মন || ছোটগল্প

ফরিদের মনের কথা

ছোটবেলায় কত চকলেট কিনে দিয়েছি। এই এতটুকু ছিলো। আর আজ তের বছর বাদে আমেরিকা থেকে ফিরে এসে দেখি সেই পিচ্ছি মেয়ের সারা শরীরে যৌবনের ফুলঝুরি। দেখলে একদম মুখে লালা চলে আসে। মনে হয় সেই ছোটবেলায় কিনে দেওয়া চকলেটের মতন আজ ওকেই, হাহ হাহ হা। নাম সেজুতি, এবছর ইন্টার পাশ করেছে।

আমাদের বাসা আর ওদের বাসার মধ্যে একটা ফাকা মাঠ আর একটা ছোট্ট মুদিখানার দোকান। মেয়ে বড় হয়েছে এখন আর সেই বহুবছর আগের মত হুটহাট তার ঘরে ঢুকে পড়া যায়না চকলেট হাতে। অবশ্য এখন আর চললেট না, চকলেট ফ্লেভার নিয়ে যাওয়ার বয়স তার। বিছানায় এক ঘন্টার জন্য ওকে পেলেও একেবারে বর্তে যেতাম। কি করা যায়?

কিছু একটা ভাবতে হবে। প্রেম করার বয়স আর নেই। সেই চুপচাপ প্লান করে আস্তে আস্তে মেয়ে পটানোর মত দীর্ঘমেয়াদি ধৈর্যও নেই আর। তবে বিছানায় নেয়ার খুব ভালো উপায় অবশ্য একটা আছে। সেটা হলো সেজুতির বাসায় সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়ে দেয়া।

মনিরের মনের কথা

সেজুতিকে প্রথম যেদিন আমি দেখি সেদিন মনে হয় কোনো মানুষ না, রাস্তা দিয়ে স্বর্গের অপ্সরী হেটে যাচ্ছে। দুপুর রোদের তীব্র আলোয় ওর কাজল কালো চোখ জুড়ে রাজ্যের মায়া। হঠ্যাৎ বৃষ্টি শুরু হলো। হঠ্যাৎ শুরু হওয়া বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ও দৌড়াচ্ছিলো। শব্দ হচ্ছিলো ওর পায়ের নুপুরে। বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে আমার কানে বাজছিলো নুপুরের রিনঝিন। আমি প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম সেদিন। বাসায় ফিরে সেজুতিকে ভেবে কবিতা লিখি –

বিষন্নতার ঝাপসা আলোয়

তোমার চোখের কাজল কালোয়

ভীষন রোদের দুপুর ছিলো।

সর্বনাশের দিন গুনেছি

মিষ্টি ভীষন সুর শুনেছি

তোমার পায়ে নুপুর ছিলো।

কোকড়া চুল আর নীল সানগ্লাস

আমরা দুজন এইটিন প্লাস

তোমায় কিছু বলার ছিলো।

দিনের আলোয় চাদ দেখেছি

জোসনা গায়ে খুব মেখেছি

চার’পা সাথে চলার ছিলো।

ভালোবাসা শুরুর সেদিন অনেকটা ঠিক মিষ্টি ছিলো,

গোলাপী ড্রেস তুমি ছিলে- আমি ছিলাম, বৃষ্টি ছিলো।

কবিতা লিখে আমি চুপচাপ বসে থাকি। ভাবি, যে ছেলে ওকে পাবে তার মত ভাগ্যবান এই দুনিয়াতে আর কেউ নেই। আমার সেই মানুষটার জন্য হিংসে হয়, খুব হিংসে হয়। কিন্তু এখন ওকে পাওয়ার উপায় কি? প্রেম ভালোবাসা আমার দ্বারা হবে না। একটা মেয়েকে ইমপ্রেস করার মতো যোগ্যতা যে নেই আমার। তারচেয়ে ভালো সেজুতির সম্মতি নিয়ে ওর বাসায় প্রস্তাব পাঠিয়ে দেব।

সেজুতির মনের কথা

মনির ভাইকে বেশ ভালো লাগে আমার। কেমন বিষন্ন চেহারা। দেখলেই মায়া হয়। বেচারা নতুন চাকরী পেয়েছে। খুব বড় না, ছোটোখাটো চাকরি। চাকরি পাওয়া উপলক্ষে আমাকে অনেকগুলো গল্পের বই কিনে দিয়েছে। বইগুলোর প্রথম পাতায় খুব সুন্দর সুন্দর কবিতা লেখা। মনির ভাই বেশ ভালো কবিতা লিখেন। আমিও মাঝে মাঝে কবিতা লিখি কিন্তু কাউকে দেখাই না। আমার খুব লজ্জা করে। মনির ভাইয়ের সাথে যদি আমার কখনো বিয়ে হয় তাহলে উনাকে দেখাবো। উনার মা আমার কাছে শুনেছিলো আমি মনির ভাইকে বিয়ে করতে রাজি কিনা। আমি কিছু বলিনি। ভীষণ লজ্জা লেগেছিলো আমার। আচ্ছা আমি কি উনাকে ভালোবাসি। ধ্যাত আমি এসব জানিনা। এদিকে ফরিদ ভাইও বাসায় এসেছিলো সেদিন। বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছিলো। আমার দিকে তো আর না তাকাচ্ছিলো আমার বুকের দিকে। যেন চোখ দিয়েই খেয়ে ফেলবে। এতো খারাপ লাগছিলো আমার। কান্না পাচ্ছিলো। কি বেহায়া মানুষ রে বাবা। অথচ আব্বু উনাকে কত যত্ন করলো। একেবারে জামাই আদর যাকে বলে। ইস, আমি এসব কি ভাবছি। ছি!

পরিশিষ্ট

আগস্টের চব্বিশ তারিখে ফরিদের সাথে সেজুতির শুভ বিবাহ সম্পন্ন হয়। সেজুতির বাবার হাতে দুইটা প্রস্তাব ছিলো। ফরিদ আর মনির। সেজুতির বাবা চিন্তা করে টাইম নষ্ট করেননি। সমাজে ছোটোখাটো চাকুরে থেকে আমেরিকা প্রবাসীর দাম অনেক অনেক বেশি।

আর হ্যা, সমাজের কাছে মন জিনিসটার কোনো দাম নেই।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।