বিশ্ব অর্থনীতি পাল্টে দেওয়া নারীরা

বিশ্বে যা-কিছু মহান্ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।

কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, নারী কি আসলেই তার অবদানের যথোপযুক্ত সম্মান পেয়েছে, নাকি তার কৃতিত্ব ঢাকা পড়ে গেছে পৌরুষত্বের ডামাডোলে?

বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের অনেকগুলো দেশে আজ দাবী উঠেছে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন ও স্বাধীকারের। নারীর স্থান শুধু যে শুধু হেশেঁলেই নয়, তা অনেকেই উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন। তাদের এ উপলব্ধির কারণ, কতিপয় নারীর সংগ্রাম। না, শুধু পুরুষতান্ত্রিক সমাজের উপলব্ধির কারণ নয়, তাদের ভূমিকা ছিলো পিছিয়ে পড়া নারীর অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবেও।

এদের মধ্যে সকলেই যে বতর্মান সময়ের, তা কিন্তু নয়। এ তালিকায় এমন কিছু নারী রয়েছেন, যারা নিজেদের অসামান্য কীর্তির কারণে স্থান পেয়েছেন ইতিহাসের পাতায়। নিজেদের সময়ের তো বটেই, পৃথিবীর ইতিহাসেরই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিবিদ হিসেবে মনে করা হয় তাদের।

এডিথ অ্যাবট (১৮৭৬-১৯৫৭)

১৮৭৬ সালে নেব্রাস্কায় জন্মগ্রহণকারী অ্যাবট, ১৯০৫ সালে শিকাগো ইউনিভার্সিটি থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সেও কর্মরত ছিলেন।

পরবর্তিতে, ১৯২০ সালে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যাল সার্ভিস প্রশাসনের ডীন নির্বাচিত হন।

মার্কিন ইতিহাসে সাড়া ফেলে দেয়া ‘সামাজিক নিরাপত্তা আইন’ প্রণয়নকারীদের মধ্য অ্যাবট অন্যতম।

আন্না শোয়ার্জ (১৯১৫-২০১২)

আন্না শোয়ার্জকে অভিহিত করা হয় বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে আলোচিত অর্থনীতিবিষয়ক বইয়ের কম আলোচিত সহ-লেখক হিসেবে।

১৯৬৩ সালে শোয়ার্জ ও মিল্টন ফ্রাইডম্যান মিলে ‘অ্যা মনেটারি হিস্টোরি অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস’ বইটি রচনা করেন যার জন্য পরে মিল্টন নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

বইটি পশ্চিমা বিশ্বের আর্থিক নীতির উপর গভীরভাবে আলোকপাত করে ও বোদ্ধাদের প্রত্যাশা ছাড়িয়ে যায়।

দেইদ্রে ম্যাকলস্কি (১৯৪২-)

দেইদ্রে ম্যাকলস্কি এযাবতকালের শ্রেষ্ট অর্থনৈতিক ইতিহাসবেত্তাদের মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছেন।

শিল্পায়ন যখন ব্রিটেনে সবেমাত্র জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে, সেসময় দেইদ্রে শিল্পায়নের পক্ষে তার কলম ধরেন। এ লেখাগুলো পরবর্তী সময়ে শিল্পায়নের অগ্রগতির জন্য ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়েছিলো।

দেইদ্রে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রফেসর টমাস পিকাটির দৃষ্টিতে ‘এসময়ের আলোচিত সমালোচক’ ছিলেন।

ডাম্বিসা মোয়ো (১৯৬৯-)

রসায়নে স্নাতকোত্তর এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রিধারী মোয়োর ইতোপূর্বে গোল্ডম্যান স্যাকস ও বারক্ল্যা বোর্ডসে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে।

মোয়ো বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড ও মাইক্রো-ইকোনমির একনিষ্ঠ সমর্থক বলে পরিচিত। উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের ওপর তার লেখা ‘ডেড এইড: হোয়াই এইড ইজ নপ ওয়ার্কিং অ্যান্ড হাও দেয়ার ইজ অ্যা বেটার ওয়ে ফর আফ্রিকা’ বইটি বেস্টসেলারের মর্যাদা পেয়েছে।

২০১৩ সালে তিনি ফ্রেডরিখ হায়েক লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন।

কারমেন রেইনহার্ট (১৯৫৫-)

কারমেন রেইনহার্ট বর্তমানের অন্যতম প্রভাবশালী মাইক্রো-অর্থনীতিবিদ। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শেষে তিনি বিয়ার স্টার্নে প্রধান অর্থনীতিবিদ হিসেবে যোগ দেন। এছাড়াও তিনি হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলেও কর্মরত ছিলেন।

‘দিস টাইম ইজ ডিফ্রেন্ট: এইট সেঞ্চুরিজ অব ফিন্যান্সিয়াল ফোলি’ এবং ‘গ্রোথ ইন অ্য টাইম অব ডেবট’ বইয়ের সহ-লেখক রেইনহার্ট অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে গবেষণার জন্য সুপরিচিত।

হ্যারিয়েট মার্টিন্যু (১৮০২-১৮৭৬)

হ্যারিয়েট মার্টিন্যুকে অভিহিত করা হয় ‘অ্যাডাম স্মিথের কন্যা’ হিসেবে, কেননা তিনি সফলভাবে তাকে অনুসরণ করতে পেরেছিলেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তিনি তরুণ রাষ্ট্রটির আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপপট নিয়ে রচনা করেন ‘সোসাইটি ইন আমেরিকা’ যা বিক্রির দিক দিয়ে সেসময়কার সব রেকর্ডকে ভেঙে ফেলে। এমনকি বইটি চালর্স ডিকেন্সের বইকেও হারিয়ে দিয়েছিলো।

জোয়ান রবিনসন (১৯০৩-১৯৮৩)

কিনসের শিক্ষার্থীদের মধ্যে জোয়ান অন্যতম প্রভাবশালী। তিনিই কিংস কলেজে প্রথম নারী অনারারী ফেলোর সম্মাননা লাভ করেন।

রবিনসন মনোস্পনি ব্যবসা কাঠামোর ধারণা দেন, যাকে রিভার্স মনোপলিও বলা হয়ে থাকে। মনোস্পনি ও মনোপলির গঠন-কাঠামোতে সাদৃশ্য থাকলেও মনোস্পনিতে ‘এক বিক্রেতা-বহু ক্রেতা’র পরিবর্তে ‘বহু বিক্রেতা-এক ক্রেতা’ গঠন অনুসরণ করা হয়।

বর্তমানে ফ্রি-ল্যান্সিং বাজারে এ নীতিটি অনুসৃত হচ্ছে।

জ্যানেট ইয়েলেন (১৯৪৬-)

জ্যানেট ইয়েলেন শুধু একজন গবেষক নন, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের একজন সদস্যাও। যার কারণে মার্কিন অর্থনীতির প্রভাবশালী নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে তিনি অনন্য স্থান দখল করে আছেন।

এর আগে তিনি কিছুদিন অধ্যাপনার সাথে যুক্ত ছিলেন। ২০১০ সাল থেকে তিনি ফেডারেল রিজার্ভে যোগ দেন।

মেরি প্যালি মার্শাল (১৮৫০-১৯৪৪)

ক্যামব্রিজে অধ্যয়নের সুযোগ পাওয়া প্রথম পাঁচ নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেরি প্যালি মার্শাল অন্যতম। এবং তিনিই প্রথম নারী, যিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হতে পেরেছিলেন।

তিনি ও তার স্বামী আলফ্রেড মার্শাল একত্রে ‘দ্য ইকোনমিক্স অব ইন্ড্রাস্টি’ বইটি রচনা করেন।

ক্রিস্টিনা রোমার (১৯৫৮-)

ক্রিস্টিনা রোমার যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দ্বিতীয় নারী, যিনি প্রেসিডেন্ট কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এটা এমন সময় ছিলো, যখন বারাক ওবামার সরকার অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলো। এবং এতে কোনো সন্দেহ নেই, যুক্তরাষ্ট্রকে সে সংকট কাটিয়ে ওঠার পেছনে রোমারের অবদান ছিলো।

ক্রিস্টিনা রোমার পরে তার স্বামী অর্থনীতিবিদ ডেভিড রোমারের সঙ্গে মার্কিন করনীতি নিয়ে গবেষনা শুরু করেন। তিনি ক্ষুদ্র-কুটির শিল্পে সরকারী অর্থায়নের পক্ষপাতী।

রোসা লুক্সেমবার্গ (১৮৭১-১৯১৯)

লুক্সেমবার্গকে অনেকে বিপ্লবী হিসেবে অভিহিত করতে পছন্দ করেন, কেননা স্পার্টার আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে জার্মান সরকার তাকে ১৯১৯ সালে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে।

তবু তিনি মার্কসবাদী অর্থনীতিতে যে প্রচুর অবদান রেখেছিলেন, তা অস্বীকার করতে পারবে না কেউ। সচেতন মহল যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের গন্ধ পেতে শুরু করেছিলেন, তখন লুক্সেমবার্গ রচনা করেন ‘দ্য অ্যাকিউমুলেশন অব ক্যাপিটাল: অ্যা কন্ট্রিবিউশন টু অ্যান ইকোনমিক এক্সপ্ল্যানেশন অব ইম্পেরিয়ালিজম’।

সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কাস পার্টির প্রতিষ্ঠাতা টনি ক্লিফ রোসা লুক্সেমবার্গকে মার্কসবাদী অর্থনীতির প্রাণভোমরা বলে অভিহিত করেছেন। অনেকের কাছে ব্যাপারটি অতিরঞ্জিত মনে হলেও রোসার কর্মকান্ড মার্কসবাদের প্রতি তার অনুরাগের সাক্ষ্য দেয়। তাই রোসার ‘দ্য অ্যাকিউমুলেশন অব ক্যাপিটাল: অ্যা কন্ট্রিবিউশন টু অ্যান ইকোনমিক এক্সপ্ল্যানেশন অব ইম্পেরিয়ালিজম’ বইটিকে ক্যাপিটালের পরেই স্থান দেয়া হয়।

যদি জোয়ান রবিনসন তার বিশ্লেষণের একজন সমালোচক ছিলেন, তবুও তিনি লুক্সেমবার্গের কাজকে ‘প্রচলিত ধ্যান-ধারণার চেয়ে অধিক যৌক্তিক’ বলে উল্লেখ করেছেন।

মিলিসেন্ট ফসেট (১৮৪৭-১৯২৯)

মিলিসেন্ট ফসেট একজন নারী অধিকারকর্মী এবং ব্রিটেনের ফসেট সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা, যা নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠায় কাজ করে চলেছে।

একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে ১৮৭০ সালে ফসেটের লেখা ‘পলিটিক্যাল ইকোনমি ফর বিগেনার্স’ বইটি অর্থনৈতিক অঙ্গনে অাক্ষরিক অর্থেই সূচনা করে এক বিপ্লবের। যা কিনা পরবর্তী দশকগুলোতে বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি-প্রবাহে ব্যাপক ভূনিকা রেখেছিলো।

মিলিচ্যান্ট ফসেট এর ‘ক্রাইডিং হাইপোথিসিস’ প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় নারীর প্রতি লিঙ্গবৈষম্যের এক জলন্ত উদাহরণ। শ্রমবাজারে পুরুষদের তুলনায় নারীদের কম মজুরী প্রদান এবং নারীশ্রমিক নিযুক্তিতে অনীহা প্রকাশের বিষয়টি সর্বপ্রথম তিনিই তার এ তত্ত্বে সূচারুরূপে তুলে ধরেছেন।

বর্তমানের অর্থনীতিবিদরা ফসেটের এই মতবাদের সাথে সম্পূর্ণরুপে একমত পোষণ করেন।

এলিনর অরস্ট্রম (১৯৩৩-২০১২)

নোবেল পুরস্কারের ইতিহাস এলিনরই একমাত্র নারী, যিনি অর্থনীতিতে নোবেল পেয়েছেন।

অবাক হলেও এটা সত্য যে এলিনরকে একসময় অর্থনীতিতে ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য অনুপযুক্ত ঘোষনা করা হয়েছিলো। যার জন্য তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

এলিনর অর্থনীতির ওপর বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব নিয়ে গবেষনা করেছেন এবং সমালোচকরা তার কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। অরস্ট্রম মৃত্যুর আগপর্যন্ত নিউ ইন্সটিটিউশনাল ইকোনমিক্স-এর সাথে যুক্ত ছিলেন।

বিজনেস ইনসাইডার অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।