বিশ্বাসে মিলায় ভাই-বোন || ছোটগল্প

রাতুলের জন্মের প্রায় তিন বছর আগে রাতুলের মা মারা যান। মা মারা গেলেও রাতুলের বাবা আমজাদ হক বেঁচে ছিলেন, এবং যতদূর জানা যায় তিনি চুপচাপ বসে থাকার পাত্র নন। সুতরাং রাতুলের জন্ম হয় তাদের বাসার ছুটা কাজের বুয়া রহিমার মা’র গর্ভে। কিন্তু রাতুল সেটা কখনো জানতে পারেনি। বুঝতে শেখার পর থেকেই সে জেনেছে তার মা ছিলো বিদ্যাময়ী গার্লস কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী প্রফেসর মিসেস ফরিদা বেগম। যিনি রাতুলকে জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান।

কাহিনী এই পর্যন্ত হয়ে থেমে গেলে কোনো ঝামেলা ছিলো না। কিন্তু রাতুলের বাবা আমজাদ হক তো থেমে থাকার পাত্র নন। সুতরাং আরো কয়েকবছর পর জন্ম হয় রাতুলের ভাই মিতুলের। এবারে আর কাজের বুয়া নয়, আমজাদ হকের অফিস সহকারী অর্থ্যাৎ পার্সোনাল এসিসটেন্ট মিস মহুয়ার গর্ভে। মিতুলও বড় হয়ে জানতে পারে সেই চিরাচরিত সত্য। তার মা ফরিদা বেগম। যিনি একজন মহিলা কলেজের প্রফেসর ছিলেন এবং মারা যান মিতুলকে জন্ম দিতে গিয়ে।

এই গল্প এখানে শেষ হয়ে গেলেও একটা কথা ছিলো। কিন্তু তখনো যে রাতুল- মিতুলের বাবার এনার্জি শেষ হওয়ার বাকি ছিলো। অতএব জন্ম হয় রাতুলের বোন তুলির। এবং এটা যে ঠিক কার গর্ভে সেটা কখনো জানা যায়নি। তুলিও বড় হয়ে তার মায়ের সম্পর্কে একই তথ্য জানবে, কিন্তু সেটা আরো পরে। তুলি এখনো ছোটো।

ছোটো ছোটো তিনটা ছেলে মেয়ে মানুষ করা ছিলো আমজাদ হকের পক্ষে খুব কঠিন কাজ। বাসায় চাকর বাকরের কোনো অভাব ছিলোনা, কিন্তু চাকররা তো আর মায়ের জায়গা পূরণ করতে পারেনা। তাই অনেকেই আমজাদ হককে পরামর্শ দেন ছেলে মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে হলেও তার এবার একটা বিয়ে করে ফেলা উচিত। কিন্তু আমজাদ হক কোনোভাবেই রাজি হন না। তিনি বলেন, ‘তার মৃতা স্ত্রী ফরিদা বেগমকে তিনি এখনো অসম্ভব ভালোবাসেন। সেই ভালোবাসার স্থানে অন্য কোনো মেয়েকে বসানো তো দূরের কথা, কল্পনাও করতে পারবেন না। তার জীবনে একমাত্র মহিলা হিসাবে ফরিদা ছিলো, আছে, এবং আজীবন থাকবে।’

তবে ঝামেলার সৃষ্টি হয় আরো কয়েকবছর পর। যখন রাতুল, মিতুল এবং তুলি তিনজনই বুঝতে শিখেছে এবং তাদের গড় বয়স দশ বছর, তখন বিষয়টা অত্যন্ত জটিল আকার ধারণ করে। কারণ তারা তিনজনই জানে তাদের মায়ের নাম ফরিদা বেগম, যিনি বিদ্যাময়ী গার্লস কলেজের অর্থনীতির প্রফেসর ছিলেন এবং মারা যান তাদের তিনজনকেই জন্ম দিতে গিয়ে। এই পৃথিবীতে বিদ্যাময়ী গার্লস কলেজের প্রফেসর ফরিদা বেগমের সংখ্যা ঠিক কত সেটা যখন সিরিয়াস গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তখন আমজাদ হক তার শেষ চাল চালেন। তিনি ফরিদা বেগম নামের বাইশ বছরের এক মেয়েকে বিবাহ করে বাসায় আনেন এবং টাকা পয়সা ও ক্ষমতার জোরে মেয়েটাকে বিদ্যাময়ী গার্লস কলেজের অর্থনীতির শিক্ষিকা হিসাবে নিয়োগ প্রদান করেন।

ছেলে-মেয়েদেরকে বলেন তাদের মা আসলে মারা যাননি। তিনি হারিয়ে গিয়েছিলেন এবং সম্প্রতি ফিরে এসেছেন। এই থিওরি তুলি, রাতল, মিতুল মেনে নিয়ে মায়ের ফিরে আসাতে অত্যন্ত খুশি হয়। তবে একজন বাইশ বছরের মহিলার গর্ভে কিভাবে বিশ, পঁনেরো এবং দশ বছরের তিনটা সন্তান জন্ম নেয় সেটা তাদের কাছে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিশাল কোনো রহস্য বলে মনে হয়।

কিন্তু ঈশ্বরের লীলা বোঝা ভার। রাতুলদের নতুন মায়ের গর্ভে কোনো সন্তান জন্মানোর আগেই মারা যান আমজাদ হোসেন। তবে বাবা মারা গেলেও বেঁচে ছিলেন রাতুলের মা ফরিদা বেগম, এবং তিনি বসে থাকার পাত্রী ছিলেন না। তাই বাবা মারা যাওয়ার প্রায় তিন বছর পর রাতুলের আরো একটা ভাইয়ের জন্ম হয়। রাতুলরা এই ব্যাপারটায় ততোদিনে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে গেছে বিধায় তারা খুব সহজেই জিনিস্টা মেনে নেয়।

রাতুলের নতুন ভাই তুতুল জানবে তার বাবা আমজাদ হক, যিনি তুতুলকে জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। তবে কথা হলো মায়ের মৃত্যু স্বাভাবিক, কিন্তু পৃথিবীর কোথায় কবে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে বাবা মারা গেছেন!

অতএব রাতুলরা খুব চিন্তিত এই কথাটা তার ভাই বড় হলে বিশ্বাস করবে কি না।

পরিশেষে রাতুল ফ্যামিলি সবাই মিলে মিশে আছে এবং বেশ সুখেই আছে। লাভের মধ্যে একটা লাভ হয়েছে তারা সবাই কঠিন আস্তিক। তারা বিশ্বাস করে এই পৃথিবীতে ব্যাখার অতীত অনেক ঘটনা ঘটে। তারা বিশ্বাস করে এই পৃথিবী চাইলে অনেক অসম্ভব জিনিসও বাস্তব হতে পারে।

তারা বিশ্বাস করে, বিশ্বাসে মিলায় ভাই বোন, তর্কে বহুদূর!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।