ব্যাংকারের টুকরো গল্প

শাখাওয়াত হোসেনকে খুব অস্থির লাগছে। তার গায়ে সবুজ রঙের ফতুয়া, হাতে বড়োসড়ো একটা কালো সুটকেস। সুটকেসটা পায়ের কাছে রেখে তিনি চেয়ারে বসে আছেন। টেবিলের নিচে রাখা পা দুটো দ্রুতবেগে নাড়তে নাড়তে, কপালটা একটু কুচকে, মাথাটা একটু সামনে এগিয়ে তিনি নিচু গলায় জাহিদকে বললেন, আমার টাকাটা আমার যখন প্রয়োজন হবে তখনই তুলতে পারবো তো ?

জাহিদ সাহেব শান্ত গলায় তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, জি জি অবশ্যই। যখনই চাইবেন তখনই তুলতে পারবেন।

তিনি কথাগুলো মনযোগ দিয়ে শুনলেন। কী বুঝলেন জাহিদ জানে না। জাহিদ খেয়াল করেছে লোকটা এই নিয়ে আটবার ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে একই প্রশ্ন করেছেন। প্রতিবারই জাহিদ তাকে বুঝিয়ে সুজিয়ে আশ্বস্ত করেছেন। তিনি পকেট থেকে রুমাল বের করে নিজের মুখ মুছলেন। কালো সুুটকেস খুলে পানির বোতল বের করে পানি খেলেন।

শাখাওয়াত হোসেন সকালবেলা ব্যাংকের এই শাখায় এসে নিজের নামে নগদ বারো লাখ টাকার দীর্ঘমেয়াদি এফডিআর করেছে। জাহিদ এই এফডিআর-এর সব কাজ শেষ করে শাহাদাত হোসেনকে রিসিপ্টটা বুঝিয়ে দিতে দিতে দুপুর গড়িয়ে গেলো। রিসিপ্টটা সুটকেসে রাখতে রাখতে শাখাওয়াত সাহেব মাঝে মাঝে আসার প্রতিশ্রুতি জানিয়ে হাসিমুখে জাহিদের সাথে করমর্দন করে বিদায় নিলেন। কিছুক্ষণ পরই জাহিদসাহেব লাঞ্চ করতে গেলেন বাইরের একটা রেস্টুরেন্টে।

খাওয়া দাওয়া শেষ করে এসে জাহিদ যখন একটি বিবরণী তৈরিতে বসলেন তখন ম্যানেজার তাকে ডেকে জানালেন যে এই বিবরণীটা তার আজই ইমেইলে পাঠাতে হবে। ডেস্কে ফিরে বিবরনীটির প্রয়োজনীয় সব উপাত্ত নিবিষ্টভাবে সফ্টওয়ারে ইনপুট দিচ্ছিলেন, তখনই হন্তদন্ত করে হেঁটে এলেন শাখাওয়াত সাহেব।

জাহিদ ভাবলো তিনি নিশ্চয় কিছু ফেলে গেছেন, তাই সেটা নিতেই ফিরে এসেছেন। তিনি জানতে চাইলেন,

ভাই, কিছু ফেলে গেছেন?

তখনই জাহিদের দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে অত্যন্ত আন্তরিক গলায় সাখাওয়াত সাহেব বললেন, সব ঠিকঠাক মতো হলো তো? মানে, কোনো সমস্যা নেই তো? আমার জমি বিক্রির টাকা, ভাই।

তরুণ ব্যাংকার জাহিদ সাহেব তাকে সবকিছু আবারও বুঝিয়ে বললেন। তার টাকাটা যে নিরাপদেই আছে, কোনো সমস্যা যে নেই, এ ব্যাপারে তিনি যে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন ইত্যাদি। অবশেষে সব বুঝতে পেরে আশ^স্ত হয়ে শাখাওয়াত সাহেব চলে গেলেন। ততক্ষণে বিকাল চারটা বেজে গেছে। তখনও জাহিদের অনেক কাজ বাকি। দিনের কাজ না গুছিয়ে তো অফিস থেকে বেরুতে পারবে না। সব গুছিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেলো।

আজ বৃষ্টি বৃষ্টি দিন। সকালবেলায় আয়েশি হাওয়া বইছে। হিম হিম। ঘুম ঘুম। তবুও বিছানা থেকে উঠতে হলো জাহিদকে। তা তো হবেই। ব্যাংকারদের ঠিক সময়ে অফিসে পৌঁছাতেই হয়। একটু এদিক সেদিক হলে চলে না। আজ অফিসে যাওয়ার কথা ভাবতেই জাহিদের মনটা একটু খারাপই লাগছে। হাত মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে এসে দেখলো আজ খিচুড়ি রান্না হয়েছে। তখনই তার মনে হলো, সংসার জীবনটা সত্যিই অসাধারণ। কিন্তু মুখে কিছু বললো না।

ওদের নতুন সংসার। মাত্র দুই মাস হলো ওদের বিয়ের। তার স্ত্রী সীমা জানে এমন আবহাওয়ায় খিচুড়ি খেতে জাহিদের ভালো লাগবে। এও জানে জাহিদ মুখে কখনও তাকে কিছু রান্না করতে বলবে না। কী যে একজন মানুষ! সেদিন সে কত শখ করে হাতে মেহেদি পরলো। দুদিন চলে গেলো। জাহিদ খেয়ালই করল না। সীমা ভাবলো, থাক। না দেখুক। আমিই দেখাই। সে তার হাত দুটি সামনে মেলে জাহিদকে বললো, দেখো তো কেমন লাগে?

জাহিদ তাকালো ওর চোখের দিকে। সীমার তখন ইচ্ছা হলো পালিয়ে যায়। জাহিদের চোখ আর ভ্রু অপূর্ব শানিত সুন্দর। তাকালে সীমার অসহ্য লাগে।

অফিসে এসেই জাহিদ দেখলো শাখাওয়াত সাহেব ইতিমধ্যে এসে জাহিদ সাহেবের টেবিলের সামনের চেয়ারটায় বসে আছেন। সংশয়বাদী এই লোকটার জন্য তার খুব মায়া লাগছে। আহারে। টাকার চিন্তায় বেচারা এই বৃষ্টির রাতেও ঘুমাতে পারেনি নাকি!  মাথায় বৃষ্টি নিয়ে সাতসকালে চলে এসেছেন।

শাখাওয়াত সাহেবের হাতে চায়ের কাপ। চায়ের ভাবালু ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়েছে এই ছোট্ট অফিসঘরটায়। জাহিদ সাহেব তাঁকে বোঝাচ্ছেন। তিনি চায়ে চুমুক দিচ্ছেন না, মনোযোগ দিয়ে জাহিদ সাহেবের কথা শুনছেন।

এমন সময় বুড়ো চাচামিয়া এসে হাজির। তার হাতে গুটানো ছাতা থেকে মেঝেতে পানি ঝরে ঝরে পড়ছে। আসতে আসতে ভিজে গেছেন তিনি। বুড়ো মানুষ। বয়সের ভারে ন্যুব্জ। একা একাই টাকা তুলতে ব্যাংকে আসেন। নাতি সিংগাপুর থেকে টাকা পাঠায়। তার নামে। অন্য কারো হাতে সেই টাকা দেওয়ার নিয়ম নাই। চাচামিয়ার কাছে একটা গোপন নম্বর পাঠায় তার নাতি। সেই নম্বর দেখালে জাহিদ অনলাইনে কাজ করে টাকাটা চাচামিয়ার হাতে দেয়।

কিন্তু কিছুদিন হলো চাচামিয়া নম্বর নিয়ে আসেন না। ইদানিং তিনি লিখতে পারেন না। তাঁর হাত কাঁপে। তাঁর নাতি গোপন নম্বরটা তাই বিশ্বাস করে জাহিদের কাছেই পাঠায়। নাতি টাকা পাঠালে জাহিদ চাচামিয়াকে ফোন করে জানায়। তখন তিনি টুকটুক করে এসে টাকাটা নিয়ে যান।

আজ হঠাৎ চাচামিয়াকে দেখে জাহিদ জানতে চাইলো, আপনি এই বৃষ্টিতে ভিজে…?

কথা শেষ করতে পারলো না সে। চাচামিয়া বললেন, তুমিই তো ফোন করে আমার ঘুম ভাঙালে। টাকা দাও।

জাহিদ হাতের কলমটা কলমদানিতে রাখতে রাখতে বললো, আপনার নাতি তো আপনার জন্য টাকা পাঠায়নি।

বৃদ্ধ বলতে লাগলো, তাহলে আমাকে ফোন দিলে কেন? আমি ঘরে ঘুমাচ্ছিলাম।

উপায় না দেখে জাহিদ বৃদ্ধর নাতিকে ফোন দিলো। সব শুনে নাতি বললো, ভাই, দাদা বোধ হয় ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখেছে। ইদানিং প্রায়ই এমন হচ্ছে। সেদিন ঘুম থেকে উঠে বললো, শামছু দেশে আসলো আর আমাকে না বইলা আবার বিদেশ চলে গেলো? বেয়াদব। বৃদ্ধের নাতি জাহিদকে অনুরোধ করলো সে যেন তার দাদাকে বুঝিয়ে সুজিয়ে বাড়ি পাঠান।

জাহিদ বৃদ্ধকে বোঝালো যে তার নাতি এবং জাহিদের ভুল হয়েছে। অকারণে তাদের ঠিক হয়নি তাকে ফোন দেওয়া।

শুনে তো বুড়ো চাচা গেলেন ক্ষেপে। এত ভুল করলে বিদেশের মাটিতে বেঁচে থাকবে কীভাবে তার শামছু? এখনও কি সে ছোটো আছে? আর জাহিদই বা কীভাবে চাকরি করবে? কী খেয়ে লেখাপড়া করেছে এই জাহিদ পোলাটা? কাঁপা কাঁপা গলায় এসব বলতে বলতে তিনি চলে গেলেন।

চাচামিয়ার চেঁচামেচিতে শাখাওয়াত সাহেব এতক্ষণ চুপচাপ ছিলেন। এখন আবার সরব হলেন। কাচুমাচু গলায় বললেন, আমি তাহলে আসি। আমার টাকাটা ঠিকমতো রাখা হয়েছে তো?

ঠিক তখনই ফারুক সাহেবের ডাক ভেসে এলো ক্যাশ কাউন্টার থেকে। এই জাহিদভাই এই। একটু আসেন তো।

জাহিদ এগিয়ে গেলো। ফারুক সাহেবকে চিন্তিত দেখাচ্ছে। তিনি নতুন অফিসার। ক্যাশ ডির্পাটমেন্টে কাজ করেন। একজন কাস্টমারের একটা চেক সে একটু আগে ফেরত দিয়েছেন। এতে কাস্টমারটি রেগে গিয়ে বলছে, আমার টাকা আমি নেব। দিবেন না কেন?

জাহিদ দেখলো লোকটির হাতের চেকপাতার নম্বর তার নামে ইস্যু করা চেকবইয়ের নম্বরের সাথে মিলছে না। ঝামেলা মনে হচ্ছে।

জাহিদ লোকটির কাছে জানতে চাইলো, চেকের পাতাটি তো আপনার না। এটা আপনি কোথা থেকে এনেছেন?

লোকটি আত্মবিশ^াসের সাথে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো, আমার চেকবইয়ের সব পাতা শেষ হয়ে ųগছে। তাই একজনের কাছ থেকে একটা চেকপাতা ধার করে নিয়ে এসেছি।

লোকটাকে জাহিদ চেনে। তিনি স্থানীয় একটা হাইস্কুলে পড়ান। পরিপাটি চুল। গায়ে ইস্ত্রি করা ময়লা শার্ট-প্যান্ট। চোখে ভারী কাঁচের চশমা। চশমার ভেতর থেকে দেখা যায় লোকটার চোখ পিট পিট করছে। তিনি খুব দ্রুত কথা বলছেন।

জাহিদ হুস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, দেখুন, একজনের চেক দিয়ে অন্য কেউ টাকা তুলতে পারে না রে ভাই।

শুনে লোকটা যেন আবার বেয়াড়া হয়ে গেলো। বলে উঠলো, কেন? ব্যাংকে তো আমার টাকা জমা আছে।

অগত্যা জাহিদ লোকটাকে বসতে বললো। তার নামে একটি নতুন চেকবই ইস্যু করে দিলো। লোকটি কাজ শেষ করে খুশি মনে চলে গেলো।

ততক্ষণে দুপুর হয়ে গেছে। বাইরে ঠা ঠা রোদ। ভ্যাপসা এক রকম গরমও পড়েছে। দুপুরটা দেখে কে বলবে সকালটা এমন বৃষ্টিভেজা ছিলো! জাহিদ তার চেয়ারে এসে বসলো। মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখলো সীমা এরই মধ্যে চারবার ফোন দিয়েছে। সে টের পায়নি। ইশ!

শাখাওয়াত হোসেনকে আশেপাশে আর দেখা যাচ্ছে না। লোকটা কি তাহলে আশ্বস্ত হয়ে চলে গেছেন? জাহিদ তার চেয়ারে বসে কাজের ফাঁকে মনে মনে লোকটির জন্য অপেক্ষা করে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।