বড় ছেলে: ভাল না ‘মন্দের ভাল’?

খুব হাইপ দেখে বাধ্য হয়ে ‘বড় ছেলে’ নাটকটা দেখলাম। এই ঈদের এটা আমার পুরা দেখা ২য় নাটক। প্রথমটা নুহাশ হুমায়ুনের প্রথম পরিচালনা ‘হোটেল অ্যালবাট্রস’ – যেটা দেখে যারপরনাই সারপ্রাইজড হয়েছি, আশার সঞ্চার ঘটেছে, যে বাংলাদেশে এখনও ভালো লেখা-অভিনয়-গল্প-পরিচালনা – ৪টাই সম্ভব। কিন্তু নাহ ওটা নিয়েও এত স্ট্যাটাস দেখিনি। যাই হোক, ‘বড় ছেলে’ এর কাস্টিং, পরিচালক কোনটাই এমন কিছু করেনি যে হাইপ না হলে দেখতে বসতাম।

অপূর্ব, মেহজাবিন – ২ হাই প্রোফাইল অভিনেতা-অভিনেত্রি, যাদের একজন বহুবছর ধরে নাটকে থেকেও একটা সীমাবদ্ধতার বাইরে কিছু করতে পারেনি, যেটার দোষ তার চেয়ে বেশি নির্মাতাদের। রমিজের আয়নার আনোয়ারের মত দারুণ একটা চরিত্র করেও কালের স্রোতে গা ভাসান অপূর্ব। তবু অনেকের চেয়ে ভালো।

মেহজাবিন আরও পরে আসা এখনও নবীন অভিনেত্রীই আমার কাছে। বাংলা নাটকের দুর্দশার সময়টায় এক ঝাঁক সুন্দরীদের একজন, যে আহামরি কিছু না করলেও সবসময় চেষ্টা করে, তবু টিপিকাল ঢংঢাং থেকে বেরুতে পারেনা। এখানেও এই অভিনেত্রীদের দোষ দেয়া ঠিক হবেনা, দোষ লেখক-পরিচালকদের।

যাই হোক, ‘বড় ছেলে’ মধ্যবিত্ত পরিবারের এমন এক বেকার ছেলের গল্প, যার সময়টা খারাপই ছিল, এবং আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে, কেননা তার বাবা অবসরে যাচ্ছে। আর এরপর উপার্জনক্ষম আর কেউ নেই সে ছাড়া। ছোট ভাই এখনও ছাত্র, বোন আছে তার বিয়েটাও টেকেনি। ভালোর ভালো হিসেবে আমি নিজে ভাবতাম একটাই – তার বান্ধবী আছে একটা বহুদ্দিনের।

যে সবসময় বান্ধবীদের মতই ফোন করে খবর নেয়, টিউশানির সময় জ্বালায়। তবে জ্বলুনিটা আবার ভাই বেরাদারের নাটকের মত টিপিকাল নয় কিন্তু। ভালো… বোঝে অনেক। প্যারা বেশি দেয়না। তবে দেয়াটাই মনে হয় স্বাভাবিক হত এখানে। বড়লোকের কন্যা, তার আবার বলে বিয়ের অনেক প্রেসার। আমার জিজ্ঞাস্য – বড়লোকের মেয়েটা এতদিন ধরে আছে বেকার ছেলেটার সাথে, কেন? তাদের মধ্যে কোন রসায়নও দেখলাম না গতানুগতিক খেয়েছ, গিয়েছ ছাড়া।

অপূর্ব তো পুরা নাটকেই ওয়ান নোট। সবসময় মনে হয়েছে একটু নেতিবাচক চরিত্রে ছেলেটা তার রেঞ্জ দেখাতে পারে, রোম্যান্টিক ড্রামা চরিত্রে তার কিছুই দেখিনি। সুন্দর, সুঠাম, পরিপাটি চুলের ছেলেটাকে মধ্যবিত্ত পরিবারের বেকার ছেলে হিসেবে তো একদমই মেনে নেয়া যায় না, যে আবার বান্ধবীকে প্রতি দেখায় বাদাম ছাড়া কিছু খাওয়াতে পারেনা। রিয়েলি? খুব অরিজিনাল এবং বাস্তবিক? আসলেই? আগে কোথাও দেখিনি এমন ব্যাপার?

নাটকটা পুরাটাই পরিবারের বড় ছেলেকে ঘিরেই আবর্তিত, তার মা, বাবা দুজনই ভালো স্ক্রিন টাইম পেয়েছে। পায়নি বোন, ভাই। সেটা ব্যাপার না। গল্পের কাঠামো এতটাই সোজা পথে চলে যে এই নাটকে যুতসই সংলাপ না থাকলে কোন আধুনিক সিনেমা/মুভি দেখা পাবলিকের এক নাগাড়ে দেখে যাওয়া দুরহই হওয়ার কথা। সেটাও সম্ভব হয়েছে কেননা আমার মতে বাংলাদেশী নাটকে আগ্রহ আগের থেকে একটু বেড়েছে এবং মাঝের প্যানপ্যানানি, খ্যাতনেস থেকে বেরিয়ে নাট্যকাররা সহজসরল গল্পের দিকে ঝুঁকছেন। ভালো কথা, ভালো একটা সাইন এটা। কিন্তু শুধু গল্প বললেই হবে? সংলাপ কই? চিত্রনাট্য কই?

অনেককে বলতে শুনেছি ২ মাস আগের ঈদের সেরা নাটক যদি ‘বিকেল বেলার পাখি’ হয়, তাহলে এই ঈদের সেরা ‘বড় ছেলে’। দুটি নাটকের নির্মাতামন্ডলি ভিন্ন হলেও গল্পে বিশাল সাদৃশ্য বর্তমান। এমন না যে বিকেলবেলার পাখী আমার বাকিদের মতই দুর্দান্ত লেগেছে। আমি আসলে আদনান আল রাজিবের কাছে আরও বেশি প্রত্যাশা করেছিলাম। হতাশ হয়েছিলাম।

তবু সেখানে রাজিবের শক্তিশালী অনেকগুলা ব্যাপার ছিল, যা ‘বড় ছেলে’ তে একেবারেই ছিল না। সংলাপ স্টার প্লাসের সিরিয়াল – মনে হয় যেন গল্প বলে যাওয়ার জন্য সাবলীলভাবে লিখে যাওয়া যেমনটা বিজ্ঞাপনে দেখি, বাস্তব জীবনে কেউ এত সোজাভাবে কথা বলেনা। তবে অসংলগ্ন নয় এটা ঠিক। কিন্তু বোরিং! আরেকটু বসলেই প্রতিটা সংলাপে অনেক স্পাইস ঢোকানো যায়, চিত্রনাট্যে আরও অভিব্যক্তির ডিটেইলস রাখা যায়। নাহ… পেলাম… সেটা একেবারে লাস্ট এক্টে এসে। কার কাছে?

মেহজাবিন – বড় ছেলেটার বড়লোক বান্ধবী। শেষভাগটা সেই সিনস্টিলার। সবাই মেহজাবিনের কান্নার প্রশংসায় অস্কার দিয়ে দেয় অবস্থা। হ্যাঁ, সে কাঁদে ভালো। আগেও দেখেছি অনেক নাটকে বেশ ন্যাচারালি কাঁদতে পারে মেয়েটা। তো হয়ে গেল? কাঁদলেই অভিনয় হয়ে গেল? নাহ। মেহজাবিনের দোষ দিচ্ছিনা তো। পরিচালক আর চিত্রনাট্যকারের দোষ, তারা কিছু না দিলে অভিনেতা অভিনেত্রী কিই বা করতে পারে।

তারা অ্যাট বেস্ট জামাকাপড় পরে আসে। এই তো। চরিত্রের প্রয়োজনে বাংলা নাটকে নিজেকে অদলবদল করে আলাদা করে এমন একজন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর এই মিডিয়ায়। অপূর্ব সেই কয়েক বছর আগে মমর সাথে নিল প্রজাপতি নাটকের প্রেমিক অপূর্বই, কোন মেকওভার নেই। চরিত্রের প্রয়োজনে কিছুই নেই। সময় কই? তাই না? সময় আছে শুধু একজনেরই – আফরান নিশো। হ্যাঁ, সত্যি কথা বাংলা নাটকে এই প্রজন্মের অভিনেতাদের মাঝে নিশো ছাড়া আসলে কোন অভিনেতা নেই। কথা শেষ।

নাটকটা খারাপ না। সাধারণ একটা গল্প, যেটা লেখা ব্যাপার না, কিন্তু কয়জন লেখে? লিখেই শেষ। সংলাপে আন্ডা। কিছু ভালো মুহূর্ত ছিল, যেমন ছেলের চাকরীর জন্য ছাত্রের দারস্থা বাবার সাবপ্লটটা ভালো লেখা হয়েছে। এটা মন ছুঁয়ে যাবেই।

এরপর মার হাতে ভাইয়ের জন্য টাকা গুজে দেয়া আর বলে দেয়া এটা বাবা দিয়েছে। ভালো লেখনী। এগুলা আসলে ভালো আইডিয়া। লেখনী মানে তো আরও অনেক কিছু। থাক।

শেষে মেহজাবিনের সাথে দৃশ্যে এত সময় নিয়েছে নাটক যেন এই একটা দৃশ্যের জন্যই এত গল্প গদবাধা ভাবে লেখা হয়েছে। তবু মেহজাবিন… আপনাকে সাধুবাদ। আপনি চেষ্টা জারী রাখুন। আশা করি একদিন অভিনয়টা দেখাতে পারবেন ভালো কোন নির্মাতার হাতে।

এবার আসি সবচেয়ে বাজে জায়গায় – আবহ সংগীত। এই নাটক হেডফোনে শুনার ভুল করেছিলাম। আল্লাহ্‌… কপিরাইট এড়াতেই কিনা এবার সংগৃহীত কোন আবহ সংগীত ছিলনা, সব অরিজিনাল। তাই বলে এত সস্তা? এত এমেচার? প্রথমে অনেক বিরক্ত করছিল, একসময় টিভিতে দেখার কারণে ওটার লেভেল কমিয়ে দেখেছি বলে সয়ে গেছে। কিন্তু অনেক বাজে ছিল। ওমাগো। এর চেয়ে না রাখেন সংগীত, অনেক ভালো।

সব মিলিয়ে, এই নাটক চোখে পানি আনার অনেক চেষ্টা করেছে পারেনি। বিকেলবেলার পাখী লেভেলেও যেতে পারেনি। কাছাকাছি গিয়েছে গল্প বলার দিক থেকে। কিন্তু স্ক্রিপ্ট লেভেলে ধরা। এখানে নেই ফজলুর রহমান বাবুর অভিনয়, মেহজাবিন সেন্ট্রাল ক্যারেক্টার পেলে হয়ত সম্ভব ছিল সেটা (মজা করে বললাম )। মিজানুর রহমান আরিয়ান – আপনি আরও পরিপক্ক হন, ভালো গল্প পেয়েছিলেন, স্ক্রিপ্ট নিয়ে আরও ডিটেইলে গেলে ঘষামাজা করলে এই নাটক আসলেই হাইপের দাবীদার হত।

কিন্তু না। আপনাদের সময় কোথায়?

রেটিং ১০ এ ৫। ‘মন্দের ভালো’ নাটক। সিনেমাটোগ্রাফি, সম্পাদনা ঠিকঠাক ছিল। সবমিলিয়ে

চলে টাইপ কাজ। নতুন কিছু নেই, উচ্ছ্বসিত হবার মত কিছু নেই। ভালো প্রয়াস চাইলে আয়নাবাজি, অস্থির সময়ে স্বস্তির গল্প সিরিজটা বরং অনেক ডাইভারস এবং ইন্টারেস্টিং।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।