‘ভয় নেই, শিগগিরই আমরা স্বাধীন হবো…’

ডিসেম্বর মাস  বিজয়ের মাস, বুদ্ধিজীবী হত্যার মাসও। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর আমার স্বামী মুনির চৌধরী আরো অনেক বুদ্ধিজীবির সাথে শহীদ হন। দুপুর দেড়টার দিকে তাকে তুলে নিয়ে যায়, আর কখনো দেখা পাইনি।

সাম্প্রতিক সময়ে ওকে নিয়ে একটা নাটক সম্প্রচার করা হয়েছে। সেখানে ওকে তুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টা ঠিক ভাবে আসেনি। ওর সাথে আমাদের পরিবারের শেষ দিনটা কেমন ছিল সেটা আমি আপনাদের বলছি।

ওই সময় আমার একটা টিউমার সরানো হয়। খুব উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিলাম, সাত দিন বাদেই যে রিপোর্ট দেওয়ার কথা। রিপোর্টে দেখা গেল টিউমারটা প্রাণঘাতি কিছু নয়। তাই ও অনেক খুশি ছিল। সন্দেশ নিয়ে বাসায় ফিরেছিল।

যদিও দিন বিশেষ বাদেই জায়গাটা আবার শক্ত হয়ে ফুলে ওঠে। ১৪ ডিসেম্বরের কাছাকাছি সময়ে আমি ওকে বিষয়টা জানাই। বললো, ‘কারফিউ তুলে দিলেই তোমায় ডাক্তার দেখাবো।’ কারফিউ আর উঠলো না, সেই কথা আর রাখা হল না।’

ও  সব সময় খুব সকালে ঘুম থেকে উঠতো। আমিই দেরি করতাম। জানতাম না, ওইদিন ও কোন সকালে উঠে নাস্তা করে নিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা ওর বাবা-মার সাথে সেন্ট্রাল রোডের দোতলা বাড়িতে থাকতাম।

আনুমানিক নয়টার সময় আমি নিচে গিয়ে দেখে ও ফ্লোরের ওপর মাদুর পেতে বসে বুকের মধ্যে ট্রানসিস্টর রেডিও নিয়ে শুনছে। ও সাধারণত বিবিসির খবর শুনতো। ও আমাকে দেখেই বললে, ‘ভয় নেই, শিগগিরই আমরা স্বাধীন হবো!’

জবাবে আমি কিছুই বলিনি। শুধু জিজ্ঞেস করি কিছু খাবে কি না। ও মাথা নাড়ে। এরপর চাপাতি আর সবজি খায়। আমিও নাস্তা শেষ করে ওপরে চলে যাই।

একটু পর ও ওপরে এসে ধোয়ার জন্য কাপড় নিয়ে যায়। আমি বলি, ‘আমার কাপড় নিও না। আম্মা (শ্বাশুড়ি) ভাল চোখে দেখবেন না।’ যদিও ও আমার বারণ না শুনে আমার কাপড় নিয়ে নিচে লন্ড্রির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

ওই সময় বাড়িতে কোনো কাজের লোক ছিল না। আমার স্বামী নিজেই কাপড় ধুতো। ওর ভাই রুশো টিউবয়েল চেপে পানি ঢালতো।

দুপুরের দিকে ও আমাদের ছোট ছেলে তন্ময়কে গোসলের জন্য নিয়ে গেল। ব্যালকনিতে রোদের মধ্যে প্রথমে ওর গায়ে সরিষার তেল মাখানো হয়। আমি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। ও তন্ময়কে আদর করে চুমু খাচ্ছিল। বলছিলো, ‘তন্ময়কে আমার কি যে ভাল লাগে!’

সেই দৃশ্যউ আমি কখনো ভুলবো না। এখনো সেটা আমার চোক পানি নিয়ে আসে। ওই ছোট বাচ্চার জীবন থেকে এই অজস্র ভালবাসা হারিয়ে গেছে।

তন্ময়ের গোসল শেষ করার পর ও নিচে যায় নিজের গোসল শেষ করতে। আবার ওপরে ফিরে এসে বরে, ‘যাও গোসল সেরে নাও, বাথরুম খালি আছে। ‘ এর অর্থ হল ও আমার জন্য গরম পানি চড়িয়েছে।

ঠিক তখনই আমাদের লোহার দরজায় জোরেসোরে ধাক্কা দেওয়ার আওয়াজ শুনি। আমি দোতলার জানাল থেকে উঁকি দিয়ে দেখি ২০-২২ বছরের পাঁচজন ছেলে বাইরে দাঁড়ানো। গায়ে কুর্তা আর পাজামা। পরে শুনেছিলাম, ওটাই ছিল আল শামসের পোশাক।

আমার স্বামী জানালা বন্ধ করে দিতে বললো। আমি গোসলে যাওয়ার জন্য পরিস্কার জামা খুঁজছিলাম, তখনই আমার দেবর এসে জানালো আমার স্বামীর সাথেই নাকি ওই ছেলেগুলো দেখা করতে এসেছে।

এটা শুনেই মুনির চৌধুরী নিচতলায় নামে। কিছু সময় অতিবাহিত হয়। আমি বাইরে গিয়ে শুনতে চাই নিচে কি হচ্ছে। যখন প্রায় নিচতলায় পৌঁছে গেছে তখন শুনি ও বলছে, ‘আপনাদের কাছে কি ওয়ারেন্ট আছে!’

ঠিক তখনই একটা ছেলে জামার ভেতর থেকে বন্দুক বের করে, দ্রত আমার স্বামীর পেছনে এসে বন্দুকের নল ঠেস দিয়ে ওর পিঠে ঠেকায়। এটা দেখে আমার শরীর কেঁপে ওঠে। অল্প সময়ের মধ্যে ওকে গাড়িতে তোলা হয়। ওই শেষ দেখা।

নিচে না নামলে ওই দৃশ্যটা আমার দেখা লাগতো না। অনেক দিন যাবৎ ও দৃশ্যটা আমাকে তাড়া করেছে।

ওখানে সেনাবাহিনীর কেউ ছিল না – ছিল বাঙালির। টেলিভিশন নাটকে একজন ইউনিফর্ম পরা আর্মিকে দেখানো হয়। কিন্তু, আমি জানি আমাদের নিজেদের লোকই মুনির চৌধুরীকে মেরে ফেলে। মঞ্চ নাটকে দেখানো হয় তুলে নিতে আসা ছেলেগুলো কালো পোশাকে ছিল, আসলে ওরা এসেছিল সাদামাটা পোশাকেই।

আমার স্বামী সব সময় লোহার গ্রিল দেওয়া সদর দরজাটা বন্ধ রাখতো। সবাইকে বলা ছিল, কখনো যেন ওটা খেলা না হয়। ও যাওয়ার পর আমি আমার দেবরকে জিজ্ঞেস করি কেনো ওটা খোলা হয়েছিল? ও জবাব দেয় ওর দিকেও বন্দুক তাক করা হয়।

আমার ১২ বছরের ছেলের মিশুক (প্রয়াত চিত্রনাট্যকার ও সাংবাদিক মিশুক মুনির) বলেছিল, রুশো ওকে গেটের চাবি দিতে বলে। চাবি ছিল আলমারির ওপরে। মিশুক চাবি ওখান থেকে এনে ওর চাচাকে দেয়। মিশুক যতদিন বেঁচে ছিল ততদিন ভুলেও কখনো ‍ওই গেট খোলেনি, যে গেট খোলার জন্যই ওর বাবার অকালমৃত্যু হয়।

আমার এক দেবরের মেয়ে তার বাবা-মা’র জীবন নিয়ে স্মৃতিচারমূলক একটা বই লিখেছে। সেখানে লেখা হয় একজনকে আশ্রয় দেওয়ার কারণেই পাকিস্তানি আর্মিরা ওকে খুঁজছিল। কাকে লুকিযে রেখেছিল, সে ব্যাপারে ও কোনো খোলাসা করেনি। ও এখন দেশের বাইরে থাকে, আমি জানি না এই ধারণা ওর কি করে হল!

মুনির চৌধুরীকে অনেকে ভুল বোঝেন, কারণ তিনি নিরাপদ জায়গায় পালিয়ে যাননি। আমি কি বলতে পারি কেন তিনি ঢাকা ছেড়ে যাননি? ওর স্পাইনাল কর্ডে তীব্র ব্যাথা ছিল। আমি ওকে পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলাম, ও বলেছিল, ‘লিলি, যদি আর্মি তাড়া করে, তাহলে আমি পালিয়ে থাকতে পারবো না।’

ওর এক ভাই বলেছিল, ‘তুমি যেতে পারো না। তুমি গেলে পরিবারের বাকি সবাইকেও নিয়ে যাও (মানে পরিবারের বাকি ১৩ টি ভাইবোন)।’

ভারতে যাওয়ার প্রসঙ্গে ও বলেছিল, ‘আমি ওখানে এমন কাউকে চিনি না যে আশ্রয় দিতে পারে।’

ও কখনোই আমাদের ছেড়ে যেতে চাইতো না। গেলে চার ছেলে মেয়েকে নিয়ে যেত। দু’জন ছিল তার নিজের ছেলে – মিশুক ও তন্ময় (আরেক ছেলে ভাষণ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়)। বাকি দু’জন ছিল ওর বোনের ছেলে-মেয়ে।

আমার বোনের বিয়ে হয়েছিল আমারই এক দেবরের সাথে। ওদের আর্মি নিয়ে গেলে, তাদের দু’টি শিশুও ছিল আমাদের দায়িত্ব।

মুনির চাইলেও ওর বৃদ্ধ মা কে রেখে যেতে পারতো না।

আসলে এসব কিছু বলাই অর্থহীন। আসলে ওর ঢাকা না ছাড়তে চাওয়ার এমন অসংখ্য কারণ আছে। শেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই, কোনো ভাবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে পাকিস্তানি আর্মিকে সাহায্য করার জন্যই ও ঢাকায় থেকে যায়।

__________

 – শিক্ষাবিদ, নাট্যকার, সাহিত্য সমালোচক, ভাষাবিজ্ঞানী, বাগ্মী এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনির চৌধুরী। তাকে নিয়ে তার স্ত্রী লিলি চৌধুরীর স্মৃতিচারণামূলক লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউনে। অনুবাদ করে পুন:মুদ্রন করেছে অলিগলি.কম

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।