ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জ: মৃত্যুফাঁদ থেকে সাবধান

blue whale challenge – বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তোলা একটি গেইম হল ব্লু হোয়েল। কি এই ব্লু হোয়েল?

ব্লু হোয়েল হল একটি ডার্ক সোশ্যাল গ্রুপ যা অ্যাপের মাধ্যমে অন্ধকার জগতে প্রবেশ করায় বিষণ্নতায় ভোগা কিশোর-কিশোরীদের। এটি একটি মরণঘাতী খেলা। যা শেষ হয় গেইমারের আত্মহত্যার মাধ্যমে।

ব্লু হোয়েল বা নীল তিমি মৃত্যুর আগে ডাঙ্গায় উঠে আসে যেন আত্মহত্যা করছে। তাই এই গেইমটির নাম ব্লু হোয়েল।

এই গেইম খেলে এখন পর্যন্ত মোট ১৩১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এদের সকলেই ১৪-২৭ বছরের তরুণ –তরুণী। বিষণ্নতায় ভোগা টিনেজারদের টার্গেট করেই এই গেইম বানানো হয়েছে। এই গেইমের প্রথম ভিক্টিম দুই বোন ভেরেনিকা ও জুলিয়া কন্সটাটিন ওভা। জুলিয়া মারা যাওয়ার আগে ফেসবুকে নীল তিমির পিক দিয়ে লিখেছিলো, দ্য এন্ড।

গেইমটি তৈরি করেছে রাশিয়ার ২২বছর বয়সী তরুণ ফিলিপ বুদেকিন। ২০১৫ প্রথম রাশিয়ায় এই গেইমের মাধ্যমে মৃত্যুর খবর পাওয়া যায় রাশিয়ায়। এরপর বুদেকিন ধরা পড়লেও তার মধ্যে কোন প্রকার অনুশোচনা বা অপরাধবোধ কাজ করেনি। তার দাবীটা ভুতুড়ে – এই সমাজের অসুস্থ অযোগ্য মানুষদের সমাজ থেকে সরিয়ে দেয়াই নাকি এই গেমের উদ্দেশ্য। যদিও, এই অসৎ উদ্দেশ্য মেনে নেয়নি রাশিয়ান সরকার। এই ‘অসুস্থ’ ও বিকৃত মানসিকতার লোককে এরই মধ্যে জেলে রাখা হয়েছে।

গেইমটিতে ৫০দিন ধরে ৫০ টি ভিন্ন ভিন্ন কাজ করতে দেয়া হয় গেইমারদের। এই গেইমের গেইমারদের বলা হয় হোয়েলস। এই টাস্ক বা চ্যালেঞ্জ গুলো দেয়া হয় ব্লু হোয়েল গ্রুপের মাধ্যমে। যারা এই চ্যালেঞ্জ গুলো দেন তাদের বলা হয় কিউরেটর।

বুদেকিন আটক হলেও তার মত অনেক মানসিক বিকারগ্রস্ত কিউরেটরদের দ্বারা এই গেইম অন্য বিভিন্ন নামে এখনও চলছে। ‘এ সাইলেন্ট হাউজ’, ‘এ সি অব হোয়েলস’, ‘ওয়েক মি আপ অ্যাট ফোর টোয়েন্টি’ ইত্যাদি নামে এই গেইম এখন চলছে।

৫০ লেভেলের এই গেইম ১-১০,১১-২০,২১-৩০,৩১-৪০ এবং ৪১-৫০ এই পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়। প্রতিটি ধাপে ধাপে টাস্কগুলো সহজ থেকে কঠিন হতে থাকে। প্রতিটি টাস্কের ছবি তুলে কিউরেটরদের কাছে পাঠাতে হয় বা সোশ্যাল মিডিয়ায় দিতে হয়। এরপরই গেইমার পরবর্তীধাপে যেতে পারেন।

বিভিন্ন ভিডিও ও প্রতিবেদন থেকে জানা যায় এর আছে ৩০ ধাপ। টাস্কগুলোর মধ্যে রয়েছে-

– হাতে এফ ৫৭ লিখা

– ভোর ৪ টা ২০ মিনিটে ওঠা

– নিজের নখে তিনটি দাগ কাটা ব্লেড দিয়ে

– সাদা পাতায় তিমির ছবি আঁকা

– ব্লু হোয়েল হতে ইচ্ছুক হলে পায়ে ব্লেড দিয়ে ইয়েস লিখতে হবে ইচ্ছুক না হলে হাত কেটে নিজেকে শাস্তি দিতে হবে

– সাংকেতিক ভাষায় কিছু লিখতে হবে

– এফ ৪০ লিখতে হবে হাতে ব্লেড দিয়ে

– সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দিতে হবে আই অ্যাম এ হোয়েল

– নিজের কোন ভীতির মুখোমুখি হয়ে তা দূর করতে হবে

– ৪:২০ এ উঠে ছাদে যেতে হবে

– ব্লেড দিয়ে হাতে তিমি আঁকা

– সারাদিন টানা হরর মুভি দেখা

– কিউরেটরের পাঠানো নির্দিষ্ট গান শোনা

– ঠোঁট কাটা

– হাতে সুই দিয়ে খোচানো

– কোন যন্ত্রণাদায়ক কাজ

– ছাদের কিনারায় দাঁড়ানো

– ট্রেনে উঠা

– কিউরেটোর কে নিজের উপর বিশ্বাস করতে কনভিন্স করা

– অন্য হোয়েলের(ব্লু হোয়েল গেইমার) সাথে কথা বলা

– ছাদের কিনারে পা ঝুলিয়ে বসা

– গোপন কোন কাজ করা

– অন্য হোয়েলের সাথে দেখা করা

– কিউরেটর এর দেয়া একটি শর্ত মেনে নায়া

– কোন রেললাইনে গিয়ে বসে থাকা

– সারাদিন কারও সাথে কথা বলা যাবেনা

– তিমির মত সাউন্ড করা মুখ দিয়ে ইত্যাদি।

৩০ থেকে ৪৯ দিন পর্যন্ত টাস্ক গুলো তে যুক্ত হয় ড্রাগস এবং হিপনোটিজম।

ড্রাগস এবং হিপনোটিজম এর কারণে গেইমার হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন এবং মৃত্যুর দিকে ঝুঁকে পড়েন।

প্রশ্ন জাগতে পারে, হিপনোটাইজ কিভাবে করে? গেইমের গ্রাফিক্স আর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিপনোটাইজড করতে যথেষ্ট। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে বাজে ২ টা গান, ‘রানওয়ে ‘ আর ‘অল আই ওয়ান্ট’, দ্বিতীয় গানটা অনলাইনে পাওয়া গেলেও প্রথম গানের হদিস আজ অব্দি পাওয়া যায়নি কোথাও।

এই অ্যাপটি ভাইরাসের মত। একবার ইন্সটল করলে ফোন থেকে আনইন্সটল হয়না। এবং গেইমটির মাধ্যমে ব্লু হোয়েলের অ্যাডমিন বা কিউরেটরেরা ফোন থেকে গেইমারের ব্যক্তিগত সকল তথ্য , আইপি অ্যাড্রেস, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, পরিবারের সদস্যদের ফোন নাম্বার ইত্যাদি তথ্য নিয়ে নেয়। তাই গেইমার একবার গেইমে ঢুকে পড়লে মৃত্যু ছাড়া এই গেমের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়।

এই খেলার ৩০ ধাপের পরের গুলোতে গেইমার যদি সহ্য করতে না পেরে ছাড়তে চান তবে তাকে তার পরিবারের ক্ষতি করার এবং তার তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করে দেয়ার ভয় দেখানো হয়। গেইমারকে এইসব ব্ল্যাকমেইলের ভয়ে ইচ্ছা না থাকলেও গেমটি খেলে যেতে হয়। ড্রাগস এবং হিপনোটিজমের কারণে জ্ঞানবুদ্ধিহীন গেইমার তখন শুধু এর থেকে মুক্তির পথ খুঁজেন। ৫০ তম ধাপে বলা হয়, এই ধাপ পূরণ করতে পারলেই সে মুক্তি পাবে। টাস্কটি থাকে ১৫ তলা বা তার চেয়ে উঁচু কোন বিল্ডিং এর ছাদের একদম কিনারে গিয়ে সেলফি তুলে ‘আই উইন’ লিখে পোস্ট করা। সেই ছবিটি পোস্ট করার সাথে সাথে স্ক্রিণে ভেসে ওঠে ‘তুমি জিতেছ নিচে তাকিয়ে দেখ তোমার মুক্তি তোমাকে ডাকছে ঝাপ দাও’ এরপরই গেইমার আত্মহত্যা করেন।

কোন প্লে-স্টোর বা অ্যাপস্টোর এ এই গেইম পাওয়া যায় না। ধারণা করা হয় এই গেম পাওয়া যায় ডার্ক ওয়েবে। তবে এতজন সাধারণ কিশোর-কিশোরী কিভাবে এই গেইমের হদিস পায় তা নিয়ে আছে ধোঁয়াশা। কেউ কেউ বলেন সোশ্যাল মিডিয়াতে বিশেষ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে পোস্ট দিলে গেইমটির অ্যাডমিনেরা নিজেরাই ইউজারকে খুজে নেয়।

অলিগলির পাঠকদের আমাদের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হচ্ছে কোনভাবেই এই গেইমের সাথে নিজেরা যুক্ত হবেন না। সোশ্যাল মিডিয়াতে উপরোক্ত টাস্কগুলোর মত কোন পোস্ট দেখলে পোস্টদাতার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করুন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নিন। আসুন সচেতন হই।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।