ভূত হওয়ার সহজ উপায় || ছোটগল্প

‘ভাইসাহেব, ভুত হওয়ার ইচ্ছা আছে নাকি?’

ট্রেন জার্নিতে সামনের সীটে বসা অপরিচিত কেউ এই ধরনের কথা বললে যে কেউই অবাক হবে, আজহার সাহেবও হলেন। চমকে গেলেন বলা চলে। উনাকে চমকাতে দেখে লোকটা এদিক ওদিক তাকিয়ে মাথাটা এগিয়ে আনলো। তারপর ফিসফিস করে বললো, ‘ইচ্ছা আছে ভুত হওয়ার?’

তিনি বললেন, ‘আপনার কথাটা ঠিক বুঝতে পারছি না।’

লোকটা হতাশার ভঙ্গি করে বললো, ‘আরে ভাই না বুঝার কি আছে, মানুষ থেকে ডিরেক্ট ভুত হইতে চান কিনা জানতে চাচ্ছি। দেখেন, মানুষ থাইকা লাভ কিছু হইতেছে? জিনিসপত্রের দাম যা বাড়ছে আজকাল। তার উপরে রাস্তায় জ্যাম, অফিসে বসের ঝাড়ি, নানান রোগশোক, লোডশেডিং, গরম, মশা, স্ক্রিনশট আর কষ্ট! এইভাবে বেচে থাকা যায়? তারচেয়ে ভুত হয়ে যান, খালি আরাম আর আরাম। থাকবেন কোনো বড় গাছের মগডালে আর বিন্দাস ঘুরে বেড়াবেন সারা রাত। টেনশন নেই, প্রেশার ডায়াবেটিকস নেই, এমনকি মরে যাওয়ার ভয়ও নেই। খালি সুখ আর সুখ।’

এইবার আজহার সাহেবের বধ্যমুল ধারনা হলো লোকটার মাথায় সমস্যা আছে। বললেন, ‘তার জন্য আমি এখন ভুত হয়ে যাবো? তো ভুত হতে হলে আমাকে কি করতে হবে? কোথাও দরখাস্ত দিতে হবে, নাকি কোনো ফর্ম পূরণ করতে হবে। টাকাপয়সা লাগবে নাকি ভুত হওয়ার চার্জ বাবদ?’

লোকটা মুচকি হাসলো, ‘আপনি দেখি রেগে যাচ্ছেন। আরে ভাই রাগের কিচ্ছু নাই। খুবই সহজ পদ্ধতি আছে ভুত হওয়ার, আপনাকে আমি শিখিয়ে দেব।’

– কেন ভাই আপনাকে কি ভুতরা তাদের এজেন্ট বানাইছে? ডেসটিনির মতন। লোককে কনভিন্স করে ভুত বানাইতে পারলে টাকাপয়সা পাবেন নাকি!

– সব কি আর টাকার জন্য করতে হয়? অন্যের উপকার বলেও তো একটা কথা আছে, নাকি। আর একবার ভুত হয়েই দেখেন, এরচেয়ে সুন্দর আর মুক্ত জীবন হয়ই না।

– না রে ভাই, আমার ভুত হওয়ার কোনো ইচ্ছা নাই, আজহার সাহেব সরাসরি বলে দিলেন।

লোকটা আশ্বাস দেয়ার ভঙ্গি করে বললো, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, না হইলেন। কিন্তু পদ্ধতিটা জেনে রাখতে তো দোষ নাই। পরে ইচ্ছা হইলে তখন আমাকে তো আর পাবেন না।

আজহার সাহেব রাজি হলেন, আচ্ছা বলেন তো। শুনি আপনার পদ্ধতি।

লোকটা মাথাটা আরো এগিয়ে এনে ষড়যন্ত্র করার ভঙ্গিতে বললো, ‘খুবই সহজ নিয়ম। আজকের মতো একটা আমাবস্যার রাত হতে হবে। একচামচ লবন, এক চামচ হলুদ আর এক চামচ সরিষার তেল নিবেন। তিনটা একসাথে মিশায়ে সারা শরীরে ডলবেন। তারপর উলঙ্গ হয়ে জয় বাবা ভূতনাথ বলে রেললাইনের উপর শুয়ে থাকবেন। আপনার উপর দিয়ে ট্রেন যাবে, আপনি খন্ড খন্ড হয়ে যাবেন, খেল খতম। আপনার হবে অপঘাতে মৃত্যু। আপনি মানুষ থেকে ডাইরেক্ট ভুত হয়ে যাবেন। এই পদ্ধতি একদম পরিক্ষিত। শতভাগ গ্যারান্টি। মরার সময় অল্প একটু কষ্ট যা লাগবে, তারপর খালি আরাম আর আরাম।’

আজহার সাহেব মোটামুটি নিঃসন্দেহ হয়ে গেলাম যে লোকটা পাগল। এদের সাথে কথা বললেই সমস্যা। উনাকেও পাগল বানিয়ে ছাড়বে। তারচেয়ে ইগনোর করাই ভালো। উনি লোকটার কথার কোনো জবাব না দিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। রাতের অন্ধকার ভেদ করে তীব্র গতিতে ট্রেন এগিয়ে চলছে। শব্দ হচ্ছে ঝিক ঝিক। কোথাও একটা প্যাচা ডাকলো কর্কশ কন্ঠে। জোনাকি জ্বলছে নিভছে দুই একটা।

পাগলটা এতোক্ষণ চুপ করে আছে কেন? আজহার সাহেবের খটকা লাগলো। জানালা থেকে মুখ সরিয়ে সামনে তাকালেন। হোয়াট! কেউ নাই। কই গেল! বাথরুমে নাকি?

দেখি তো। তিনি দ্রুত উঠে সারা ট্রেন খুজলেন। নেই লোকটা। কোথাও নেই। অন্য সিটে, বাথরুমে, বাঙ্কে, কোথাও নেই। পুরোপুরি গায়েব। যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।

তিনি ক্লান্ত পায়ে নিজের সিটে ফিরে আসছিলেন। হঠ্যাৎ শুনলেন দুইজন লোক নিজেদের মাঝে কথা বলছে। একজন আশ্চর্য ভঙ্গিতে বললো, ‘আরে হ্যা, আমাদের এই ট্রেনের নীচেই একজন আত্মহত্যা করেছে। আমি আগের স্টেশনে যখন ট্রেন থামলো তখনই শুনেছি। হ্যা হ্যা, ঘন্টা দুয়েক আগের কথা।’

আজহার সাহেবের কান ঝা ঝা করতে লাগলো। তিনি টলতে টলতে নিজের সীটে ফিরে আসলেন। সামনের ফাকা সীটে কিছু একটা পড়ে আছে। একটা পলিথিনে এইটা কি? লবন হলুদ আর তেলের মিশ্রণ! তাঁর লোকটার একটা কথা মনে পড়লো, ‘ভুত জীবনে কোনো কষ্ট নেই। খালি আনন্দ আর আনন্দ।’

এদিকে অথচ আজহার সাহেব আছেন বিরাট টেনশনে। বড় ছেলেটা বখে গেছে। মদ গাজা খায়। মেয়েটার বিয়ে হচ্ছেনা, স্ত্রী অসুস্থ। নিজের চাকরী নিয়েও ঝামেলা দেখা দিচ্ছে। তার উপরে হাই ব্লাড প্রেশার। এই লাইফে পুরোপুরি হতাশ তিনি।

তারমানে লোকটা মিথ্যা বলেনি? আসলেই ভুত হওয়া সম্ভব। সে নিজেই এর প্রমান। এই লাইফ আর একদমই ভালো লাগেনা। হঠ্যাৎ করেই তিনি ডিসিশন নিয়ে ফেললেন। ভূতই হবেন। আজকেই। রাতটাও একদম ঠিকঠাক আছে। পরের স্টেশনে গাড়ি থামলেই নেমে যাবেন। তারপর গায়ে তেল, হলুদ, লবন মাখিয়ে অপেক্ষা করবেন পরবর্তী ট্রেন আসার।

এমনিতেই একদিন তো মরে যেতেই হবে।

পরের স্টেশনে গাড়ি থামলো। আজহার সাহেব নেমে যেতেই লোকটা সীটের নীচ থেকে প্রথমে মাথা তারপর সারা শরীর বের করলো। মুচকি হাসলো। আজ এই নিয়ে দুইজনকে ফাসানো সম্ভব হলো। অনেকটা দূরত্ব বজায় রেখে আজহার সাহেবের পেছন পেছন ট্রেন থেকে নামলো। আজহার সাহেবের মোবাইল, মানিব্যাগ, জামাকাপড় সবাই দেখার আগে উদ্ধার করতে হবে। তাছাড়া মরা মানুষের এমনিতেই এইসব জিনিস কোনো কাজে লাগে না, সে ভূত হোক অথবা না হোক!

আজহার সাহেব জামাকাপড় খুলে রেল লাইনের উপর বসে আছে। সেটা দেখে বেশ মজা পাচ্ছে লোকটা। মানুষকে বোকা বানানোর মজাই আলাদা!

সিগন্যাল বাজিয়ে ট্রেন আসছে তীব্র গতীতে।

পরদিন।

একই লাইনের ট্রেনে লোকটা উঠেছে। নতুন শিকারের আশায়। কোনো একজন চিন্তিত ব্যক্তি খুজে বের করতে হবে। যিনি জীবন নিয়ে বড্ড হতাশ। তাকে জানাতে হবে ভূত হওয়ার পদ্ধতি। জানাতে হবে ভূত পরবর্তী আনন্দময় জীবনের স্কীম। লোকটা সীটে বসে এদিক ওদিক তাকিয়ে বলির পাঠা খুজতে লাগলো।

এমন সময় শুনতে পেলো কানের কাছে ফিসফিস করে কেউ একজন বলছে, ‘ভাইসাহেব ভূত হওয়ার ইচ্ছা আছে নাকি? একবার হয়েই দেখেন, বড় আনন্দময় জীবন। শুধু একটাই সমস্যা এই জীবন বড্ড নিঃসঙ্গ। কথা বলার জন্য কাউকে চাই। আপনাকে চাই।’

লোকটা চমকে এদিক ওদিক তাকালো। সামনের সীটে এইটা কে বসে আছে! আজহার সাহেব। অন্তরাত্মা কেপে উঠলো লোকটার। দৌড়ে ট্রেন থেকে নামলো। পেছন পেছন আজহার সাহেব এগিয়ে আসছে, তার মুখে হাসি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।