বিনোদন সাংবাদিকতা থেকে বিনোদন জগতে

‘নুরুলহুদা’ একজন গ্রাম্য ছেলে, একটু বোকা, বেশি আবেগী আবার সে স্বপ্নবিলাসীও। প্রেমে পোড় খাওয়া এই ছেলেটি জীবন যুদ্ধে বারবার হেরে গিয়ে, পাতার বাঁশিতে ‘কি যাদু করিলা’ গানের সুর উঠিয়ে অন্ধকারে হারিয়ে যায়।

গত দশকে জনপ্রিয় ধারাবাহিক সিরিজ ‘নুরুলহুদা’য় নাম ভূমিকায় অভিনয় করে প্রচুর জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন তিনি,আবার চলচ্চিত্রে ‘সুরুজ’ হয়ে ভালোবাসার মানুষের রুপের বর্ণনা দিতে গিয়ে গেয়ে উঠেন ‘একটা ছিল সোনার কন্যা’। বাংলা নাটকে তিনি দেবদাস হয়েছেন, চৈতা পাগল হয়েছেন, আবার চলচ্চিত্রে বৈধন কিংবা সবুজ।

রোমান্টিক অভিনেতা হিসেবে নিজেকে করেছেন প্রতিষ্টিত। নিজেকে শুধু অভিনয়ে সীমাবদ্ধ রাখেননি, পরিচালনাতেও নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি টেলিভিশন জগতের অত্যন্ত জনপ্রিয় অভিনেতাদের মধ্যে একজন মাহফুজ আহমেদ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনাকালীন বিনোদন পাতায় লিখতেন, সেই সুবাদে ইমদাদুল হক মিলনের পরামর্শে জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘কোন কাননের ফুল’ এ ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় করার মধ্য দিয়ে টিভি নাটকে নাম লিখান।এরপর হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত ধারাবাহিক ‘কোথাও কেউ নেই’-এ বাকের ভাইয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেয়া মতি চরিত্রে অভিনয় করে পরিচিতি পান। নব্বই দশকে অনেক জনপ্রিয় অভিনেতার ভিড়ে তিনি মূলত পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করতেন,তবে শেষের দিকে ‘সবুজ ছায়া’ ধারাবাহিকে অভিনয় করে বেশ আলোচিত হন, ততদিনে তিনি হয়ে উঠেন হুমায়ূন আহমেদের আস্থাভাজন অভিনেতা।

এর পরের দশকে একাগ্রতা ও দারুণ অভিনয়ে সবাইকে ছাপিয়ে নিজেকে নিয়ে যান টিভি নাটকের শীর্ষ অভিনেতার আসনে। বিশেষ করে জনক, দেবদাস, উত্তর পুরুষের পর মোস্তফা সারোয়ার ফারুকীর জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘৫১ বর্তী’ তে অভিনয় করে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেন, পাশাপাশি ছিলো হুমায়ূন আহমেদের হাবলঙ্গের বাজারে, যমুনার জল দেখতে কালো, নীতু তোমাকে ভালোবাসির মত আলোচিত নাটক।

এরপর আসে, সুবর্ণ সময়। বিটিভিতে অরণ্য আনোয়ারের ‘নুরুল হুদা একদা ভালোবেসেছিল’ ধারাবাহিকে অভিনয় করে সর্বমহলে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেন, এই নাটকের সাফল্যের রেশে ‘অত:পর নুরুল হুদা’ ও ‘আমাদের নুরুল হুদা’ দু’টি সিরিজ বের হয়, এই দুটিও বেশ জনপ্রিয় হয়। এই সময়ে তাঁর অন্যান্য জনপ্রিয় নাটকের মধ্যে লোভ, গোলাপ কেন কালো, অলরাউন্ডার, তোমাকে ছুঁয়ে, বালক বালিকা, প্রিয় বান্ধবী, মন্থন, কথা ছিল অন্যরকম, বিয়ের আংটি, বালিঘর, স্বপ্নসিঁড়ি, দূর্ঘট, শোধবোধ, শূন্যস্থান পূর্ণ, কিংকর্তব্য, মন্ত্রী মহোদয়ের আগমনের শুভেচ্ছা, মধ্যরাতের অশ্বারোহী, চলমান ছবি, রাত্রির ফুল, ফুল একা একা ফোটে, ক্রাইম রিপোর্টার, এসএমএস, লেখকের মৃত্যু, আবেগ অন্যতম।

এই দশকের শুরুতে অভিনয় করেন ‘চৈতা পাগল’-এর মত জনপ্রিয় ধারাবাহিকে। এছাড়া রুপা, চাঁদ ফুল অমাবস্যা, একজন মায়াবতী, লাইক এন্ড কমেন্টস, শেষের পরে, চরিত্র, নেতা অন্যতম। অভিনেতা হিসেবে জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন, তবে এখনো অভিনয় করে যাচ্ছেন। তবে সেভাবে আলোচিত হচ্ছেননা, নিজে সার্কাজম ভিত্তিক নাটকে অভিনয় করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেননা বলে এধারার বহু নাটকের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। আবার আলোচিত হয়ে উঠবেন, এই আশা রাখি।

নাটকের এই শীর্ষস্থানীয় এই অভিনেতা চলচ্চিত্রেও সফল। প্রথম ছবির নাম ‘প্রেমের কসম’। শ্রাবন মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, জয়যাত্রা, মেঘের পরে মেঘ, লাল সবুজ, চার সতীনের ঘর, বাঙলা, জিরো ডিগ্রীতে অভিনয় করে দারুণ প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হন।

এছাড়া বেশকিছু বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে ভালোবাসি তোমাকে, আজ গায়ে হলুদ, কেনো ভালোবাসলাম, মরণ নিয়ে খেলা, আমার প্রেম আমার অহংকার, কপাল অন্যতম। বিজ্ঞাপনের মডেল হিসেবেও বেশ সুপরিচিত, এর মধ্যে হেনোলাক্স ও ফিজ আপের বিজ্ঞাপন করে বেশ আলোচিত হন।

অভিনয়, মডেলিংয়ের বাইরে পরিচালক হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। প্রথম পরিচালিত নাটক ‘তাহারা’। এরপর ‘আমাদের নুরুলহুদা’ ধারাবাহিক নাটকটি যৌথ ভাবে পরিচালনা করেছেন। এরপর তোমার দোয়ায় ভালো আছি মা, চৈতা পাগল, মাগো তোমার জন্যর মত জনপ্রিয় ধারাবাহিক নির্মান করেন।

অসংখ্য জনপ্রিয় একক নাটক ও টেলিফিল্ম নির্মান করেছেন। এর মধ্যে শেষের কবিতার পরের কবিতা, খেলা, সূর্যাস্তের আগে, বাহাদুর ডাক্তার, বনলতা সেন, গনি সাহেবের শেষ কিছুদিন, শৈন প্রু, একজন ছায়াবতী, মায়ের কাছে যাবো অন্যতম। টিভি নাটকের জনপ্রিয় প্রধান অভিনেতাদের মধ্যে যারা নাটক নির্মানে এসেছেন তাদের মধ্যে তিনি সবচেয়ে সফল। এখনো বহু নাটক নির্মান করে যাচ্ছেন, নাট্য প্রযোজক হিসেবেও রয়েছে সুখ্যাতি। ‘জিরো ডিগ্রী’ ছবিটি তাঁরই প্রযোজিত ছবি।

বর্ণিল ক্যারিয়ারে দু’বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, পাঁচবার মেরিল প্রথম আলো পুরস্কারসহ বহু পুরস্কার পেয়েছেন। জনপ্রিয় অভিনেত্রী তারিনের সাথে বাঁধা জুটিকে বলা হয় টিভি নাটকের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি, এছাড়া অপি করিমের সাথেও জুটিও বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। নাটকের প্রায় সব কিংবদন্তীদের নিজের নাটকে অভিনয় করিয়েছেন।

মাহফুজের জন্ম ১৯৫৭ সালের ২৩ অক্টেবোর, নোয়াখালীতে। ব্যক্তিজীবনে বিয়ে করেছেন ইশরাত জাহান কাদের কে, সংসারে রয়েছে দুটি সন্তান। ব্যক্তিজীবন ও মিডিয়াভুবনে নিজেকে আরো বর্ণিল করুক এই প্রত্যাশা রাখি। তার অনাগত জীবনের জন্য রইলো শুভকামনা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।