ভালবাসা একটা মাথাধরা অনুভূতির নাম: কঙ্গনা রনৌত

তার চলতি জীবন এবং মনের মধ্যে এক সমুদ্র ব্যবধান রয়েছে, যে সমুদ্রের সোতগুলি চালিত হয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা, বিশ্বাস, ঈর্ষা, প্রেম, আত্মনিবেদন, আবেগ এবং অতিঅবশ্যই যৌনতা দ্বারা। কিন্তু তিনি এক বৃহৎবপু নীল তিমির মত এই বিশাল সমুদ্র একাই বেশ সার্থকতার সাথে সাঁতরে যাচ্ছেন এবং আপনি তার উপস্থিতির প্রশংসাও করছেন।

নিজের আকাঙ্ক্ষিত কর্মজীবন এবং বর্তমান ভবঘুরে জীবনের মধ্যে দূরত্ব ঘোচাতে যে সেতু স্থাপনের দরকার পড়বে, তা নির্মাণে এক তরুণী এবং বর্তমান সময়ের দীপ্যমান অভিনেত্রী কঙ্গনা রনৌত এগিয়ে যাচ্ছেন সাবলীলভাবেই। এই স্পষ্টভাষী এবং স্বাধীন অভিনেত্রী জীবনের নানা মধুর আর কষ্টের অভিজ্ঞতার স্মৃতি থেকে জ্ঞান আরোহণ করেছেন এবং তারপরেই নিজের লক্ষ্য স্থির করেছেন।

নিজের সৃজনশীলতাকে আরও শানিত করার জন্য তার প্রাণান্ত প্রচেষ্টাই তার চরিত্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। চলচ্চিত্র জগতের শক্তিশালী চরিত্রগুলো তাকে পছন্দ করছে কি করছে না, তার দিকে না তাকিয়ে নিজের স্বকীয়তা ধরে রেখেই তিনি ভেঙে চলেছেন একের পর এক সাফল্যের সিঁড়ি। মুখের কোথাও কালো দাগ পড়েছে কিনা কিংবা নিজের অশান্ত অতীতের জঘন্য বিবরণ – সবকিছুই এই দৃঢ়চেতা নারীর মনে চিড় ধরাতে ব্যর্থ।

মুখমন্ডলের চোট, অতীত সম্পর্ক, নিজের চলচ্চিত্র লেখা এমনকি তাতে নির্দেশনা প্রদানের অভিজ্ঞতা, বিবাহিত পুরুষদের সঙ্গে সম্পর্কস্থাপন এবং প্রবল যৌনাকাঙ্ক্ষা সহ জীবনের সব খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে কথা বলতে, কিছুদিন পূর্বে তিনি মুখোমুখি হয়েছিলেন ফিল্মফেয়ার ম্যাগাজিনের। নিজস্ব ধারা মেনে সাফল্যের চূড়ায় আরোহণ করা এই অভিনেত্রীর মনের অর্গল খুলে দেয়া সেই কথোপকথন তুলে দেয়া হলো অলিগলি.কমের পাঠকদের জন্য-

আপনার মুখে আঘাতের চিহ্ন বেশ স্পষ্ট। শুটিং সেটে কীভাবে আঘাত পেলেন?

আমি তিনজন পুরুষের সাথে একটি তলোয়ারের যুদ্ধে কাজ করছিলাম। (হাসি) আমি মনে করি নিহার (পাণ্ডে, রায় সাহেব চরিত্রে অভিনয়রত) তার দায়িত্ব ভুলে গিয়েছিলেন এবং তখনই আমার মাথায় আঘাত করেন। এ ধরনের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা এড়ানোর কোন উপায় নেই। বিশেষত, যখন তা কোরিওগ্রাফি সম্পর্কিত। কেননা, নাচের সময় একসাথে বিভিন্ন দিক সমন্বয় করা খুব কঠিন। তবে এটি বেশ ভয়ংকর দুর্ঘটনা ছিল। আমার মুখের হাড় বের হয়ে এসেছিলো এবং আমার মুখ দিয়ে রক্ত ​ঝরছিল।

একজন অভিনেতা তো চেহারাসর্বস্ব। আঘাত পাওয়ার পরে কি আপনি এ নিয়ে ভীত হয়েছিলেন?

আমার মনে হয়, সিনেমাটিতে আমার চরিত্রের মধ্যেই এমন কিছু একটা ছিলো। দারুণ শরীরীভাষা আর শৃঙ্খলা ছাড়া কেউ যোদ্ধা হতে পারে না। যখন ধাতুর তৈরি ওই তলোয়ার আমার মাথায় আঘাত করেছিলো, আমি টের পেয়েছিলাম। আমি আমার মুখ কেটে রক্ত ঝরতে দেখেছি। ​​আমার কস্টিউমেও দাগ পড়েছিল। আমি নিককে (পাওয়েল, হলিউড অ্যাকশন পরিচালক) জিজ্ঞেস করলাম যে আমার সেলাই লাগবে কিনা। সে বললো, লাগবে। অতঃপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, কয়টি? প্রায় দশটার মতো লাগবে বলে তিনি জানান। আমি তাকে হাসপাতালের সেরা প্লাস্টিক সার্জনের কাছে নিয়ে যেতে বললাম। নিক এবং আমার প্রযোজক, কামাল জেইন এর মাঝে হাসির খোরাক খুঁজে পেলো যে আমি তাদের গাইড করছিলাম। সাধারণত, আমি রক্তপাত ভয় পাই। কিন্তু এই ক্ষেত্রটি ব্যতিক্রম ছিল। এবার সম্ভবত আমি রক্তপাত উপভোগ করছিলাম। তবে যদি তা সত্যিকার যুদ্ধের ময়দানে হতো তবে নিশ্চয়ই এ রক্ত ঝরায় উপভোগ্য কিছু থাকতো না। একজন রানীর জীবন সবসময় বিলাসিতা এবং গ্ল্যামারে পূর্ণ থাকে, কিন্তু যখন আপনি লক্ষ্মীবাই সম্পর্কে বলবেন, তখন বলতে হবে তিনি সেনাবাহিনীর যোদ্ধা ছিলেন। তিনি এক বিস্ময়কর নারী ছিলেন। নিজের যৌবনে কত যুদ্ধেই না তিনি লড়েছিলেন! তিনি ছিলেন অনেকটা ‘কিলিং মেশিন’য়ের মত। তাই কেবল পোশাক, মেক-আপ, চুলের ধরন এবং গহনা দ্বারা তার মতো চরিত্রের চরিত্রায়ন করা লজ্জাজনক হতো। এবং যদি আপনি এমন এক নারীর চরিত্রে কাজ করতে গিয়ে রক্ত দেন, তবে তা যথার্থ। সত্যই বলছি, এ রক্ত ঝরায় আমি প্রবল আনন্দিত। আপনি মুখে যুদ্ধের দাগ না রেখে, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ যোদ্ধাদের চরিত্রকে অমর করতে পারবেন না। সুতরাং এটি ন্যায্য।

যদি এই দাগ না যায় তবে কি আপনি প্লাস্টিক সার্জারির সম্মুখীন হবেন?

আমার শৈশবকালের দুর্ঘটনাগগুলো আমার শরীরে অনেক দাগই রেখে গিয়েছে। প্লাস্টিক সার্জনরা বলেন – এক দাগ মুছে ফেলতে আপনার আরেকটি দাগ তৈরি করতে হবে। সুতরাং, ক্ষত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া কঠিন। সত্যি বলছি, মুখে দাগ থাকা-না থাকায় আমার কিছু যায়-আসে না। যদি কোনো নরম মেয়ের চরিত্রে কাজ করতে হয়, তখন আমার সামনে সবসময় মেকআপ কিংবা সিজি ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছেই। আমি এখানে আপনার সামনে বসে রয়েছি কোনো ধরনের মেকআপ ছাড়াই, এমনকি আমার চুলও বাঁধি নি। এসব জীবনের অংশ-ই।

আপনার হৃদয়েও তো ক্ষত হতে পারে … আমরা তা দেখছি না …

অবশ্যই, আমাদের সবার হৃদয়েই ক্ষত রয়েছে এবং তারা যুদ্ধজয়ী মেডেলের মত। আপনার মন, আপনার অন্তরাত্মা আপনার জীবনে মুখোমুখি হওয়া অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে অনেক ক্ষত বহন করতে পারে, যা স্মরণ করিয়ে দেয় আপনি কতটা দৃঢ়ভাবে লড়াই করেছেন এবং পাল্টা আক্রমণ করেছেন। আপনি ভীত ছিলেন নাকি অন্যরা আপনার কারণে ভীত ছিল… এটি সবসময় নির্ভর করে, আপনি জীবনে কিভাবে চলেছেন তার উপর।

এই মনের ক্ষত কখনও সারানো যায়?

তাদের আরোগ্য করবার কোন প্রয়োজন নেই। তারা এমন পদক যা আপনাকে হাসিমুখে গলায় তুলতে হবে। (হাসি) সম্ভবত এখন আমার কপালে একটি দাগ দেখা যাচ্ছে, যা আমার দুই ভ্রুকে যোগ করবে, যেন তারা আবার পৃথক না হয়ে যায়। আপনি যত বেশি এমন পদক পাবেন, আপনি তত বেশি সজ্জিত হয়ে, তত বেশি অভিজ্ঞতা নিয়ে জীবনের সমস্যাগুলো মোকাবিলা করতে পারবেন।

পর্দায় আপনাকে নানা চ্যালেঞ্জ আকৃষ্ট করে। পর্দার বাইরেও কি?

আমি অসাধারণ কিছু করতে পছন্দ করি। বর্তমানে আমার বয়স ৩০ এবং এটাই আমার জন্য আলাদা কিছু, অসাধারণ কিছু করার জন্য উপযুক্ত সময়। আমি আমার কিশোর বয়সে অনেক ছেলেমানুষি কাজ করেছি। ভবিষ্যতেও আমি তেমন কিছু করতে পারি, হয়তোবা জেনে কিংবা না জেনে। আমরা শিল্পী, আমরা মানুষকে বিনোদিত করার চেষ্টা করি কিন্তু দিনশেষে সেই বিনোদনের অর্থ থাকতে হবে। সেটা তখনই সম্ভব হবে, যখন আপনি চ্যালেঞ্জিং জোনে প্রবেশ করবেন। হয়তো আমি এমন কোনো স্ক্রিপ্টে কাজ করতে পারি, যা হয়তোবা আমাকে আর্থিক সাফল্যের নিশ্চয়তা দেবে না, তবে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের ব্যক্তিগতজীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। সিমরানের কথাই ধরুন না! চলচ্চিত্রটি একজন উচ্চাভিলাষী নারীর গল্প, নির্বাসনের গল্প। আমি নিশ্চিত, সিনেমাটি সবার জীবনকেই অনুরণিত করবে। গল্পটি কোনো একক নারী সম্পর্কে নয়; এটি বর্তমান যুবাদের এবং তাদের উচ্চাকাঙ্খার গল্প। সিনেমাটিকে কেবলই নারীদের বলে আখ্যা দেবার কোনো সুযোগই নেই, বরং এই গল্পটি সবার, সার্বজনীন।

এমন এক সময় ছিল যখন আপনি স্বেচ্ছাতেই কয়েকটি চলচ্চিত্র কেবল অর্থের জন্য করেছিলেন …

আমি অর্থের জন্য চলচ্চিত্রে কাজ করি! আমি টাকার জন্য কাজ করি না, এমন ধারণা ভুল। আপনি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল না হলে কেবল নাম কিংবা খ্যাতিতে কি আসে-যায়। আমি বাড়িতে বসে আমার প্রিয় খাবার রান্না করতে পারতাম এবং আমার পছন্দের লোকেদের সাথে সময় কাটাতে পারতাম। কিন্তু তা না করে, আমি আমার যৌবন এবং সময়কে উৎসর্গ করে যে কাজ করছি, সেখান হতে আমি উপার্জন করতে চাই, মুনাফার ভাগ পেতে চাই। এবং এ সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই।

তবে এখন কি লভ্যাংশ পেতে শুরু করেছেন?

এখনো না। এখন পর্যন্ত, আমি আমার পারিশ্রমিক ধরা-বাধা, তবে আমার পরবর্তী ছবি ‘তেজু’তে, আমি লভ্যাংশ ভাগ করে নেব। (হাসি) আমি একজন অভিনেত্রী হিসাবে, পরিচালক হিসাবে এবং প্রযোজক হিসাবে মুনাফার ভাগ নেব।

‘তেজু’র পরিচালক হবার পেছনের রহস্য কি?

আমি বিশ্বাস করি সৃজনশীলতা একটি পাকা ফলের মত। যদি আপনি এটি না ছেঁড়েন, তবে এটি পচতে যাচ্ছে। এখন আমি একজন পরিচালক হতে প্রস্তুত। গত দশ বছরে আমি অনেক পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছি। আমার এখনকার অগ্রাধিকার, জীবনে বড় কিছু করা। আমি তেজুতে একজন নানীর চরিত্রে অভিনয় করেছি। এছাড়াও এ চলচ্চিত্র পরিচালনার আরেকটি কারণ হলো, শৈলেশ সিং ছবিটি প্রযোজনা করেছেন। তনু ওয়েডস মনু (টিওয়াইএম), তনু ওয়েডস মনু রিটার্নস (টিওয়াইএমআর) এবং সিমরনের পরে ‘তেজু’ তার সাথে আমার চতুর্থ ছবি হবে। টিওয়াইএম-য়ের কাজ চলার সময়ে, অর্থের অভাবে কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু শৈলেশ একসাথে সবাইকে নিয়ে দারুণ একটি কাজ উপহার দিলেন। তিনি আপাদমস্তক একজন সৃজনশীল ব্যক্তি। তিনি মনসুর খানকে সহায়তা করেছেন।

 ‘তেজু’কে আপনার ‘বায়োপিক’ বলা হচ্ছে, এ ব্যাপারে কি বলবেন?

এটা কিভাবে সম্ভব? আমি তো কারও নানী নই। এটি একটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র। হ্যা বলা যেতে পারে, এটা আমার জীবনের একটি ছোট অংশ যখন আমিও একটি ছোট মেয়ে ছিলাম, ‘দাদীমা কি কাহানিয়া’তে দেখে যখন আমার মাঝে জীবন সম্পর্কে রূপকথার ধারণা জন্মেছিল।

‘সিমরান’ সিনেমায় আপনার চরিত্র প্রফুল প্যাটেল, কঙ্গনার মতোই – স্বাধীন ও আলাদা। আপনি এই স্ক্রিপ্টের সহলেখক, কারণ কি এটিই?

এটা আমার সম্পর্কে নয়। এটি নারীদের গল্প, এটি যুবকদের আকাঙ্খার গল্প। আমি এই চরিত্রের উপর কাজ করেছি এবং নানা স্তর, গভীরতা, ব্যক্তিত্ব যোগ করেছি … প্রফুল এমন একজন, যে প্রচণ্ড উচ্চাভিলাষী, তবে দুঃখের বিষয়, সে একজন সাধারণ মেয়ে-ই। তার জীবনে অসাধারণ কিছু ঘটেনি, কিন্তু তার অদম্য উদ্যম রয়েছে। সে জীবনের জাদুকে অনুসরণ করা ছাড়েনি, তবে এই জাদুকে সে বুঝতেই পারেনি। আমি নিজেও জীবনের জাদুতেই এগিয়ে যাই। আদতে, প্রফুল সম্পর্কে আমি এমনটিই ভাবি। সে কারো বোঝা হতে চায় না। সে ধনী হতে চায়। কখনও কখনও নারীরা উচ্চাকাঙ্ক্ষী হওয়াকে দোষ মনে করে। কারণ তারা বিশ্বাস করে যে শুধুমাত্র নিজের সম্পর্কে চিন্তা করাটা এবং স্বামী বা সন্তান বিহীন জীবন কাটানোর চিন্তাটা মোটেও আদর্শ নয়।

হানসাল মেহতার সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

আমি মনে করতে পারি না, শট চলাকালে একবারও আমি মনিটরে তাকিয়েছিলাম কিনা। সে এমন কেউ, যার উপর আমি পুরোপুরি নির্ভর করতে পারি। যখন আপনি একইসাথে লিখছেন এবং অভিনয় করছেন, তখন আপনি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন। তার ভেতরে এই ব্যাপারটি বোঝার এবং সিনেমার ভাব বোঝার শক্তি রয়েছে। আমার লেখা অংশে আমি ছবিটিতে প্রফুল্লতা যোগ করেছি। সিমরান আমাদের যৌথ উদ্যোগ। এটি যদিও হানসাল মেহতার ছবি কিন্তু এর সঙ্গে কঙ্গনা রনৌতও যুক্ত। কঙ্গনার অংশগ্রহণ সিনেমাটির ব্যাপকতা বাড়িয়েছে বলেই আমি বিশ্বাস করি।

আপনি প্রায়ই পরকীয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হন? এ ব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া কি?

মানুষ কেবল আমাকে আক্রমণ করার জন্যই এই কাজগুলো করে। কারণ আমি বেশ দ্রুত উপরে উঠছি। এটি কি করে সম্ভব হতে পারে, যে আপনার কাজ বেড়েচি চলেছে এবং কিছু লোক বারেবারে আপনাকে দিয়েই কাজ করানোর জন্য আপনার দরজায় কড়া নাড়ছে? এই অভিযোগ আমি গায়ে মাখি না।

কোন ব্যক্তিকে আপনি পর্দায় চিত্রিত করতে চান? আপনার হিরো হিসেবে কাকে বেছে নেবেন?

আমার আদর্শ হচ্ছেন স্বামী বিবেকানন্দ। কিন্তু আমি নিজেই আমার নায়ক। এছাড়াও, আমি সাধারণ মানুষকে ভালবাসি। অসাধারণ চরিত্রগুলোর বদলে আমি দৈনন্দিন জীবনযাপনের সাধারন্যকে ভালবাসি। এবং এই সাধারণ চরিত্রগুলোই আমাকে প্রচুর সাফল্য এনে দিয়েছে। বলতে পারি, ‘তনু ওয়েডস মনু রিটার্নস’য়ের রানী কিংবা বর্তমানে সিমরানের প্রফুলের কথা, যারা খুবই সাধারণ।

একজন সংগ্রামকারী নারী থেকে ‘মানিকর্ণি’তে কাজ করে ১১ কোটি রুপি আয় করা নারী … এটি তো বেশ ঘটনাবহুল যাত্রা …

আমার মুম্বাই অভিজ্ঞতা আমাকে জাগিয়ে তুলেছিলো। আমি এখানে যখন এসেছিলাম, তখন আমি ট্রেন এবং অটোতে ভ্রমণ করে অভ্যস্ত। কাজ শুরু করার পরে, আমি নিজের একটি ছোট গাড়ী পাই। আজ আমি সবচেয়ে ব্যয়বহুল গাড়িগুলোর মালিক। আমার নিজের একটি দল রয়েছে, যারা আমাকে সর্বদা অনুসরণ করে। এ যেন অল্প সময়ের মধ্যে ভিন্ন দুই জগতে বসবাসের মত। এ জন্য আমার নিজের পূর্বেকার জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেই হবে। মুম্বাই এমন একটি শহর যা প্রতিনিয়ত আপনার পরীক্ষা নেবে। বিশেষ করে, যখন আপনি জনাকীর্ণ বাস বা ট্রেনে উঠবেন, এমনও হতে পারে একজন আরেকজনের উপরে চেপে বসেছে। সে দিনগুলো যারা পার করে এসেছেন, তারা কখনোই সে স্মৃতি ভুলবেন না, আমি তো নই-ই। এমনকি আজ যখন আমার গাড়িতে আমি বসে থাকি, আমি সোজা সামনে দৃষ্টি দিই। আমি আনন্দিত যে আমার আজকের অবস্থানে পৌঁছনোর আগে আমি জীবনের সব অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই গিয়েছিলাম। এটা আপনাকে বাস্তববাদী করে গড়ে তোলে এবং জীবনের মরীচিকাগুলো সম্পর্কে সজাগ করে দেয়। ছোট শহর মানালি থেকে মুম্বাইয়ের এই আলো ঝলমলে নগরী জয় করা, আমার জন্য পুরো বিপরীত এক অভিজ্ঞতা। ওই দিনগুলিতে ভাদা-পাভের জন্য চৌপাটিতে যাওয়াই ছিলো রোমাঞ্চকর এক ব্যাপার।

সেই দিনগুলোতে কি কোন দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলেন?

চলচ্চিত্র জগতের মানুষদের এ ধরনের বিচারের মুখোমুখি করা অনুচিত। আকারে-ইঙ্গিতে এমনটা বলার কোনো মানে নেই যে তারা শরীর দেখিয়ে, ক্যামেরার সামনে অসংযত আচরণ করেই অর্থ আয় করেন, তাদের কোনো মূল্য নেই। আমি যখন এ জগতে কাজ শুরু করেছিলাম, হ্যাঁ, আমি অনেকের দ্বারা আঘাত পেয়েছিলাম। কত পুরুষ যে আমাকে কাছে পেতে চেয়েছিলো তার কোন হিসেব নেই, বিবাহিত, অবিবাহিত, বৃদ্ধ, তরুণ … সবাই। কিন্তু আমি যখন দিল্লিতে একজন মডেল হিসাবে উঠে আসার চেষ্টা করছিলাম কিংবা যখন আমি শিক্ষার্থী ছিলাম তখনও ব্যাপারটি একইরকম ছিলো, পুরুষদের আমার প্রতি দৃষ্টিটা ভিন্ন কিছু ছিলো না। এবং যখন পুরুষরা প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফিরে যাওয়ার পরের ধাপ তো আরও তিক্ত। আমার কর্মপরিবেশ ক্রমেই কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠতে শুরু করে। এবং শেষমেশ যদি আপনি সহ্য করতে না পেরে সহকর্মীদের সঙ্গে রাত কাটিয়ে এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টাও করেন, পরিস্থিতি সহজ না হয়ে বরং আরও জটিল আকার ধারণ করবে। (হাসি) ‘ম্যাচিং গেম’টি সর্বত্র একই। তবে আমি একবার এমন বাজে ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলাম, একজন আমাকে শারীরিকভাবে হেনস্থা করার চেষ্টা করেছিলো কিংবা আমাকে বাধ্য করেছিলো, আমি তার প্রতিবাদ করেছি। এটা এমন কিছু ছিল না যে আমি একটি ফিল্মে কাজ করছিলাম কিংবা তিনি আমার সহ-তারকা ছিলেন। আমি ঠিক জানি না যে চলচ্চিত্র শিল্পের সাথে এই ঘটনাকে আমি মেলাতে পারি কিনা, তবে ওই ব্যক্তি কিছু সময় এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আসলে এটি আপনার ব্যক্তিগত পছন্দ। যে কেউ আপনাকে যেকোনোভাবে সাহায্য করতে পারেন।

আপনি ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেন নি?

হ্যা, নিয়েছিলাম তো। আমি পুলিশের কাছে গিয়েছিলাম এবং লড়াই করে ফিরে এসেছি। আদতে, তখন আমি সেই ব্যক্তিকে বিশ্বাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তবে কিছুকাল পরেই বুঝতে পেরেছিলাম যে সে আমাকে সাহায্য করতে পারবে না। যে ব্যক্তি নিজের জন্যই কিছু করতে পারে না, সে আমার জন্য কীভাবে কিছু করবে? একথা বলে, আমি এ জগতে অনেক নাম কামিয়েছিলাম। আমি অনুরাগ বসু এবং মহেশ ভাটের মত দারুণ কিছু মানুষদের ছবির মাধ্যমে এ জগতে যাত্রা শুরু করেছি। কিন্তু এ জগতে এমন অনেক কাস্টিং এজেন্ট আছে কিংবা এ জগত থেকে ব্যর্থ হয়ে জাল কাস্টিং এজেন্ট খুলে, কফিশপগুলোতে বসে, জাল প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে মানুষকে স্বপ্ন দেখায় এবং তাদের অসাদু যাত্রায় সরল মনের মানুষদের অংশ করে নেয়। এ ধরনের মানুষদের, এই শিল্পের অংশ বলাটা মোটেও উচিৎ নয়। আমাদের এই লোখান্দলাতে প্রতিদিনই এমন শতশত বানোয়াট প্রকল্প তৈরি হচ্ছে।

কিভাবে একটি মেয়ে এমন একটি পরিবেশে নিজেদের রক্ষা করে চলতে পারে?

এখন আমি সর্বত্র মেয়েদের সরলতার সুযোগ নেওয়ার ভয়াবহ ঘটনা শুনতে পাচ্ছি। আপনার নিজেরই নিশ্চিত হতে হবে যে আপনি নিরাপদ। যারা আপনাকে আপোষ করার মাধ্যমে কাজ দেবার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, জেনে রাখুন, তারা আপনাকে কাজ দেবে না। আমি আপনাকে একথা লিখে দিতে পারি। আপনাকে সরাসরি কথা বলা শিখতে হবে এবং অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেয়ার খেলা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যদি আপনি একটি সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তখন মানুষ আপনার প্রতি পক্ষপাত শুরু করে… এটিও আপনার দিকেই ব্যাকফায়ার করবে যখন আপনি সম্পর্কটা আর টানতে চাচ্ছেন না। একটি জিনিস সবসময় মনে রাখবেন, যে আপনাকে গড়তে পারেন, সে আপনাকে ভাঙতেও পারেন। যে আপনাকে গড়তেই পারেন না, তিনি কেমন করে ভাঙবেন! আপনি এমন কারও উপর নির্ভর করলে, তখন কেবল ওই পরামর্শদাতার পুতুল হয়েই থাকবেন। এমন সাফল্যের মানে কি? যদি কারো উপর নির্ভরশীল হতেই হয় তবে অন্য কারো উপর নির্ভর করার পরিবর্তে আপনার বাবার উপর নির্ভর করুন। কেন একজন অপরিচিত ব্যক্তির জন্য বাড়িঘর ছেড়ে দুরবস্থার মধ্যে পড়বেন? বিয়ে করুন; আপনার স্বামীকেই আপনার জীবনের সেই ব্যক্তি হতে দিন, যার উপর আপনি পুরোপুরি নির্ভরশীল হতে পারেন। অন্ততপক্ষে তার পরিবারের উপর। কেন ওই ব্যক্তির পাপেট

শো’য়ের পুতুল হবেন, দুবছর পরে যে আপনাকে ছেড়ে যেতে পারে?

এখন আপনি একজন তারকা এবং সবসময় মানুষের স্পটলাইট আপনার উপরই থাকে। কিন্তু এমন সময় অবশ্যই আসবে যখন আপনি একা হয়ে পড়বেন, এই ঝলমলে আলো আপনার উপর থাকবে না…

মানুষের জন্য এবং বিশেষ করে শিল্পীদের জন্য এমন সময় আসতেই পারে। একবার সেলিম চাচা (খান) আমাকে বলেছিলেন, ‘শিল্প একাগ্রচিত্তে, একাকী তৈরি হয় এবং প্রবল জনমানুষের ভিড়ে প্রদর্শিত হয়।’ সুতরাং আপনি চূড়ান্ত অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়েই যাচ্ছেন। তবে অন্তর্বর্তী পর্যায়টা একটু বিভ্রান্তিকরও হতে পারে।

আপনার ব্যক্তিত্বের ভেতর একটি সহজাত তীক্ষ্ণতা রয়েছে … আপনার কণ্ঠস্বরে, আপনার চিন্তাভাবনায় … আপনি এটাকে কিভাবে দেখেন?

আমার জীবনটা হচ্ছে প্রথম কেনা বইয়ের ক্রেতার মতো। কারো কাছ থেকে ধার করা না, কোনো বই থেকে ধার করা না। আমি প্রচণ্ড উথালপাতালে ভরা জীবন কাটিয়েছি; আমি অনেক সংগ্রাম দেখেছি। যদিও এখন আমি একটি দারুণ বাড়ীতে বাস করি এবং আমি দারুণ গাড়ির মালিক, তবে এখানে পৌঁছানোর আগে অন্য কোথাও ছিলাম। এটাই আমার জীবনের সৌন্দর্য।

আপনি জীবনে তো সবকিছু আছে – সাফল্য, সম্পদ, খ্যাতি … তাহলে একজন পুরুষ আপনাকে কি দিতে পারে?

একজন মানুষের সাথে জুটি তখনই গড়া হয়, যখন আপনি পরিবারের মতো একটি বড় প্রকল্পের অংশীদার হতে চান। আমি এমন একটি বড় পরিবার চাই যেখানে আমি ভরসা করতে পারবো, সারাদিনের নানা কাজ শেষে, নানা বিপর্যয়ের পর যেখানে আমি আশ্রয় পাবো, একসাথে জীবনের আনন্দ আর কষ্টের মুহূর্তগুলো ভাগ করে নিতে পারবো। আমি এমনটিই বিশ্বাস করি। একজন মানুষ আমার জীবনে যা যোগ করতে পারেন, তিনি আমার সাথে মিলে আমাদের দুজনের জীবন গড়ে তুলবেন। আমরা দুজনে হবো একটি ছোট্ট পৃথিবীর মতো যেখানে আমরা পরস্পরকে বিশ্বাস করতে পারবো, একে অপরের উপর নির্ভর করতে পারবো। জীবনে টাকাপয়সা, অর্থবিত্ত, খ্যাতির চেয়ে এটিই কি মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন নয়? যেখানে তার মতোই একজন মানুষের সাথে সে তার সময় আর আবেগ ভাগ করতে পারবে।

ছেলেরা কি আপনাকে খুব ভয় পায়?

হ্যাঁ, অবশ্যই। তারা খুব ভয় পায়। ( হাসি) এটা আমার জন্য ভাল কিছু নয় কেননা নিজের সংবেদনশীল জায়গাকে অনাবৃত রাখা, বেবি ডলের মতো নিজের স্তনগুলোকে দোলানো নারীদের জীবনে খুব বেশিদিন টেকে না। সুতরাং কেউ যদি তার যৌনতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হন, তার প্যান্টের মধ্যে নিরাপদ না হন, তিনি আমার কাছে মূল্য পাবেন না। আমি আমার নিজের মতই। আমি বরং এমন একজনের সাথে জীবন কাটাবো যিনি আমার নির্ভীকতা এবং একজন নারী হিসাবে আমার বন্যতাকে গ্রহণ করতে পারবেন। তবে দুঃখজনক হচ্ছে, খুব অল্প সংখ্যক পুরুষ রয়েছেন যারা আগুন নিয়ে খেলতে ভালোবাসে। এবং এর চেয়েও কম সংখ্যক পুরুষ রয়েছে যারা বন্য জন্তুকে বশ করতে চায়।

আপনি অনেক সম্পর্কে জড়িয়েছেন … সমস্ত পুরুষজাতির সাধারণ বৈশিষ্ট্য কি?

পুরুষদের সবচেয়ে সাধারণ বৈশিষ্ট্য, তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। তারা একজন ব্যক্তি হিসাবে আমার সাফল্য ও আত্মবিশ্বাসের জন্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, এই কারণে জীবনের অনেক পর্যায়েই আমি একগুঁয়ে আর কঠোর হতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমার মনে হয়, আমার সাথে কোনো বিতর্কে জয়লাভ করা কঠিন।

নারীরা কি আপনার উপর হামলে পড়েন?

এটি একটু কঠিন যদি কেউ সত্যিই প্রেমে পড়ে। কিন্তু কেউ যদি সময় কাটানোর উদ্দেশ্যে আপনার কাছে আসে, আপনি এটা সমাধান করতে পারবেন। যখন একজন পুরুষ বা নারী প্রকৃতপক্ষেই আমার প্রেমে পড়েন, তখন এই ধরনের পরিস্থিতিগুলি সামাল দেয়া আমার জন্য একটু অদ্ভুত হয়ে দাঁড়ায়। যদি আপনি এমন কোনো ব্যক্তির প্রেমে পড়েন যে আপনার অনুভূতিগুলোর মূল্য দিতে পারে না, তবে তা খুবই পীড়াদায়ক। আমি এই ব্যাপারগুলোতে খুবই সংবেদনশীল। আমার আর এই ধরনের ঘটনার মুখোমুখি হতে হবে না, এমনটিই আশা করি।

আপনি কি ভালোবাসা খুঁজে ফিরছেন?

আমি ভালবাসা খুঁজছি না। কারণ আমার জীবনে এমন কখনও ছিল না যখন আমি প্রেমিকা ছিলাম না। অবশ্যই, আমি ভালোবাসি। একজন শিল্পীর জীবনে ভালবাসা না থাকাটা অসম্ভবের পর্যায়ে পড়ে … অন্যথা আপনি মারা যাবেন। আপনি যদি প্রেমে না পড়েন, তবে আপনি একজন মৃত মানুষের মতোই। এটি শিল্পী জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট। আপনি যদি না ভালবাসেন, আপনি নতুন কিছু তৈরি করতে পারবেন না। আপনার শিল্পকে জীবন্ত করতে পারবেন না। আপনার ভেতরের সৃজনশীলতা ভেতরেই পুড়ে ছাই হয়ে যাবে, যদি না আপনি ভালোবাসেন। এখানে বিকল্প বাছাইয়ের কোনো সুযোগ নেই; কেননা সবসময় প্রেমের মাঝে থাকাটা আমার জন্যে অতিআবশ্যক। প্রেম হচ্ছে নিজেকে অন্য একজনের কাছে সপে দেয়া। যদি প্রেম আপনাকে পাগল না করে তোলে, যদি এটি আপনার মনকে বাঁধনছাড়া না করে, যদি এটি আপনি পাগলাটে জিনিস করতে বাধ্য না করে, যদি আপনার ভেতরের আগুন প্রজ্বলিত না করে, তবে দুঃখিত, একে আমি প্রেম বলতে পারছি না। প্রেম এক আসক্তি-সৃষ্টিকারী আবেগের নাম; এক মাথাধরা অনুভূতির নাম।

একটি সম্পর্কে যৌনতা কি অতিরিক্ত হাইপ পায়?

না, যৌনতা ঠিক ততটুকুই হাইপ পায়, যতটুকু এটি দাবী করে। একজন মানুষের কাছ থেকে যৌনতা যতটুকু হাইপ পায়, তার প্রতি বিন্দু, প্রতিকণারই সে যোগ্য।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।