ভর্তি যুদ্ধ নাকি জীবন যুদ্ধ

১.

ছোট বেলায় শুনেছি একটা সময় ছিল যখন কেউ মেট্রিক পাশ করলে দূর দূরান্ত থেকে তাকে দেখার জন্য অনেক মানুষ আসতো। আমাদের সময় এরকম ছিল না, তবে কেউ ভালো রেজাল্ট করলে তাকে দেখার জন্য অন্তত আত্মীয় স্বজনরা আসতো।

ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় হুট করে বুঝতে পারলাম সেরকম একটা ভালো রেজাল্ট হয়তো আমি করে ফেলেছি। কারণ আমার যে দাদা কোনদিন গ্রাম থেকে অসুস্থ হলেও চিকিৎসার জন্য শহরে আসতে চায় না তিনিও আমাকে দেখার জন্য ঢাকায় এসে পড়েছেন। কারো কাছ থেকে শুনতে পেয়েছেন যে আমি ক্লাস ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষায় আমাদের থানার মাঝে প্রথম হয়েছি।

দাদাজান আমাকে প্রথমে দোআ করলেন যেন আমি অনেক বড় হই। তারপর জিজ্ঞেস করলেন বড় হয়ে আমি কি হতে চাই?

সেই মূহুর্তে আমি সবে মাত্র রোমেনা আফাজের দস্যূ বনহুর পড়া শুরু করেছি। ধনীদের ধন সম্পদ লুট করে গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার কাজটা নায়কোচিত। দস্যূ বনহুর আবার রোমান্টিক পুরুষও ছিলেন। তার দুই স্ত্রী, একজন শহরে থাকে, আরেকজন জঙ্গলে। এই দুই স্ত্রী ছাড়াও অনেক নারী তার জন্য পাগল।

একটা বয়সে সবাই নায়ক হতে চাইতো। আমিও তাই কোন দ্বিধা দ্বন্ধ ছাড়াই বলে দিলাম দস্যূ বনহুরের মতো হতে চাই। কেন হতে চাই তার কারণ গুলোও বললাম।

আমার দাদাজান দস্যূ কি সেটা সম্পর্কে ভাল করে জানতেন না। যখন বুঝলেন আমি ডাকাত হতে চাই তখন আমি আমার ডান কানে বো বো টাইপ একটা শব্দ অনুভব করলাম। একটু পর বুঝতে পারলাম উনি রেগে গিয়ে আমাকে চড় মেরেছেন।

পরে বাড়ির সবাই মিলে আমাকে বুঝালেন যে গল্প উপন্যাস আসলে ভিন্ন জিনিস, বড় হয়ে ডাকাত হতে চাওয়া কোন লক্ষ্য হতে পারে না, ডাক্তার হতে হবে। মানুষের সেবা করতে হবে।

আমি বুঝলাম না, দস্যূ বনহুরও তো মানুষের সেবাই করে। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? কিন্তু সেই মূহুর্তে আর কথা বাড়ালাম না। সেই বয়সে অন্তত এতটুকু বুঝতে পেরেছিলাম যে বড়রা আর যাই হোক ছোটদের মতামতকে মূল্য দেয় না। মুখে যাই বলি, সেদিনই মনে মনে সংকল্প করে ফেলেছিলাম জীবনে আর যাই হই ডাক্তার অন্তত হবো না।

২.

তবে চাইলেও আপনি সব কিছু করতে পারবেন না । আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডাক্তার আর ইঞ্জিনিয়ার ট্যাগ ধারী মানুষেরা সমাজে একটু বাড়তি মূল্যায়ন পায়। কাজেই যত বড় হতে থাকলাম ততই আশে পাশে মানুষেরা বুঝাতে লাগলো যে ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার না হলে জীবন বৃথা। অথচ ডাক্তার হওয়ার জন্য যে বায়োলজি সাবজেক্টটা ভালো করে পড়া প্রয়োজন ছিল সেটার প্রতি আমার বিন্দু মাত্র আগ্রহ ছিল না। আমার ভালো লাগতো ম্যাথ করতে।

কিন্তু এগুলোর চাইতেও বড় সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছিল জীবনের একটা পর্যায়ে আমি চরম হতাশ হয়ে পড়ে ছিলাম। ‘পড়াশোনা করে কোন লাভ নেই’ টাইপ দার্শনিক সুলভ চিন্তা ভাবনাও মাথার ভেতর ঢুকে পড়েছিল। ফলাফল মেট্রিক পরীক্ষাটায় কোন ক্রমে উতরে গেলেও এইচ এস সি পরীক্ষায় দূর্দান্ত খারাপ রেজাল্ট।
এই রেজাল্ট নিয়ে ভালো কোন সরকারী জায়গায় সুযোগ পাওয়া খুবই কঠিন।

তবু কোন ক্রমে জাহাঙ্গীর নগর ইউনিভার্সিটিতে ম্যাথে সুযোগ পেয়ে গেলাম। সেই বছর মেট্রিক ইন্টারের নম্বর যোগ না হয়ে শুধুমাত্র ভর্তি পরীক্ষার নম্বরটাকেই কাউন্ট করায় সুযোগ টা পেয়েছিলাম। কিন্তু পরিবারের একমাত্র ছেলে হওয়ায় কেউ চাচ্ছিল না আমি ঢাকার বাইরে গিয়ে পড়াশোনা করি। তাছাড়া ম্যাথে পড়লে তো আর ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া যাবে না।

অবশেষে একজনের পরামর্শে নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে হলেও পরিবারের ইচ্ছেতে আহসানউল্লাহ ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। ভর্তি হবার পর দেখি আরেক যন্ত্রনা। তখন আহসানউল্লাহ ইউনিভার্সিটির নাম অনেকেই জানতো না। আত্মীয় স্বজন কয়েক জনের সাথে কথাবার্তার একটা নমুনা দিচ্ছি।

– কোথায় পড়ছো?

– আহসানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি।

– কোন ইউনিভার্সিটি?

– আহসানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি।

– প্রাইভেট ভার্সিটি?

– হুম চাচা।

– বুয়েটে সুযোগ পাও নি?

– না চাচা।

– তাইলে তো তোমার জীবনই বৃথা।

‘বুয়েটে চান্স না পেলে জীবন বৃথা’ কথাটা নিশ্চিত ভাবেই ভুল তবে যে ছেলে স্কুল লাইফে সবসময় ফাস্ট সেকেন্ডের মাঝে ছিল, যার সাথের বন্ধুরা আসলেই ঢাকা মেডিকেল কিংবা ঢাকা ইউনভার্সিটির মতো জায়গায় পড়াশোনা করছে তার কাছে এতটুকু আশা করাটাও সেই লোকের হয়তো অন্যায্য ছিল না। সমস্যা হচ্ছে সেই মানুষটার কথা শুনে একটুও মনে হচ্ছিল না যে তিনি আমার প্রতি আন্তরিক।বরং মনে হচ্ছিল আমি সুযোগ না পাওয়াতেই তিনি খুশি। এই কারণেই তিনি আমাকে কিছু উপদেশ দেবার সুযোগ পেয়েছেন।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানি যে সুযোগ না পাওয়ার কষ্টটা বাড়িয়ে দিতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে আমাদেরই আশে পাশের মানুষ। তারা এক একজন এসে এমন ভাবে কথা বলবে যেন মনে হবে আপনার জীবন এখানেই শেষ।

শেষ না হলেও তাদের কথায় আপনিও এক পর্যায়ে বিশ্বাস করা শুরু করবেন যে আপনি আসলেই একটা অপদার্থ।

৩.

ইউনিভার্সিটিতে উঠে প্রথম সেমিষ্টারেও বাউন্ডুলে ছিলাম। তবে আস্তে আস্তে যে কোন কারণেই হোক পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ফিরে আসলো। ধীরে ধীরে পড়াশোনা শেষ করলাম। রেজাল্টও খুব খারাপ না। আট সেমিষ্টারের মাঝে দুই বার ফার্স্ট আর দুই বার সেকেন্ড। চাকুরিতেও ঢুকলাম। ১২ বছর চাকুরি করার পর বুঝতে পারলাম এতদিন যা কিছু শুনেছি তার বেশির ভাগই ভুল।

সময়ের পরিক্রমায় আমাদের এক এক বন্ধু এক এক পজিশনে চলে গিয়েছে। কারো অবস্থা বেশ ভালো, কারো আবার খারাপ। তবে যোগাযোগ আছে এমন মানুষদের মাঝে যে বন্ধু কোটিপতি হয়েছে সে ইউনিভার্সিটি থেকে তার অনার্স কমপ্লিট করতে পারে নি। তার অধীনে বুয়েটে পড়া স্টুডেন্ট এখন ৮০,০০০ টাকা বেতন নিয়ে চাকরি করছে। (বুয়েটে পড়া স্টুডেন্টদের অবজ্ঞা করছি না, আমার বন্ধুটির উত্থানের কথা বলছি)।

এক ক্লাস মেট আমাদের সাথে মেট্রিক পরীক্ষায় ফেল করেছে। বর্তমানে একটা কোম্পানির মার্কেটিং এর জিএম। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বি.সি.এস ক্যাডার হয়েছেন অনেকেই।

আরেক বন্ধুর সাথে যোগাযোগ ছিল না অনেকদিন। স্কুলে থাকার সময় প্রায়ই বিভিন্ন বিষয়ে ফেল করতো। কিছুদিন আগে দেখা হবার পর জানতে পারলাম সে এসিসিএ না কোন এক সাবজেক্টে এখন ব্যচে পড়িয়ে মাসে আয় করে প্রায় ২ লাখ টাকা। অথচ তার পড়াশোনার প্রতি কোন আগ্রহই ছিল না। হুট করে একসময় সেই সাবজেক্টের প্রতি তার আগ্রহ জন্মায়। আগ্রহ থেকেই শেখা।

বিষয়টা আসলে এটাই। একটা দেশের সবার ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হবার প্রয়োজন নেই। আর যত ছাত্র ছাত্রী বের হচ্ছে তাদের সবার পক্ষে সরকারী জায়গায় সুযোগ পাওয়া সম্ভবও না। কাজেই মানুষকে বিকল্প দিক গুলো ভাবতে হবে।

ঘটনাটা একারণেই বললাম কারণ এই মূহুর্তে বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা চলছে। স্বাভাবিক ভাবেই বেশির ভাগ ছাত্র ছাত্রীরাই সুযোগ পাবে না।

আবার অভিজ্ঞতা থেকে এটাও জানি যে ঘুরে দাড়ানোর সুযোগ উপরওয়ালা সবাইকে দেয়। সবাইকে সুযোগটা কাজে লাগানো জানতে হবে। যে সুযোগ কাজে লাগাতে পারে সে সফল হবেই।

ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়া কিংবা অন্য কোন ভালো ইউনিভার্সিটিতে পড়া কখনোই জীবনের মূল লক্ষ্য হতে পারে না। আমাদের ছোট বেলায় ‘এইম ইন লাইফ’ কিংবা ‘জীবনের লক্ষ্য’ রচনা পড়েছি। সেখানে কিন্তু ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার হতে চাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। মূল বিষয়টা বুঝতে হবে। নিজের উন্নতির সাথে সাথে অপর মানুষের জন্য কিছু করতে পারলেই মোটামুটি ভাবে আপনি জীবনে সফল।

ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হওয়া কিংবা অন্য কোন ভালো ইউইনিভার্সিটিতে সুযোগ পাওয়াটা হচ্ছে সেই উদ্দেশ্য পূরণ করতে চাওয়ার প্রাথমিক একটা ধাপ। সেটা না হওয়া গেলেও বিকল্প কোন উপায়ে আপনি উদ্দেশ্যটা পূরণ করতে পারেন।

আপনি তখনই সফল যখন বিকল্প পথটা আপনি খুঁজে পাবেন এবং সেটার সদ্ব্যবহার করতে পারবেন।
আর যদি সেটা না পেরে হতাশ হয়ে যান তাহলে মনে রাখবেন আপনার জীবনে দূর্দশাই অপেক্ষা করছে।
আর সত্যি কথা হচ্ছে এই পৃথিবীটা আসলে হতাশাবাদীদের জন্য নয়।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।