ভালবাসার দিনে দিপালী-কাঞ্চন-জয়নালদের জন্য ভালবাসা

আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি, ভ্যালেন্টাইন ডে। ভালোবাসা দিবস। এই শহর অার শহরের মানুষেরা, দেশ অার দেশের মানুষেরা ভালোবাসা দিবস উদযাপন করছে। প্রেমিক-প্রেমিকেরা একে অপরের প্রতি অারো বেশী অনুভব করবে ভালোবাসা। ভালোবাসায় ভরে যাবে শহরের অলিগলি, হিবিজিবি মাঠঘাট। শান্তি পাবে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের অাত্মা। শান্তি পাবে সবাই। কিন্তু দীপালি, কাঞ্চন, জয়নালরা? ওরা শান্তি পাবে? কি জানি!

হয়তো ভাবছেন, এই দীপালী, কাঞ্চন, জয়নালটাই বা কে! ভালোবাসা দিবস উদযাপন করার সাথে তাদের শান্তি না পাওয়ার সম্পর্কটা কি! এইখানে অামি দীপালীদের কথা বলছিই বা কেনো?

১৯৮২ সালের ২৪ শে মার্চ লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলের পরপরই তাকে ছাত্রদের প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছে। একইসাথে শুরু হয় ধরপাকড়। প্রথমদিনেই কলাভবনে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে পোস্টার লাগাতে গিয়ে গ্রেফতার ও সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন ছাত্রনেতা শিবলি কাইয়ুম,হাবিবুর রহমান ও আব্দুল আলী।

সে সময় সামরিক সরকারের শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খান ক্ষমতায় এসেই নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্ব ও রেজাল্ট খারাপ হলেও যারা ৫০% শিক্ষার ব্যয়ভার দিতে সমর্থ, তাদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয় এতে। এই নীতিতে দরিদ্ররা উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হতে পারে বলে ছাত্ররা এর প্রবল বিরোধিতা করে। ১৯৮২ সালের ১৭ ই সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবসে এই শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে ছাত্র সংগঠনগুলো ঐকমত্যে পৌঁছে।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারির জন্ম। এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মজিদ খানের কুখ্যাত শিক্ষানীতি প্রত্যাহার, বন্দি মুক্তি ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবি ও গণমুখী, বৈজ্ঞানিক ও অসাম্প্রদায়িক শিক্ষানীতির দাবিতে ছাত্র জমায়েত ডাকে।

হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ মিছিলটি হাইকোর্টের গেটের সামনে ব্যারিকেডের সামনে বসে পড়ে এবং ছাত্রনেতারা তারের ওপর উঠে বক্তৃতা শুরু করে। এসময় পুলিশ বিনা উস্কানিতে তারের একপাশ সরিয়ে রায়ট কার ঢুকিয়ে দিয়ে রঙ্গিন গরম পানি ছিটাতে থাকে, বেধড়ক লাঠিচার্জ, ইট-পাটকেল ও বেপরোয়া গুলি ছুড়তে শুরু করে। গুলিবিদ্ধ হয় জয়নাল। এরপর গুলিবিদ্ধ জয়নালকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা হয়।
এসময় দিপালীও গুলিবিদ্ধ হন এবং পুলিশ তার লাশ গুম করে ফেলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিহত ও আহতদের অ্যাম্বুলেন্সে পাঠিয়ে নিয়ে আসতে চাইলে ঘটনাস্থলে ঢুকতেও দেওয়া হয়নি। কিছু না ঘটা সত্ত্বেও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে, এমন অপপ্রচার চালিয়ে সামরিক সরকার উস্কে দেয় পুলিশকে। ঐদিন নিহত হয়েছিল জয়নাল, জাফর, কাঞ্চন, দীপালীসহ আরো অনেকে। সরকারী মতেই গ্রেফতার করা হয় ১,৩৩১ জন ছাত্র-জনতাকে, বাস্তবে এই সংখ্যা আরো বেশি ছিল। খোঁজ মেলেনি অনেকেরই।

এই ঘটনার জোয়ার লাগে চট্টগ্রাম শহরেও। মেডিক্যাল ও অন্যান্য কলেজের শিক্ষার্থীদের মিছিলে পুলিশ লাঠি চার্জ ও গুলি চালালে নিহত হয় কাঞ্চন। ছাত্রদের তিনটি মৌলিক দাবিতে ১৮ ফেব্রুয়ারি শিক্ষানীতি স্থগিত হয়ে যায়।

বুঝতে পারলেন? কেনো দীপালীরা শান্তি পাবেনা?

অামরা বেমালুম ভুলে বসে অাছি, শিক্ষানীতি বাতিলের দাবীতে শহীদ হয়েছিলো দীপালী, কাঞ্চন, জয়নালরা। অামরা বেমালুম ভুলে বসে অাছি স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস।

শুনুন, ভালোবাসা দিবস উদযাপনের প্রতি কারো কোনো ক্ষোভ নেই। অামরা শুধু চাই, অামরা যেনো স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসের কথা ভুলে না যাই। অামাদের পূর্বসূরি যারা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন অামরা যেনো তাঁদের একটু স্মরণ করি।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।