ব্রাজিলিয়ান ফুটবল: নীল থেকে হলুদের যাত্রা

‘ব্রাজিলিয়ানদের জন্য এই হলুদ জার্সিটা পবিত্র। যখন আমরা এটি গায়ে চাপাই, অবশ্যই গর্ব অনুভব করি। তবে একই সঙ্গে তা দায়িত্ববোধও নিয়ে আসে। এটা সবাইকে অনুপ্রাণিত করে এবং রোমাঞ্চে ভাসিয়ে দেয়।’

এভাবেই ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক কার্লোস আলবার্তো তোরেস হলুদ জার্সির গুরুত্ব বুঝিয়েছিলেন। সেটা ২০১৪ বিশ্বকাপের সময়কার কথা।

ব্রাজিলে তো বটেই গোটা বিশ্ব ফুটবলের জন্য ব্রাজিলের জার্সি এক রকমের প্রতীক বলে মনে করা হয়। হলুদ রংয়ের জামায় সবুজ সীমান্ত, নীল শর্টস ও সাদা মোজা। অন্য কোন জার্সির সাথে ভুল বোঝাবুঝির কোন সুযোগই নেই। ব্রাজিলের সাও পাওলো, রিও ডি জেনিরো তো বটেই বাংলাদেশের ঢাকা, বরিশাল চিটাগাংয়েও দেখা যায় চিরচেনা ব্রাজিল জার্সি। নিতান্ত সাধারণ কেউ হয়ত পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পিছনে হয়তো চক চক করছে ‘১০’ নম্বর!

কিন্তু এই জার্সির পিছনেও যে লুকিয়ে আছে ব্রাজিল ফুটবলের বিখ্যাত এক ট্রাজেডি। তার নাম মারাকানাজো। ১৯৫০ বিশ্বকাপের ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে হারে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল উৎসবের মঞ্চ। হতাশার অশ্রুতে সিক্ত হয়েছিল গোটা জাতি।

২-১ ব্যবধানে সেই জয়ের পর কোন একদিন উরুগুয়ের আলসিদেস ঘিঘিয়া বলেছিলেন, ‘তিনজন মানুষ মারাকানাকে স্তম্ভিত করে দিতে পেরেছিল। ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা, পোপ এবং আমি।’ কথাটির মধ্যে বড়াই থাকলেও মোটেও সেটা ভুল ছিল না। আক্ষরিক অর্থেই সেবার থমকে গিয়েছিল ব্রাজিলের জনজীবন। নিঃশব্দে ডুবে যায় মারাকানার দুই লাখ ব্রাজিলিয়ান সমর্থক। ঠিক যেন পিনপতন নীরবতা। সেই সঙ্গে পুরো দেশেও সেই একই অবস্থা। এক দিকে যেমন ছিল হতাশা, তেমনি ছিল নতুন করে সূচনা করার প্রত্যয়। ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। তাই আবারও শূন্য থেকে যাত্রা শুরু করে ফুটবলপাগল দেশটি। বদলে যায় সব কিছুই, এমনকি জার্সিও! ভুলে যাওয়ার সেই ফাইনাল ম্যাচে ব্রাজিলের জার্সি আজকের মত হলুদ রঙা ছিল না। নীল কালারের সাদা জার্সির সঙ্গে সাদা শর্টস ও সাদা মোজা এই ছিল সেদিন সেলেচাওদের পোশাক। জাতীয় পতাকার কোন নাম-গন্ধ ছিল না সেখানে। মানুষ তাই মনে করেছিল জাতীয় দলের জার্সিতে নেই কোন স্বদেশপ্রেমের ছাপ।

পতাকার সবুজ রঙে যে বিশাল বনভূমির ছাপ, সোনালী হলুদে যে খনিজ সম্পদের চিহ্ন, নীল পৃথিবী ও সাদা তারায় যে রিওর আকাশের প্রকাশ – সবই যে অনুপস্থিত ছিল ব্রাজিলের জার্সিতে। নতুন করে তাই জার্সিকেও ঢেলে সাজানো হয়।

১৯৫৩ সালে ‘কোরেইও দ্য মানহা’ নামের এক সংবাদপত্র তাই একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করল। ব্রাজিলের নতুন জার্সি ডিজাইন আহবান করে আয়োজিত সেই প্রতিযোগিতার শর্ত একটাই- ব্রাজিলের পোশাকে হলুদ-নীল-সবুজ-সাদা এই চারটি রঙই শুধু থাকতে পারবে। বিজয়ী ডিজাইনের জার্সি পরে ব্রাজিলের ১৯৫৪ বিশ্বকাপ খেলার সিন্ধান্তও নেয়া হয়ে গেল।

ব্রাজিল ফুটবলের ইতিহাসের মঞ্চে তখনই প্রবেশ করলেন আলদিয়ের গার্সিয়া শিলি নামের ১৮ বছরের তরুণ। কাজ করতেন তিনি সংবাদপত্রের ইলাস্ট্রেটর হিসেবে। থাকতেন উরুগুয়ের সীমান্তের কাছাকাছি ছোট্ট শহর রিও গ্রান্দে দো সুলের পেতোলাসে। চার রংয়ের আলাদা আলাদা চারটি ডিজাইনও করে ফেললেন তিনি। সেদিনের সেই শিলি স্মৃতি হাতরে বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত আমি বুঝলাম, জার্সিটা আসলে হলুদ হতে হবে। নীল শর্টসের সঙ্গে সেটি দারুণ মানায়। মোজা সাদা হতে পারে। আর জার্সির গলার কাছে কলারটা হতে পারে সবুজ।’

তার নকশার সারল্য ও সমন্বয়ের ঐক্যতান দৃষ্টি কাড়ে বিচারকদের। জমা পড়া ৪০১টি ডিজাইনের ভেতর সেরা হিসেবে নির্বাচিত হয় এটি। দ্বিতীয় হওয়া পোশাকটিও ছিল সারল্যমাখা – সবুজ জার্সি, সাদা শর্টস ও হলুদ মোজা।

নতুন জার্সি পরে ব্রাজিল প্রথম ম্যাচ খেলে ১৯৫৪ সালের মার্চে। মারাকানায় চিলিকে সে ম্যাচে হারায় তারা ১-০ গোলে। ওই বছরের বিশ্বকাপ তারা জিততে পারেনি কিন্তু এর চার বছর পরেরটি জিতে নিয়েছে ঠিকই। কী দুর্ভাগ্য গার্সিয়ার, সুইডেনকে হারানো ফাইনালে কিনা পেলে-ভাভা-গারিঞ্চাদের গায়ে ছিল না হলুদ জার্সি! কেন? কারণ স্বাগতিক দেশ সুইডেনের জার্সির রংও ছিল হলুদ, যে কারণে ব্রাজিল পরে বেছে নেয় নীল জার্সি। ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে কার্লোস আলবার্তো তোরেস বলেন, ‘আমাদের অন্য রঙের জার্সি ছিল না। আর ব্রাজিলিয়ান ফেডারেশনও কোনোভাবে চায়নি আবার সাদা রঙের জার্সি পরে খেলতে। এ কারণেই তারা স্টকহোমের মার্কেটে গিয়ে ২২টি টি-শার্ট কিনে আনল। পরে সেখানে বসানো হল ফেডারেশনের লোগো।’

বিশ্ব প্রথমবারের মতো হলুদ জার্সির সৌরভে মাতোয়ারা হয় ১৯৭০ সালে। বিশ্ব প্রথমবারের মতো হলুদ জার্সির সৌরভে মাতোয়ারা হয় ১৯৭০ সালে। হলুদ জার্সি গায়ে প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল ব্রাজিল জেতে ১৯৬২ সালে। ওই সময়ে গণমাধ্যমের ছবি সাধারণত সাদাকালোই হত। বিশ্ব তাই প্রথমবারের মতো হলুদ জার্সির সৌরভে মাতোয়ারা হয় ১৯৭০ সালে। যেবার প্রথমবারের মতো রঙিন টেলিভিশনে দেখানো শুরু হল বিশ্বকাপ। সেই শুরুতেই বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক দেখল, হলুদ জার্সি পরা ব্রাজিল দল এমন ফুটবল খেলছে, যেমনটা আগে কেউ খেলেনি।

তাদের সৃজনশীলতা যেন রৌদ্দুর হয়ে আছড়ে পড়ল দর্শকদের মনে। আনন্দে বিহবল হয়ে গেল তারা। হলুদ জার্সিকে ভালোবাসা ও সেটি বিখ্যাত হওয়ার শুরু সেখানেই। পেলের এই জার্সি ২০০২ সালে বিক্রি হয় প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার ডলারে। পেলে-রিভেলিনো- টোস্টাও-জার্জিনহোর সর্বকালের সেরা হিসেবে স্বীকৃত দলটিই এর মূল কারণ। যার প্রাণভোমরা হয়ে ছিলেন পেলে। তার অধিনায়ক কার্লোস আলবের্তো যেমনভাবে বলছিলেন, ‘আমার জীবনে দেখা সেরা খেলোয়াড় পেলে। আর সেটি ছিল সর্বকালের সেরা দল। ওই দলের সঙ্গে আমাদের এখনকার দলগুলোর তুলনাই হয় না। ১৯৮২ বিশ্বকাপের জিকো-সক্রেটিস-ফালকাওয়ের সেই দল তবু কিছুটা কাছাকাছি গিয়েছিল। কিন্তু ট্রফি জিততে পারেনি বলে তাদের কেউ মনে রাখেনি।’

কিন্তু ফুটবল সৌন্দর্যে রাঙিয়ে দর্শকদের হূদয় কিন্তু জয় করে নিয়েছিল সেই সময়ের দলটা। জোগো বনিতার ছন্দ ছিল, ছিল না কেবল সাফল্য। ইতালির হয়ে পরবর্তীতে ৯১টি ম্যাচ খেলা এবং ২০০৬ বিশ্বকাপ জেতা কিংবদন্তী আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো কৈশোরের স্মৃতি ঘেটে বললেন, ‘ইতালি হয়তো ১৯৮২ বিশ্বকাপ জিতেছিল। কিন্তু সবার মন জয় করে নিয়েছিল ব্রাজিল। একজন শিশু হিসেবে আমার কাছে ওই হলুদ জার্সি ছিল ভীষণ রোমাঞ্চকর। শ্বাসরুদ্ধকর ফুটবল খেলেছিল তারা। ওই মুহূর্ত থেকে আমি সবসময় ব্রাজিলের সঙ্গে একটা আত্মিক সম্পর্ক অনুভব করি। ওরা আছে আমার হূদয়ের খুব কাছে।’

সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মনের কথাই যেন বলে দিলেন ডেল পিয়েরো। সব কিছুর মূলেই তো ওই জার্সি! অন্তত ব্রাজিলিয়ানরা যে তেমনটাই মনে করেন। বিখ্যাত এই হলুদ জার্সির ডিজাইন করা ১৮ বছরের সেই তরুণ গার্সিয়ার বয়স এখন ৭৯ বছর, এখনো সেই পেতোলাসে স্ত্রী মারলিনকে নিয়ে থাকেন তিনি। জার্সি প্রতিযোগিতা জেতার কিছু দিন পর তিনি রিও শহরে চলে এসেছিলেন ওই সংবাদপত্রে কাজ পেয়ে। এক সময় সিদ্ধান্ত হল ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে থাকবেন গার্সিয়া। কিন্তু দক্ষিণের লাজুক এক তরুণের জন্য অভিজ্ঞতাটা খুব সুখের ছিল না। নিজের মধ্যেই থাকতে ভালবাসতে তিনি। গার্সিয়া তাই সরে গিয়ে ফিরলেন আগের ঠিকানায়।

তার ডিজাইন করা জার্সি কালক্রমে পরিণত হলো বৃহত্ এক ব্যবসায়িক শিল্পে। গার্সিয়ার জীবনধারা যদিও এক বিন্দুও বদলালো না। ১৯৯৬ সালে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (সিবিএফ) সঙ্গে নাইকি ১০ কোটি ডলারের চুক্তি করে। ওই সময়ে যে কোন জাতীয় দলের ক্ষেত্রে সেটি ছিল রেকর্ড। তবে সেই রেকর্ড মোটেই ভাবায় না গার্সিয়া শিলিকে, ‘সত্যিটা হল, আমার কাছে এর অতো বেশি গুরুত্ব কখনোই ছিল না। হয়তো কিছুটা অপরাধীই মনে হয় আমার। কারণ একটা সময় যে বিশুদ্ধ জিনিস আমি সৃষ্টি করেছিলাম, সেটি এখন পরিণত কেবলই অর্থে।’

কেবলই কি অর্থ? না, পাঁচবার বিশ্বকাপ জয় তো আর মুখের কথা নয়। তার সাথে একের পর এক কিংবদন্তীর জন্ম — সবই তো পাওয়া গেল এই জার্সির কল্যাণেই। ক’দিন আগে যেমন ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি দিলমা রৌসেফ বলে দিলেন, ‘হয়তো ফুটবলের জন্ম ইংল্যান্ডে, কিন্তু ওর বাড়ি এই ব্রাজিলেই!’

সত্যিই তাই! ব্রাজিলে এসেই যেন ফুটবল ফিরে পায় তার আসল সৌন্দর্য। আর মঞ্চটার নাম বিশ্বকাপ হলে তো কথাই নেই। ফুটবলের রংটাও তাই এখানে হয়ে ওঠে হলুদ!

– বিবিসি অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।