তো?

মহুয়া ক্রন্দনরত বাচ্চার মুখে স্তন দিয়ে আস্তে আস্তে বললো, ‘নাহ, কিসের প্রবলেম হবে!’

বছর তিনেক পার হয়ে গেছে। বেশ চলছে মহুয়ার সংসার। বাচ্চাকে শ্বাশুড়ির কাছে রেখে বাসা থেকে ঘুরে আসে মাঝে মাঝে। অনার্স ফাইনাল ইয়ারে উঠে প্রেগন্যান্ট হলো আবারো। বাসায় তখন ওর বিয়ের সম্বন্ধ চলছে পুরোদমে। ও আম্মাকে ফোন দিয়ে বললো, ‘সামনে আমার ফাইনাল পরীক্ষা। এর আগে এখন বিয়ে করা সম্ভব না। আমাকে বছরখানেক টাইম দাও।’

যেদিন মহুয়ার দ্বিতীয় বাচ্চার সিজারিয়ান ডেলিভারি হলো সেদিন ওর আব্বা কল দিয়ে বললো, ‘আমি চোখের ডাক্তার দেখাতে ঢাকা আসছি। তুই কই?’

মহুয়া আর ওর বর পড়ে গেল বিশাল টেনশনে। অনেক ভেবেচিন্তে বুদ্ধি বের করল। প্রথমে পায়ে আর মাথায় ব্যান্ডেজ বাধলো শুধু শুধু। তারপর কল দিয়ে বললো, ‘আব্বা আমি এক্সিডেন্ট করেছি। তেমন কিছু না। ক্লিনিকে আছি, ডাক্তাররা বলেছে ঠিক হতে সপ্তাহখানেক লাগবে।’

মহুয়ার বাবা দ্রুত চলে আসলেন। এসে দেখলেন মেয়ে চুপচাপ শুয়ে আছে। পাশে দুইজন বান্ধবী।

তিনি অবাক হয়ে বললেন, ‘এক্সিডেন্ট করে মাথা ফাটলে ম্যাটারনিটি ওয়ার্ডে কে ভর্তি হয়?’

– ইয়ে মানে আব্বা অন্য কোথাও সীট খালি ছিলো না বলে ডাক্তাররা এখানে জায়গা দিয়েছে।

এমন সময় একজন নার্স এসে মহুয়াকে বললো, ‘আপনার মেয়ের দুধ খাওয়ার টাইম হয়ে গেছে।’

দ্রুত চোখ ইশারায় নার্সকে চুপ করতে বললো মহুয়া।

মহুয়ার বাবার জিজ্ঞাসু চোখের দিকে তাকিয়ে ওর বান্ধবী তাড়াতাড়ি বললো, ‘ইয়ে আঙ্কেল, নার্স আপনাকে বলেছে যে মহুয়ার দুধ খাওয়ার টাইম হয়ে গেছে। ওকে বর্তমানে তরল খাবার দিচ্ছে শুধু।’ তারপর নার্সের দিকে তাকিয়ে ধমকের সুরে বললো, ‘এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি দেখছ? যাও, দ্রুত রোগীর জন্য দুধ নিয়ে আসো।’

এবার ইলিয়াস চৌধুরীর পরিবর্তে যারপরনাই অবাক হয়ে চেয়ে রইলো নার্স মহিলা।

সাজানো ডাক্তারের পরামর্শ শুনে ইলিয়াস শেখ যখন বিকালের ট্রেনে বাড়ি রওয়ানা হলেন তখন হাফ ছেড়ে বাচলো মহুয়া আর তৌহিদ। পাশের রুমে কাঁদতে কাঁদতে ততক্ষণে বাচ্চার অবস্থা সিরিয়াস। দ্রুত এনে দুধ দিলো মহুয়া।

মাস্টার্স শেষ মহুয়ার। ছোটোখাটো একটা চাকরীও পেয়েছে। এর মাঝে ওর বাবা অনেকগুলো ছেলের সাথে ওকে দেখা করিয়েছে। বিভিন্ন পদ্ধতিতে সবগুলো সম্বন্ধই বাতিল করেছে মহুয়া আর তৌহিদ। এভাবে কাটলো আরো কয়েক বছর। তারপর একদিন বাসা থেকে কল আসলো, ইলিয়াস শেখ প্রচন্ড অসুস্থ। মহুয়া যেন দ্রুত বাসায় আসে। রাতের ট্রেনেই।

বাসায় গিয়ে মহুয়া দেখলো সাজ সাজ রব। ইলিয়াস শেখ বারান্দায় বসে হুকা টানছেন। মহুয়াকে দেখে শান্ত গলায় বললেন, ‘যাও রেস্ট নিয়ে গোসল করে রেডি হও। রাতে তোমার বিয়ে। ছেলেপক্ষ তোমার ছবি দেখেই হ্যা বলে দিয়েছে।’

– ইয়ে মানে আব্বা আমি ছেলেকে দেখব না?

– তার কোনো দরকার আছে বলে আমি মনে করি না।

বাবার মুখের ওপর সত্যি মিথ্যা কিছু বলারই সাহস ছিল না মহুয়ার। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ চুপ থাকা সম্মতির লক্ষণ থিওরিতে দশ লাখ দশ হাজার দশ টাকা দেনমোহরে অপরিচিত এক ইঞ্জিনিয়ার ছেলের সাথে বিবাহ সম্পন্ন হয়ে গেল ওর।

বাসর রাত। বরকে ভালোভাবে দেখার সুযোগ পেল মহুয়া। লম্বা চওড়া ফর্সা ছেলে। দেখতে খারাপ না। দরজা বন্ধ করে দিয়ে খাটে বসলো বর। আস্তে আস্তে বললো, ‘কেমন আছো?’

– জ্বী ভালো। আপনি?

– আমিও ভালো। তোমাকে আমি কিছু কথা বলব। তুমি হয়ত ভাবছো সরাসরি না দেখেই, কথা না বলেই আমি কেন বিয়েতে রাজি হলাম। এর পেছনের সিক্রেট আমি তোমাকে বলব। আমি মনে করি বর বউ এর মাঝে কিছু গোপন থাকা ঠিক না। এতে ভবিষ্যতে ঝামেলা হয়। আমি বলার পর তুমি বলবা তোমার কোনো সিক্রেট থাকলে।

মহুয়া চুপ করে আছে। নতুন বউদের চুপ করে থাকাই নিয়ম।

বর আবার কথা শুরু করল, ‘একটা মেয়ের সাথে আমার প্রায় সাড়ে তিন বছরের প্রেম ছিলো। সত্যি বলতে আমি ওকে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছিলাম। ঐ মেয়ে ছাড়া আর কিছুই বুঝতাম না। তারপর একদিন জানতে পারলাম ওর আরো একটা প্রেমিক আছে আমি ছাড়াও। যার সাথে আমারো আগে থেকে ওর প্রেম। এটা শোনার পর আমি পুরোপুরি ভেঙে পড়ি। নেশা করা শুরু করি। অসুস্থ হয়ে পড়ি। মাস চারেক রিহ্যাবে থাকতে হয়। তারপর আমি সুস্থ হই। প্রেম ভালোবাসার ওপর থেকে বিশ্বাস উঠে যায়। ফ্যামিলির কথা শুনে বিয়েতে হ্যা বলে দেই। সিদ্ধান্ত নেই বিয়ের পর বউএর সাথেই প্রেম করব। কারণ আর কোনো মেয়ের ধোকার শিকার আমি হতে চাইনি। ভরসা রাখি বাবা মায়ের ওপর। তারা যাকে পছন্দ করেছে তাকেই চোখ বন্ধ করে বিয়ে করে ফেলেছি। এখন বুঝলাম বাবা মায়ের কথা মেনে নিয়ে আমি ঠকিনি। এই ছিলো আমার সিক্রেট। এবার তোমার কথা বলো।’

– কি বলব?

– দেখ বিয়ের আগে মেয়েদের একটা দুইটা প্রেমিক থাকতেই পারে। অন্যদের মত এগুলা নিয়ে আমার কোনো প্রবলেম নেই। তুমি নির্ভয়ে বলতে পারো। আছে কোনো প্রেমিক?

– না নেই।

– সত্যি?

– হ্যা সত্যি।

– যাক আলহামদুলিল্লাহ। আবারো প্রমাণ হলো বাবা মায়ের ডিসিশনে কোনো ভুল হয় না।

– জ্বী।

– আচ্ছা শুনো, তোমাকে কোনো কারনে চিন্তিত মনে হচ্ছে। কি হয়েছে?

– কিছুনা।

– আরে বলো। কোনো সমস্যা নাই। তোমার সব টেনশন আজ থেকে আমারো। বলে ফেল, তুমি কি চিন্তিত?

– কিছুটা।

– আমার কাছে অস্বস্তির কিছু নেই। নিশ্চিতে শেয়ার করো। আমি তোমার সব সমস্যায় তোমার পাশে আছি। কি নিয়ে চিন্তিত তুমি?

মহুয়া অনেক্ষণ চুপ করে থেকে আস্তে আস্তে বললো, ‘আসলে কাল আমার বড় ছেলেটার প্রাইমারী স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। আমি এই সময় ওর কাছে নেই। কি যে করবে, কে জানে! তাছাড়া ছোটো মেয়েটাও অসুস্থ। জ্বর কাশি বমি। ডাক্তার এন্টিবায়োটিক দিয়েছে, আমার বরটা যে ভুলো মনের মানুষ ঠিকমত খাওয়াচ্ছে কিনা কে জানে। এসব নিয়েই কিছুটা চিন্তিত।

নতুন বর মাথা ঘুরে পড়ে গেল খাট থেকে। ধুপ করে শব্দ হলো একটা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।