বিবাহ বিভ্রাট || ছোটগল্প

এলাকার সবচাইতে সুন্দরী মেয়ে লিপি। খুব স্বাভাবিকভাবেই সব ছেলে তাকে পেতে চায়। কিন্তু দীর্ঘ ২৮ বছরেও লিপি কাউকে পাত্তা দেয় নাই। পাত্তা দেয়না বললে ভুল হবে, একজনকে দেয়। সোহান। এলাকার সবচেয়ে বড়লোকের একমাত্র ছেলে। কিন্তু তারপরও লিপির কাছে পাত্তাটা পায় ফ্রেন্ড হিসেবেই।

লিপিকে নিজের করে পাওয়ার খুব ইচ্ছা সোহানের, কিন্তু রাজি হয়না লিপি। তবে অনেকে মজা করে বলে তারা নাকি একে অন্যের জাস্টফ্রেন্ড। ঘটনা সত্যি কিনা কেউ জানেনা। জিজ্ঞেস করলে লিপি শুধু হাসে৷ সোহান এই হাসিতে ভরসা পায়। নিশ্চিত হয়, লিপি বিয়ে করলে ওকেই করবে৷ লিপির পাত্র হিসাবে ওকে হারিয়ে দেয়ার সাধ্য যে এলাকার কারো নেই।

এদিকে লিপির বয়স তো কম হচ্ছেনা। সত্যি বলতে বাংলাদেশের তুলনায় বিয়ের বয়স ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে। তারপরও আঠাশ বছর বয়সেও লিপির যা চেহারা আর ফিগার। বহু আঠারো বছরের তরুনীর কাছে সেটা স্বপ্ন।

এলাকার আরেকটা ছেলে লিপিকে পাওয়ার স্বপ্ন দেখে। গরীব ঘরের সেই ছেলেটার নাম নুর আলম। বাবার ছোট্ট একটা দোকান আছে। কলেজ থেকে বাসায় ফিরে বিকালে দোকানে বসে নুর। লিপি এইসময় মাঝে মাঝে ফ্লেক্সিলোড দিতে আসে। লিপির চাহনী, হাসি আর হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলার স্টাইল মুগ্ধ হয়ে দেখে নুর আলম। তার মনের মধ্যে বাজে এশেজের গানের লাইন।

‘বুকের মধ্যে লিপি ঘোরে, লিপির মধ্যে বুক।’

কিন্তু নিজের যোগ্যতা জানে সে। সে জানে এই জীবনে কোনো মিরাকেল ছাড়া সে কোনোদিন লিপি নামের মেয়েটাকে নিজের করে পাবেনা।

তারপর একদিন সেই মিরাকেল ঘটে। নির্জন রাস্তায় ছিনতাইকারী ধরে লিপিকে৷ আশেপাশের কেউ সাহস পায়না এগিয়ে যেতে৷ এগিয়ে যায় নুর আলম। ছিনতাইকারীর হাতের চাপাতির সামনে দাঁড়ায় বুক চিতিয়ে৷ লিপির ফোন আর টাকাগুলো রক্ষা পেলেও আহত হয় সে৷ ভর্তি হয় হাসপাতালে। এক কেজি কমলা আর আপেল নিয়ে আলমকে হাসপাতালে দেখতে আসে লিপি৷ লিপির চোখে সেদিন মুগ্ধতা ধরা পড়ে নুর আলমের প্রতি। নুর আলমের সাহসের প্রতি। আস্তে আস্তে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়। রাত জেগে চলে চ্যাটিং আর ফোনে কথা বলা৷ সোহানকে ইগনোর করতে থাকে লিপি। রেগে গিয়ে দলবল নিয়ে নুর আলমের ওপর হামলা করে সোহান। আবারো আহত হয় নুর আলম। লিপির ভালোলাগা আরো বাড়ে তার প্রতি।

এইসময় গল্পে টুইস্ট। লিপির বাবা ঘোষণা দেয় আর না। অনেক হইছে। ২৯-এর আগেই তিনি লিপিকে বিয়ে দিবেন যেকোনো মূল্যে। লিপির যদি কাউকে পছন্দ থাকে তবে বলতে পারে। লিপি লজ্জায় মুখ ফুটে বলতে পারেনা কিছু। কিন্তু নুর আলমকে সবুজ সংকেত দেয়। লিপির ইশারা বুঝতে পেরে বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় নুর আলম। এদিকে প্রস্তাব পাঠায় সোহানও। সোহানের বাবা মায়ের অনেক টাকা। তারা নিজেরা লিপির বাবার কাছে গিয়ে বলেন, ‘আপনার মেয়েটাকে আমরা চাই আমার ছেলের জন্য।’

লিপির বাবা বুঝতে পারেন মেয়ে নুর আলমকে চায়। এদিকে সোহানের বাবা মা কে মানা করাও সম্ভব না তার পক্ষে। আজ উনার ব্যবসা যে পর্যায়ে চলছে তার পেছনে সোহানের মায়ের অনেক সাহায্য আছে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন সোহানকেই বেছে নিবেন৷ আর সোহানের ফ্যামিলির কথার বাইরে যাওয়ার মত মেরুদণ্ড নেই।

বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। ঘর সাজানো থেকে শপিং, কার্ড বিলি থেকে দাওয়াত, সব চলতে থাকে। নুর আলম যাতে লিপির আশেপাশে এসে বিয়েতে বাধা দিতে না পারে সেজন্য সোহানের চ্যালাপেলারা তাকে এলাকাতেই ঢুকতে দেয় না। লিপির ফোন নিয়ে নেয় যাতে যোগাযোগ না করতে পারে৷ এইসময় এগিয়ে আসে লিপির বান্ধবী। সে নুর আলম আর লিপির মধ্যে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। নুর আলম বলে, ‘আমি এই বিয়ে মানিনা।’ তলে তলে আটতে থাকে প্লান। লিপির বাসায় লুকিয়ে ঢুকতে গেলে সোহানের চ্যালাপেলারা নুর আলমকে মেরে হাসপাতালে পাঠায়।

বিয়ের আগেরদিন রাতে নুর আলম হাসপাতালের বেডে শুয়ে দাবার শেষ চাল দেয়। ফেসবুকে লিপির সাথে তার কিছু অন্তরঙ্গ ছবি আপলোড করে দেয়। ব্যাপারটা পুরো এলাকার হট টপিকে পরিনত হয়। সবাই ছি! ছি! করতে থাকে। মান সম্মান বাচাতে সোহানের মা লিপির বাবাকে বলে বিয়ে ক্যান্সেল। আপনি নুর আলমের সাথে লিপির বিয়ের ব্যবস্থা করেন। যত দ্রুত সম্ভব। আমার হবু পুত্রবধূ হিসাবে সবাই আমাদেরও ছি! ছি! করছে। আমি ঝামেলা দূর করতে চাই।

রাত তিনটার দিকে তাড়াহুড়া করে লিপির বাবা নুর আলমের সাথে মেয়েকে বিয়ে দেন।

ওদিকে রেগে যায় সোহান। সে বলে আমি এই বিয়ে মানি না। লিপি আমার। আমি ওকে চাই যেকোনো মূল্যে। লিপির বাবাকে বাসায় আটকে ফেলে। বলে আপনি লিপিকে এনে দিন। নাহলে আমি সব ভেঙে করে ফেলবো।

এমন সময় আবারো হস্তক্ষেপ করে সোহানের মা। উনি সোহানকে ফোন দিয়ে বলেন, যা হওয়ার হইছে। এই বিয়ে মেনে নেয়াই তোমার জন্য মঙ্গল। আমি তোমাকে আরো ভালো, আরো সুন্দরী মেয়ের সাথে বিয়ে দিবো।

মায়ের মুখের ওপর কথা বলার সাহস নেই সোহানের। সোহান চুপ করে থাকে। সোহানের আম্মু আবার বলেন, ‘তুমি সকালে নুর আলমের বাসায় গিয়ে ওকে বিয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে আসবা। এটা আমার অর্ডার।’

সোহান তাই করে। নুর আলমও সব ভুলে স্বাগত জানায়। দু’জন কোলাকুলি করে। সবাই সোহানের প্রশংসা করতে শুরু করে। প্রকৃত প্রেমিক তো এমনই হবে। প্রেমিকা সুখে থাকলেই যার সুখ।

ওদিকে আরো অনেকেই ছিলো যারা লিপিকে বউ হিসাবে চেয়েছিলো। তারা কেউ কান্নাকাটি করে। কেউ ঘোষণা দেয় লিপিকে না পেলে ভাত খাবেনা। তবে তাদের কথা কে শোনে।

আটাশ বছরে সুন্দরী লিপি যে এখন জিরো থেকে হিরো হয়ে যাওয়া নুর আলমের বউ!

তবে নুর আলম জানেনা। সোহান আসলেই লিপির জাস্টফ্রেন্ড ছিলো। জাস্টফ্রেন্ডরা বিয়ের আগেও খায় পরেও খায়। সব অধিকার সবসময় তাদের। বররা তো শুধু শোপিস!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।