নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত ভুতুড়ে এক আমেরিকান শহর

হঠাৎ করে শহরটার খোঁজ পাওয়া মুশকিল। স্যান ডিয়াগো থেকে উত্তর-পূর্ব বরাবর ১৪০ মাইল যাওয়ার পর হঠাৎ করেই দেখতে পাবেন সবুজে ভরা খামারগুলো কেমন যেন মরুভূমির মত হতে শুরু করেছে।

আরেকটু দূর এগোলেই নানা রকম গ্রাফিটি দেখে বুঝতে পারবেন, আপনি গন্তব্যের খুব কাছাকাছি চলে এসেছেন। ৬০ বছর ধরে দায়িত্বে থাকা গার্ডকে দেখে আপনাকে বুঝে নিতে হবে আপনি চলে এসেছেন স্ল্যাব সিটিতে – আমেরিকার একমাত্র অবাধ শহরে।

মূলত জায়গাটা মেরিন ট্রেনিংয়ের বেজ ক্যাম্প ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে টিকে থাকে কেবল কংক্রিকের ফলক। ভয়াবহ শীত থেকে বাঁচতে আমেরিকা ও বরফের এলাকার মানুষরা আসতো সেখানে। মূলত তাদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্তরাই বেশি। তাদের বলা হত ‘স্নোবার্ড’।

তারাই জায়গাটার নাম ফলকের শহর, বা স্ল্যাব সিটি। স্নো-বার্ডরা এখনো আসেন। শহরটিতে স্থায়ী ভাবে বসবাসকারীদের সংখ্যা ২০০’র মত। জনসংখ্যা আস্তে আস্তে কমে আসছে। না কমে উপায়ও নেই: তীব্র গরমে যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা থাকে ১২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস!

আধুনিক সমাজ থেকে পালিয়ে বেড়ানোর আবাসস্থল এই স্ল্যাব সিটি। অধিকাংশই ভবগুরে-যাযাবর, কেউ সংসারজীবন ত্যাগ করেছেন, কেউ মাদকের খপ্পরে পড়েছেন। আধুনিক নাগরিক জীবনের সুবিধা নেই বললেই চলে।

বলা হয়, এরাই নাকি আধুনিক গুহা-মানব। দশকের পর দশক ধরে ৬৪০ একরের ছোট্ট একটা জায়গায় জীবনের যুদ্ধ করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। আমেরিকা তো দূরের কথা, গোটা বিশ্বেও এমন শহর খুঁজে পাওয়া যাবে না।

আমেরিকান সরকার পারলে শহরটাকে বেঁচে দিতে পারলে বাঁচে। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান শহরটা লিজ নেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদনও করেছে। যদিও, স্থানীয়রা কোনো অভাব-অভিযোগ করেন না। তাদের জীবনের একটাই স্লোগান – ‘বাঁচো, যে যেভাবে চায় তাকে সেভাবেই বাঁচতে দাও!’

নাগরিক সুবিধা না থাকলেও এখানকার মানুষদের কোনো বাড়ি ভাড়া দিতে হয় না, ট্যাক্সের ঝামেলা নেই। এমন ভাবে তারা ঘুরে বেড়ান যেন এটাই বসবাসের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে আরামদায়ক স্থান।

এখানে একটা গীর্জা আছে। ইদানিং একটা লাইব্রেরিও হয়েছে। সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে কিছু জায়গায়। আধুনিক গুহা সভ্যতা থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা!

গত জুলাইয়ে সরকার স্ল্যাব সিটির একটা সড়ক বন্ধ করে দিয়েছে, কালভার্ট বানানোর কাজে। সরকারের মতিগতি ভাল ঠেঁকছে না স্থানীয়দের কাছে। তাদের দাবী, শিঘ্রই তাদের উচ্ছেদ করা হবে।

জমির মালিকানা কোনো প্রতিষ্ঠান পেয়ে গেলেও তাদের জীবনে নি:সন্দেহে আরো দুর্দশা নেমে আসবে। তাই স্টেট ল্যান্ড কমিশনের আইন অনুযায়ী নিজেরাই সবটুকু জায়গা কিনে নিতে চায় তারা। নিয়ম মাফিক দাম আসে পাঁচ লাখ ডলার; যাযাবরদের জন্য এটা আকাশচুম্বি দাম!

যদিও, একটা অংশ দাবী করছে চাইলে সর্বনিম্ন এক ডলার হারে প্রতি একর জমি কিনে নেওয়া যাবে। তার জন্য অবশ্য আসতে হবে কমপক্ষে পাঁচ হাজার দরখাস্ত।

সব মিলিয়ে স্ল্যাব সিটির ভবিষ্যৎ সংকটের মুখে। স্ল্যব সিটির আধুনিক যাযাবরেরা আপোষ করতে নারাজ। তারা সংগ্রাম চালিয়ে যেতে চায় – অবাধ জীবনের অবাধ স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম!

– কেপিবিএস.অর্গ ও গিগগ্যাগ.কম অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।