ব্রহ্মানান্দাম: যার কোনো সংজ্ঞার প্রয়োজন নেই

ব্রহ্মানান্দাম কান্নেগান্টি – একজন জীবন্ত কিংবদন্তি। তার জন্ম হয় ১৯৫৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, অন্ধ্র প্রদেশের সাত্তেমাপাল্লিতে। ভারতের সেরা কমেডিয়ানদের তালিকায় প্রথম সারিতে থাকবেন তিনি। ৩০ বছর বয়সে ১৯৮৬ সালে ‘চান্তাব্বাই’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে তার আবির্ভাব হয়। তারপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

ফিল্ম জগতে আসার আগে তিনি অন্ধ্র প্রদেশের আত্তিলিতে তেলুগু লেকচারার ছিলেন। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে বিভিন্ন মুভিতে কুলি,চাকর,ছোটখাটো রোল করতেন। ১৯৯০ হতেই শুরু হয় তার ব্রাহ্মানান্দাম হওয়ার যাত্রা। ১৯৯০-২০০৫ পর্যন্ত হিরোর বন্ধু, সাপোর্টিং রোল, লিড কমেডিয়ান রোলে তার বিকল্প ছিল না। ২০০৫ এর পর তার সময় কিছুটা খারাপ থাকে।

তবে আবার ২০০৭ এ ‘পক্কিরি’ দিয়ে নিজের ট্র‍্যাকে ফিরে আসেন। তিনি সর্বাধিক স্ক্রিন প্রেজেন্সের জন্য গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডধারী। এ পর্যন্ত তার করা সিনেমার সংখ্যা এক হাজারের ওপরে। মূলত ২০০৭ সালেই তিনি রেকর্ড এর অধিকারী হন (মাত্র ২০ বছরের ক্যারিয়ারে ৮৬৭ টি ফিল্মের জন্য)। এছাড়াও তিনি একটি শো হোস্ট করেন যার নাম ‘দ্য ব্রাহ্মি ১ মিলিয়ন শো’। বর্তমানে তিনি ভারতের অন্যতম সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক নেয়া কমেডিয়ান। তিনি মূলত তেলুগু অভিনেতা। কিন্তু তিনি কিছু তামিল,কন্নড় মুভিও করেছেন।

তার করা কিছু সিনেমা

তার অভিনীত মুভির সংখ্যা ১০০০-উর্ধ্ব হলেও তার করা কিছু ক্যারেক্টার ভোলার মত নয়। এমন অনেক মুভি আছে যার প্রাণ ছিলেন তিনি। তার সাথে আমার পরিচয় হয় ২০০৮ সালের ‘কিং’ মুভির মাধ্যমে। নাগারজুনার সাথে তার কমেডি দেখে মুগ্ধ হই। রবি তেজার সাথে তার জুটি আমার মতে সেরা। এই জুটি মানেই হাসির সুনামি। এই জুটির অনেক মুভির মধ্যে আমার প্রিয় মুভি ‘বালুপু’। বালুপুতে অবশ্য ব্রাহ্মি রবি তেজার হাতে চড়ের উপর চড় খেয়েছে। এই জুটির আরেকটা সেরা মুভি হলো ‘পাওয়ার’। এছাড়াও এ জুটির ‘বিক্রমারকুডু’, ‘কৃষনা’, ‘ভিরা’ও দারুন ছিল।

রবি তেজা ছাড়াও এন্টিয়ারের সাথে তার জুটিও অনেক ভালো। ‘আড্রুস’ এ গুরু শিস্য কিংবা ‘বাদশাহ’-এ তাদের জুটি অসাধারন ছিল। ‘রাবাশা’ মুভি এত ভালো না হলেও ব্রাহ্মির কমেডির জন্য মুভিটা সবারি একবার দেখা উচিত বলে মনে করি।

আল্লু আরজুনের সাথে তার জুটি টলিউডের অন্যতম সেরা জুটি। এ জুটির একসাথে অনেক মুভি আছে। এর মধ্যে ‘জুলায়ি’, ‘ইদ্দারাম্মায়িলাথো’, ‘সন অফ সত্যমুরথি’, ‘সারাইনোডু’, ‘আরিয়া ২’ উল্লেখযোগ্য। এ জুটির একটি মুভির কথা উল্লেখ করি নি। কেনো করি না তা পরে।

রাম চরন – ব্রাহ্মি আমার অন্যতম প্রিয় জুটি। ‘ব্রুস লি’, ‘এভাডু’, ‘অরেঞ্জ’, ‘নায়াক’ মুভিতে এই জুটি ছিল অনবদ্য। বিশেষ করে ব্রুস লি মুভিতে ব্রাহ্মির করা সুযুকি সুব্রামানিয়াম রোলটা আমার অনেক প্রিয়। এই মুভিতে ব্রাহ্মি একজন আন্ডারকভার এজেন্ট হিসেবে ছিল।

মহেশের সাথেও ব্রাহ্মির কিছু মুভি আছে। ‘ডুকুডু’ তে ব্রাহ্মির রোলটা অনেক প্রশংসিত হয়েছিল। এছাড়াও ‘খালেজা’, ‘পক্কিরি’ তেও এই জুটি দারুণ ছিল। তবে আমার কাছে “আগাডু” সেরা লেগেছে এই জুটির কমেডিতে।

এছাড়াও ব্রাহ্মির আরো কিছু উল্লেখযোগ্য মুভি আছে। তার মধ্যে ‘দোচে’, ‘আখিল’, ‘গ্রিকি ভিরুডালে’, ‘আত্তারেন্তিকি দারেদি’, ‘মিরচি’, ‘জলসা’, ‘রেডি’, ‘কিক’, ‘কিক ২’, ‘রেবেল’, ‘মি.পারফেক্ট’। যেকোনো মুভিই হোক না কেন ব্রাহ্মি নিজের সেরাটা দেয়। যেকোনো এক্টরের সাথে সে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। হোক সে মহেশ বাবু অথবা আখিল। তার কমিক সেন্সের কথা নাই বা বললাম।

এছাড়াও সে ‘মাস’, ‘আঞ্জান’, ‘কান্তাস্বামী’, ‘লিংগা’ সহ কিছু তামিল মুভিতে অভিনয় করে। যদিও এসব মুভিতে তার রোল অনেক ছোট ছিল।

অ্যাওয়ার্ড

২০০৯ সালে ব্রাহ্মি ভারতের অন্যতম বড় অ্যাওয়ার্ড ‘পদ্ম ভূষন’ পান। এছাড়াও তার আছে পাঁচটা নন্দি এওয়ার্ড, একটা ফিল্মফেয়ার সাউথ, ছয়টা সিনেমা অ্যাওয়ার্ড, তিনটা সাইমা এওয়ার্ড। তার অভিনীত সেরা চরিত্র বলা হয় ডুকুডুতে তার করা করা চরিত্র আর আরেকটা হল… (একটু পর বলছি)। এছাড়াও গিনেস রেকর্ড তো আছেই।

তার করা সবচেয়ে প্রশংসিত এবং সেরা চরিত্র ধরা হয় ‘কিল বিল পান্ডে’। ‘রেস গুররাম’-এ তার করা এই চরিত্র ভোলবার মত নয়। এ চরিত্রে ব্রাহ্মি নিজেকে পচায় নি। বকরিও হয় নি কিংবা থাপ্পড় ও খায় নি। তবুও আমরা হেসেছি। কিল বিল পান্ডে কোনো কমেডিয়ান নয়।

কিল বিল পান্ডে একজন হিরো। একজন ফ্রাস্টেটেড পুলিশ,একজন ভয়ভীতিহীন মানুষ। সমাযে যে অন্যায় হতে দেয় না এমন একজন পুলিশ। রেস গুররামের শেষদিকে এসে পুরো মুভিকেই তিনি নিজ আয়ত্তে করে নেন। একাই শেষ করে দেন শত্রুর রাজত্ব। তার এই চরিত্র পছন্দ নয় এমন লোক খুজে পাওয়া যাবে না। তার করা ৯৮৭ নং মুভি ছিল ‘রেস গুররাম’।

ব্রাহ্মিকে আমি যেভাবে রেট করি

ব্যক্তিগতভাবে আমি ব্রাহ্মিকে অনেক শ্রদ্ধা করি। নিজ গুনে কিভাবে লোক হাসাতে হয় তা ব্রাহ্মি ভালো করেই জানে। তেলুগু মুভির অফিসিয়াল ‘বকরি’ হলো ব্রাহ্মি। যখনি কোনো মুভিতে বলা হয় ‘ইস কাম কে লিয়ে মুঝে এক বকরি চাহিয়ে’ তখনই বুঝে যাই ব্রাহ্মি আসবে। তবে এরকম মনে করার কোনো কারন নেই সে ভাঁড়ামি করে মানুষকে হাসায়।

কিল বিল পান্ডেকে দেখলেই বোঝা যায় সে যেকোনোভাবে মানুষকে হাসাতে পারে। তার চালচলন, কথা বলার স্টাইল সবই ইউনিক। অভিনয়ের গুনে জিতেছেন অনেক অ্যাওয়ার্ড। অসংখ্য মানুষের মন জয় করেছেন। অধিকাংশ লোকেরই প্রিয় কমেডিয়ান ব্রাহ্মি।

একজন অভিনেতা হিসেবে তিনি জতটা ভালো একজন মানুষ হিসেবেও তিনি ততটা ভালো। তার প্রশংসা সবার মুখেই। তার ব্যক্তিত্যের প্রশংসা করে সবাই। তার সাথে কাজ করা প্রাত সকলেই তাকে একজন ভালো অভিনেতার পাশাপাশি একজন ভালো মানুষ হিসেবেও সম্মান করে।

তিনি অনেক ভালো রান্নাও করতে পারেন। এন্টিয়ার,রাম চরন মাঝে মাঝেই তার রান্না খেতে তার বাসায় যায়। এছাড়াও পরিবারের প্রতিও তিনি একজন যত্নশীল মানুষ। তার দুটি সন্তান আছে। অনস্ক্রিনে তিনি কখনো আমাকে কাঁদাননি। কিন্তু দীর্ঘদিনের সহকর্মী নারায়ানার মৃত্যুতে তার কান্না দেখে আমারো চোখে পানি চলে আসে।

তাকে নিয়ে লেখা শুরু করলে শেষ হবে না। তার করা হাজারো চরিত্রের মাঝে কিছু চরিত্রের কথা লেখা কস্টসাধ্য। ব্রাহ্মানান্দাম একজনই এবং তার কোনো তুলনা নেই।

আমার প্রিয় ব্রাহ্মির ৫ টি চরিত্র:

কিল বিল পান্ডে – রেস গুররাম

সুযুকি সুব্রামানিয়াম – ব্রুস লি

ক্রেযি মোহন – বালুপু

জয়সুরিয়া – কিং

আনিমুতিয়াম – পাওয়ার

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।