সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চায় চাইলে স্কুলে পড়াবে কে!

নটর ডেম কলেজে আমাদের বিদায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার। বক্তব্য দেবার সময় তিনি আমাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে কে শিক্ষক হতে চাও? হাত তোলো।’

কেউ হাত তুলছে না। আড়াই হাজার শিক্ষার্থী, কেউ হাত তুলছেনা। সবশেষে দেখা গেলো ১০/১২ জন হাত তুলেছে সর্বসাকুল্যে (হাত তুলেছে এই ভেবে যে স্যার হয়তো মন খারাপ করতে পারেন)।

এর পরে স্যার কি বলেছিলেন আমার মনে নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর আমাকে অনেকেই বলেছেন (ঢাবির অধ্যাপক সহ) যে ভালো রেজাল্ট করো, এখানেই ব্যবস্থা করা যাবে। কিন্তু আমি তো কলেজের বিদায় অনুষ্ঠানে ‘হাত’ তুলিনি। শিক্ষক কেন হবো!

আমার কোনদিনও শিক্ষক হতে ইচ্ছা করে নি, আজও করে না।

এখানে আসার পর দেখেছি শিক্ষক হবার প্রবণতা অনেকের মাঝে প্রবল। আমার আব্বাও বলেছেন ভালো রেজাল্ট করে এখানকার শিক্ষক হওয়া যায় কি না, প্রেমিকাও বলেছে শিক্ষক হও, আব্বার কাছের বন্ধুরাও বলে শিক্ষক হও।

শিক্ষক হতে সবাই বলছে, কিন্তু সেই শিক্ষক কোন শিক্ষক? বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক! শিক্ষকতা যদি মহান পেশা হয়, তবে কেন আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক হতে হবে? স্কুলের শিক্ষক হলে দোষ কি? কেউ স্কুলের শিক্ষক কেন হতে চায় না?

কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গাড়ি থাকে, ফ্ল্যাট থাকে, উচ্চ বেতন থাকে, বিভিন্ন দিকে উপরি কামাই থাকে। স্কুলের শিক্ষকদের ওগুলো থাকে না। কেউ শিক্ষক হতে চায় না, চায় ওই গাড়ি, ফ্ল্যাট, উচ্চ বেতন, বিলাসী জীবন এসবের মালিক হতে।

আর এসব কারণে শিক্ষক নিয়োগে বিভিন্ন অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখা যায়। এখানে সেবার, শিক্ষাদান এগুলোর চেয়ে লোভ কাজ করে অধিক মাত্রায়।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন স্যার, চারুকলায় কে ফার্স্ট, কে সেকেন্ড হয়েছে – এভাবে কাউকে নিয়োগ দেন নি, তিনি তাঁদেরই নিয়োগ দিতেন, যাদের তিনি মনে করেছেন চারুকলা জন্য উপকারী, ছাত্রদের শেখাতে পারবে, এবং শিক্ষকতার জন্য যোগ্য। রেজাল্ট দিয়ে মাপতেন না কখনোই, দেখতেন যোগ্যতা।

আপনার যদি সেবার মানসিকতা থেকে শিক্ষকতা করার পণ থাকে, আপনি যান ঐ অজো পাড়া গাঁয়ের ঐ স্কুলটাতে, ওদের মানুষ করে পাঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, হার্ভার্ডে, এময়াইটিতে, অক্সফোর্ডে। দেখবেন আপনার শিক্ষা পেয়ে আপনার ছাত্ররা বিশ্বের দরবারে মাথা তুলে দাঁড়াবে।

প্রাইমারি থেকে ওদের গড়ে তোলেন, পাইলিং মজবুত করে দেন, দেখবেন একেকটা বাঘের বাচ্চা হয়ে উঠবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ছাত্রকে শিক্ষক মহোদয় যা শেখান তা দিয়ে ৮ হাজার টাকা বেতনের পিয়নের চাকরীও জুটবে না।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল মুহিত সাহেব বলেছেন আজকে, ‘আমাদের পিয়নও আছে, মাস্টার্স পাস করা, ও ১৬ হাজার টাকা বেতনে চাকরী করে ।’

এই মাস্টার্স কে তৈরী করেছেন, অবশ্যই কোন না কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকই! এভাবে দেশ কোনদিনও এগোবে না, লিখিত দিতে পারি।

প্রাইমারি লেভেল থেকেই যদি প্রকৃত সুশিক্ষা না পায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে যদি গবেষণাই না করে, (শুধু বিসিএস বিসিএস বিসিএস) ছাত্রদের মেধার মূল্যায়ন যদি না’ই হয়, তবে দেশ?

যদি কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চায়, তবে সে সর্বোচ্চ মেধার যোগ্যতা দেখিয়ে শিক্ষক হোক। আন্তর্জাতিক শিক্ষা বাজারে এই পড়ার দু-ই আনারও মূল্য নাই, যারা অনলাইনে ঘুরাঘুরি করেন তাঁরা জানেন সবই। শিক্ষাটা মৌলিক হোক, শিক্ষকতাটা হোক ব্রত। লোভে পরে শিক্ষকতা করবেন না কেউ, প্লিজ। ব্যক্তি স্বার্থের জন্য জাতিকে অন্ধকারে ঠেলে দিবেন না। একজন ভালো শিক্ষক মানেই জাতীয় সম্পদ । একজন ভালো শিক্ষকই পারেন দেশ বদলে দিতে।

আমরা শিক্ষক চাই স্মার্ট, ফ্লুয়েন্ট, আন্তর্জাতিক জ্ঞান সম্পন্ন, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং বন্ধুসুলভ। তাহলেই আলো আসবে!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।