বিদায়, বিচ্ছেদ, বিতর্ক ও নতুনের পদধ্বনি

এ বছর বাংলা চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে বেশ কিছুসংখ্যক নতুন মুখ নাম লিখিয়েছেন। অবশ্য গত কয়েক বছরের তুলনায় এ সংখ্যাটা ছিলো চোখে পড়ার মতো। বছরের শুরুতেই এসেছেন শিবলী নোমান। কম্পিউটার সায়েন্সে গ্রাজুয়েট কমপ্লিট করা সম্ভাবনাময় এই নায়ক নির্মাতা মিজানুর রহমান লাবুর প্রথম পরিচালিত সিনেমা ‘তুখোড়’-এর মাধ্যমে যাত্রা করেছেন। একই সঙ্গে এই সিনেমার মধ্যদিয়ে অভিষিক্ত হয়েছেন কলকাতার অভিনেত্রী রাতাশ্রী দত্তও।

তবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও প্রশংসিত হয়েছেন জনপ্রিয় নির্মাতা তানিম রহমান অংশুর ছোট তাসকিন রহমান। ‘ঢাকা অ্যাটাকে’ তার অভিনয়, স্টাইল ও লুক— এক কথায় দুর্দান্ত ছিলো। সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলোতে বহুল আলোচিত হিরো আলমেরও বড়পর্দায় অভিষেক ঘটেছে ‘মার ছক্কা’ ছবি দিয়ে। দেশের শীর্ষ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়া ‘ধ্যাততেরিকি’ ছবির মাধ্যমে ফারিন খান নামের এক নতুন নায়িকাকে অভিষেক করেছে। তবে ছোটপর্দার পরিচিত মুখ ভাবনা অনিমেষ আইচের ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’ ছবিতে অভিনয় করে ভালো প্রশংসা কুড়িয়েছেন।

ডি এ তায়েব পুলিশের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে তিনি মিডিয়ায় কাজ করে চলেছেন। চলতি বছর ‘সোনা বন্ধু’ ছবির মধ্যমে সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। ছোটপর্দার জনপ্রিয় আরেক অভিনেত্রী রুনা খান ‘ছিটকিনি’ ‘হালদা’ ও ‘গহীন বালুচর’ তিনটি ছবির মাধ্যমে সিলভার স্ক্রিনে নাম লিখিয়েছেন। বছর শেষে মুক্তি পাচ্ছে নির্মাতা বদরুল আনাম সৌদ পরিচালিত প্রথম ছবি ‘গহীন বালুচর’। এ ছবিটির মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হচ্ছে ৩ টি নতুন মুখের। তারা হচ্ছেন – নীলাঞ্জনা নীলা, আবু হুরায়রা তানভির ও জান্নাতুন নূর মুন।

শায়লা সাবি

এছাড়া শায়লা সাবি ‘ক্রাইম রোড’, ক্যামেলিয়া ‘নুরু মিয়া ও তার বিউটি ড্রাইভার’, কংকন ‘সত্যিকারের মানুষ’, শাবনীড় ‘ভালোবাসা ১৬ আনা’, আদনান ‘ভালোবাসা ১৬ আনা’, প্রেমা ‘মিলন সেতু’, সালমান জাফরী ‘এক পলকের দেখা’, প্রীতম ‘গ্রাস’, লাবন্য লী ‘গেইম রিটানর্স’, সাগর ‘শেষ চুম্বন’, এবং শিশুশিল্পী জাহিন নাওয়ার হক ইশা ‘আঁখি ও তার বন্ধুরা’তে অভিষিক্ত হয়েছেন।

পরিচালনায়ও বেশ কয়েকজন নতুনের আগমন ঘটেছে। এদের মধ্য দীপঙ্কর দীপন অন্যতম। নাটকের মানুষজন সিনেমাতে এসে সুবিধা করতে পারে না, এমন ধারণাকে তিনি নিমিষেই পাল্টে দিয়েছেন। ‘ঢাকা অ্যাটাক’ সিনেমার জন্য তিনি একই সঙ্গে আলোচিত ও প্রশংসিত হয়েছেন। ছোটপর্দার হিমেল আশরাফও এ বছর বড়পর্দায় হাজির হয়েছেন ‘সুলতানা বিবিয়ানা’ নিয়ে। বুলবুল বিশ্বাসের প্রথম সিনেমা ‘রাজনীতি’ নিয়েও অল্পবিস্তর আলোচনায় হয়েছে।

দীপঙ্কর দীপন

এছাড়া আকাশ আচার্য্য ‘মায়াবিনী’, শামিম আখতার ‘রীনা ব্রাউন’, তানিয়া আহমেদ ‘ভালোবাসা এমনই হয়’, ফাখরুল আরেফীন ‘ভুবন মাঝি’, বদরুল আমিন ‘সত্যিকারের মানুষ’, মুন্তাহিদুল লিটন ‘শেষ চুম্বন’, বন্ধন বিশ্বাস ‘শূন্য’, শাহাদাত্ হোসেন ‘হঠাৎ দেখা’, সজল আহমেদ ‘তুই আমার’, সারোয়ার হোসেন ‘খাস জমিন’, মাহবুবা সুমী ‘তুমি রবে নীরবে’, ইউল রাইয়ান ‘রাইয়ান’, জাহাঙ্গীর আলম ‘সোনাবন্ধু’, ইফতেখার আহমেদ ফাহমি ‘টু বি কন্টিনিউড’ ছবিগুলোর মাধ্যমে বড়পর্দায় নির্দেশনা দিয়েছেন।

হারানো মানিক

চলতি বছর বাংলাদেশের সিনেমাজগতে নতুনদের যেমন সাবলীল পদচারণ ছিলো, তেমনি অনেক গুণীজনও নিয়তির অমোঘ নিয়ম মেনে চিরতরে বিদায় নিয়েছেন। তাদের মৃত্যুতে চলচ্চিত্রাঙ্গনে যে বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা কখনো পূরণ হবার নয়। চলুন কয়েকজনের নাম জেনে নেই।

প্রথমেই বলতে হয় নায়করাজ রাজ্জাকের মৃত্যুর কথা। দুই বাংলায় সমান জনপ্রিয় এই কিংবদন্তির মৃত্যুতে শোবিজ অঙ্গনে নেমে এসেছিলো শোকের ছায়া। ১৯৪২ সালে কলকাতার টালিগঞ্জে জম্মগ্রহণ করেন তিনি, এবং ‘উজালা’ ছবির মধ্যদিয়ে ঢাকার চলচ্চিত্রে পা রাখেন। এরপর একে একে এই মহানায়ক প্রায় ৩০০টি বাংলা ও উর্দু সিনেমায় অভিনয় করে বাংলা চলচ্চিত্রে একটি নিজস্ব যুগ তৈরী করেছেন। এছাড়া পরিচালনা করেছেন ১৮টি সিনেমা। ২০টির মতো ছবি প্রযোজনাও করেছেন। বাঙালি দর্শক তার ভুবনভোলানো হাসি, নিষ্পাপ চাহনি আর রোমান্টিক ম্যানারিজমসের নেশায় আজও বুঁদ হয়ে আছে। চলতি বছরের ২১ আগস্ট ঢাকার ইউনাইটেড হসপিটালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এরপর ২৩ আগস্ট দুপুরে বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় বাংলা সিনেমার এই নায়করাজকে।

এই বছর আমরা আরেকজন শক্তিমান অভিনেতাকে হারিয়েছি। তিনি মিজু আহমেদ। চলতি বছরের ২৭ মার্চ ‘মানুষ কেন অমানুষ’ সিনেমার শ্যুটিংয়ে অংশ নিতে ঢাকা থেকে ট্রেনে করে দিনাজপুর যাচ্ছিলেন। ট্রেনটি বিমানবন্দর রেলস্টেশনের কাছাকাছি পৌঁছলে তিনি বুকে ব্যথা অনুভব করেন। এবং হসপিটালে নেওয়ার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। জনপ্রিয় এই খলনায়ক ১৯৫৪ সালের ১৭ই নভেম্বর কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার আসল নাম মিজানুর রহমান। শৈশবকাল থেকেই তিনি সিনেমা এবং থিয়েটারের প্রতি খুবই আগ্রহী ছিলেন।

চলচ্চিত্র ও নাটকের আরেক অভিনেতা নাজমুল হুদা বাচ্চু চলতি বছরের ২৮ জুন রাজধানীর স্কয়ার হসপিটালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। জীবদ্দশায় এই প্রবীণ অভিনেতা অসংখ্য চলচ্চিত্র ও নাটকে অভিনয় করেছেন। বিশেষ করে, জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র বিভিন্ন নাট্যাংশে নিয়মিত দেখা যতো তাকে।

শাকিব-অপু উপাখ্যান

বছরজুড়ে বাংলাদেশের শোবিজ জগতে বেশ কয়েকটি বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে। প্রিয় তারকাদের এভাবে ঘর ভাঙতে দেখে দর্শক-ভক্তরা হতবাক হয়েছে নিশ্চিত করেই বলা যায়। তাহসান-মিথিলা, নিলয়-শখ থেকে শুরু করে হাবিব-রেহান, স্পর্শিয়া-রাফসান, বাঁধন-সনেট ও সানজারি-মিলার ঘরেও আগুন লেগেছে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে যাদের বিয়ে-বিচ্ছেদ পুরো ইন্ডাস্ট্রিতে ‘টক অব দ্য টাউন’ হিসেবে আলোচিত ছিলো, তারা হচ্ছেন— জনপ্রিয় চিত্রনায়ক শাকিব খান ও নায়িকা অপু বিশ্বাস। চলুন শাকিব-অপু উপাখ্যান নিয়ে কিছুটা ঘাটাঘাটি করা যাক।

চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাস প্রায় ১০ মাস ধরে অন্তর্ধানে ছিলেন। অনলাইন অফলাইন কোথাও পাওয়া যাচ্ছিলো তাকে। এরপর এ বছরের এপ্রিলে অনেকটা হুট করেই একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের লাইভে আসেন ছয় মাস বয়সী ছেলে-সহ, এবং শাকিবের সঙ্গে আট বছরের বৈবাহিক জীবনের গল্প ফাঁস করার মধ্যদিয়ে রীতিমতো হাঁটে হাড়ি ভেঙ্গে দেন। তিনি জানান— তার সঙ্গে শাকিবের ২০০৮ সালের ১৮ এপ্রিল বিয়ে হয়েছে। তাদের একটি ছেলে সন্তানও আছে। নাম আবরাম খান জয়। গত বছর, মানে ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ছেলের জন্ম হয় দেশের বাইরের একটি হসপিটালে। বিয়ের জন্য তিনি নিজে ধর্মান্তরিত হয়েছেন, এবং ‘অপু ইসলাম খান’ নাম ধারণ করেছেন। বড়পর্দার এই জনপ্রিয় জুটির বিয়ে ও সন্তানের খবর প্রকাশের পরপরই সব মহলে আলোচনা সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়।

তবে সমালোচনা ষোলকলায় পূর্ণতা পায় যখন শাকিব তাৎক্ষণিক বক্তব্যে বলেন, অপু বিশ্বাসকে তিনি বিয়েই করেননি! অথচ, অপুর কোলের বাচ্চাটিকে নিজের বলে দাবী করলেন। যদিও ঢাকাই সিনেমার এই সুপারস্টার বক্তব্যটি পরে ওঠিয়ে নেন, এবং গণমাধ্যমকে জানান— তিনি সন্তান আবরাম খান জয়কে মেনে নিলেও স্ত্রী হিসেবে অপুকে মেনে নেবেন না। তবে পরবর্তীতে নানা নাটকীয়তার মধ্যদিয়ে শাকিব-অপুর মিলমিশ হয়। এই তো গেলো প্রণয়ের কথা। এবার বিচ্ছেদের কথা শোনা যাক।

গত নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বাথরুমে পা পিছলে পড়ে গিয়ে খুব আঘাত পান অপু বিশ্বাস। প্রাথমিকভাবে ঢাকায় চিকিৎসা নিলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি কলকাতায় পাড়ি জমান। পুত্রকে রেখে যান ঢাকার বাসায় তার বোনের কাছে। ওদিকে অপু কলকাতায় থাকলেও এদিকে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে যায়! শাকিব খান থাইল্যান্ড থেকে এসে অপুর বাসায় গিয়েও জয়কে না দেখে ফিরে আসেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, তার ছেলেকে কাজের বুয়ার কাছে রাখা হয়েছে, এবং অপু ছেলেকে ঘরে তালাবন্ধ করে ভারতে গেছেন। পরেরদিন ভারত থেকে ফিরে অপু অবশ্য বিষয়টিকে মিথ্যা বলে নাকচ করে দেন। তিনি খোলাসা করে বলেন— কাজের বুয়া নয়, বাসায় তার বোন শেলি ছিলো, জয়কে তার তত্ত্বাবধানেই রেখে গেছেন।

তবে, এভাবে সন্তান নিয়ে জনসমক্ষে আসায় আগে থেকেই অপুর ওপর ভীষণ রাগান্বিত ছিলেন শাকিব খান। দুজনের মধ্যকার সম্পর্ক দিন দিন অবনতিও হতে থাকে। কিছুদিন পর অবনতি এতোটাই চুড়ান্ত পর্যায়ে চলে যায় যে, শাকিব ও অপু নিজেদের মধ্যে মুখ দেখাদেখি পুরোপুরিভাবে বন্ধ করে দেন। দুজন আলাদা বাসা নিয়ে থাকতে শুরু করেন।

যাই হোক, এমনিতেই লোকজন বলাবলি করছিলো এ বিয়ে টিকবে না। দুজনের মাঝে একের পর এক বিচ্ছেদের গুঞ্জন রটতে থাকে। তার ওপর ছেলেকে একা রেখে অপুর ভারতযাত্রা। ব্যস, বিচ্ছেদনামা পাঠিয়ে দিলেন শাকিব। দিনশেষে গুঞ্জনটাই সত্যি হলো। জানা গেছে, গত ২২ নভেম্বর প্রবীণ আইনজীবী শেখ সিরাজুল ইসলামের মাধ্যমে অপুর বাসায় তালাকনামা পাঠিয়েছেন শাকিব খান। ৯০ দিন পর এই তালাকনামা কার্যকর হবে।

শাকিবকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা

সিনেমার সাফল্য কিংবা অপুর সঙ্গে বিয়ে-বিচ্ছেদ ছাড়াও আরও একটি কারণে শাকিব ব্যাপক আলোচিত ছিলেন। সেটা হচ্ছে— ঢাকাই সিনেমার গত এক যুগের অন্যতম এই প্রধান নায়ককে দুইবার অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয় চলতি বছরেই। সংবাদমাধ্যমে নির্মাতাদের নিয়ে ‘কটূক্তি ও মানহানিকর’ বক্তব্যের অভিযোগে তাকে প্রথমবারের মতো অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়, তবে চিত্রনায়ক আলমগীরের মধ্যস্থতায় শাকিব খান ক্ষমা চাইলে বয়কট তুলে নেয়া হয়।

কিন্তু কিছুদিন পর আবারও নিষিদ্ধ করা হয় তাকে। এবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় ‘মিয়া ভাই’ খ্যাত অভিনেতা ফারুককে নিয়ে কটু মন্তব্য ও নীতিমালাবহির্ভূত যৌথ প্রযোজনা পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগে। অবশ্য পরবর্তীতে এই নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেওয়া হয়।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।