বিজনেসম্যান || ছোটগল্প

আনিকার বাবার তিনটা গার্মেন্টস আছে, ঢাকা শহরে দুইটা বাড়ি। বাবার একমাত্র মেয়ে, সুতরাং উত্তরাধিকার সূত্রে আনিকা অন্তত একশো কোটি টাকার মালিক। তার বয়স পঁচিশ বছর। একটা মেয়ের জন্য বিয়ের পারফেক্ট বয়স বলা চলে। কিন্তু তারপরও আনিকার বিয়ে হচ্ছেনা। এমন না যে আনিকা সুন্দরী না। যদিও বাবার একশো কোটি টাকা থাকলে বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়ের সৌন্দর্য কোনো ম্যাটার করেনা তারপরও সে যথেষ্ট সুন্দরী। যেকোনো ছেলের চোখ ট্যারা হয়ে যাবে টাইপ। বিয়ের প্রস্তাবও আসতেছে প্রচুর পরিমানে।

কিন্তু বড় বড় ব্যবসায়ীর ছেলেদের সেসব প্রস্তাবকে আনিকার কাছে সম্পর্ক স্থাপন কম, বিজনেস ডিল লাগে বেশি। তারা আনিকাকে ঘরের বউ বানানোর অজুহাতে মূলত আনিকার বাবাকে বিজনেস পার্টনার বানাতে চায়। সুতরাং রাজি হয়না ও। এদিকে প্রেম যে হবে, তারও কোনো সম্ভাবনা নেই। যেসব ছেলে নিয়মিত গায়ে পড়ে আনিকার সাথে কথা বলতে, বন্ধুত্ব করতে, প্রেম করতে আসে; তাদের মনের মধ্যে যা ই থাকুক না কেন, আনিকার মনে হয় তারা ওর বাবার টাকার জন্য এসেছে। অথচ আনিকা এমন ছেলেকে চায় যে শুধুমাত্র ওকে ভালোবাসবে, ওর বাবার টাকাপয়সা না।

গল্পের ভূমিকা শেষ, এবার আসল গল্প। শেষমেশ দিয়ার জন্মদিনের পার্টিতে গিয়ে আসিফের সাথে পরিচয় হলো আনিকার। যত্রতত্র ওয়াইন হুইস্কির ভীড়ে ছেলেটা খাচ্ছিলো লেমন জুস। পরনে রঙওঠা জিন্সের প্যান্ট আর কমদামী টিশার্ট। আনিকা একফোঁটা কনজারভেটিভ না, সুতরাং মদ থাকতেও জুস খাওয়া পাবলিককে আনিকার সৎ মনে হয়না। মনে হয় খ্যাত আর ফকিরনির পারফেক্ট কম্বিনেশন। ধারণা আরো পাকাপোক্ত হলো যখন ছেলেটা গায়ে পড়ে ওর সাথে আলাপ করতে আসলো। এইসব ফকিরদের এটাই প্রবলেম, টাকার গন্ধ পেলে তাদের মধ্যে হাঙ্গর সিনড্রোম চালু হয়ে যায়। হাঙ্গর যেমন রক্তের গন্ধ পেলে মুখ হা করে ছুটে আসে, তেমনি এরা আসে টাকার গন্ধে।

– হ্যালো, আমি আসিফ উর রহমান। ইউ ক্যান কল মি আসিফ।

আনিকা মনে মনে বললো, ‘হ, আমার তোরে কিছু বইলা ডাকতে বয়েই গেছে।’

মুখে কিছু না বলে মাথা নাড়লো। চোখে উদাস দৃষ্টি।

– এক্সকিউজ মি, আপনার নামটা জানতে পারি?

– হু, আনিকা।

আনিকার যে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না সেটা এই গাধাটা বুঝলে হয়। কিন্তু যদি বুঝবেই তাহলে তো আর গাধা হইতো না।

আনিকাকে বিরক্তির চরম সীমায় পৌছে দিয়ে আসিফ উৎসাহের সাথে বললো, ‘আসলে এইধরনের পার্টিতে আমি নিজেকে ঠিক মানিয়ে নিতে পারিনা।’

আনিকা আবারো মনে মনে বললো, ‘তুই শালা ফইন্নি। এইসব পার্টি তোর জন্য না। তুই নিজেরে মানিয়ে নিতে পারবি লঙ্গরখানায়, এইসব ক্লাসি পার্টিতে না।’

আনিকাকে চুপ করে থাকতে দেখে আসিফ এবার হয়তো কিছু একটা বুঝতে পেরেছে। সুতরাং আর কথা না বাড়িয়ে আরেকটা জুস নিতে বার কাউন্টারের দিকে চলে গেলো। আনিকা আরেকবার স্বগতোক্তি করলো, ‘খা খা, যত পারিস জুস খেয়ে নে। এইসব তো জীবনে খাসনাই। পার্টিতে এইগুলারে যে কে দাওয়াত করে!’

এই পর্যায়ে গল্পে প্রথম টুইস্ট। দুজনের মধ্যে শুধুমাত্র উপরের এই কনভার্সেশনটুকু হওয়া সত্বেও খুব দ্রুতই আসিফ আর আনিকার প্রেম হয়ে গেলো। তাও,‘’বাবু খাইছো?’ টাইপ প্রেম না, একেবারে ‘তোমাকে না পেলে আমি মরে যাবো’ টাইপ প্রেম।

তো এই কাহিনী অনন্ত জলিলের সিনেমা না হওয়া সত্বেও কিভাবে সম্ভব হলো বলি। আনিকা বিরক্তি নিয়ে চুপচাপ বসে ছিলো। চিন্তা করছিলো দিয়াকে বলে এবারে বাসায় চলে যেতে হবে। এমন সময় স্যুট প্যান্ট পরা একটা স্মার্ট ছেলে আনিকার সামনে এসে কাচুমাচু গলায় বললো, ‘আপু প্লিজ আমার একটা হেল্প করবেন?’

ছেলেটাকে দেখেই আনিকার বেশ আকর্ষণীয় লেগেছে। সে হাসিমুখে বললো, ‘কি হেল্প বলুন।’

ছেলেটা বললো, ‘ইয়ে মানে আমাকে আসিফ স্যারের সাথে একটু পরিচয় করিয়ে দেবেন?’

– এক্সকিউজ মি, কোন স্যার?

ছেলেটা এবারে আসিফের দিকে ইশারা করে বললো, ‘উনার সাথে। একটু আগে দেখলাম আপনারা কথা বলছেন। তাই ভাবলাম উনি আপনার পরিচিত।’

– আরে নাহ ধুর। আমি তাকে চিনিই না।

– কি বলেন এইটা, ছেলেটা ভীষণ অবাক হয়ে বললো, উনাকে চিনেন না? উনি আসিফ উর রহমান। শিল্পপতি আখলাকুর রহমানের ছোট ছেলে।

– মা.. মানে? কোন আখলাকুর রহমান?

– আরেহ, অরিন গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক আখলাকুর রহমান।

আনিকা প্রচন্ড বিস্মিত হয়েছে। সে এতোক্ষণ যে ছেলেটাকে ফকির ভাবছিলো সেই ছেলেটা মোটামুটি অর্ধেক ঢাকা শহরের মালিক। তার বাবা দেশের তিনজন ধনী ব্যক্তির একজন। রিয়েল এস্টেট, ফুড এন্ড বেভারেজ, ফার্মাসিউটিক্যাল; এমন কোনো বিজনেস নাই যাতে সবচাইতে বড় কোম্পানির নাম অরিন গ্রুপ না। হ্যা আনিকার বাবাও বড়লোক কিন্তু আসিফদের ধারে কাছেও না। আখলাকুর রহমান সম্পদের দিক দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প হলে আনিকার বাবা সর্বোচ্চ কোনো একটা ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার। সুতরাং যা হওয়ার তাই হলো। আনিকা এতোক্ষণ আসিফের যেসকল কার্যকলাপে বিরক্ত হচ্ছিলো হঠ্যাৎ করেই সেইসব কাজ রূপান্তরিত হলো মুগ্ধতায়।

এতো ঐশ্বর্যের মধ্যে থেকেও মদ খায়না, কতটা চরিত্রবান হতে পারে ছেলেটা।

এতো টাকা আয় করেও কমদামী টিশার্ট- প্যান্ট পরে, কি পরিমান সাদাসিধা।

এতো বড়লোক হয়েও নিজে থেকে অন্যের সাথে আলাপ করতে আসে, একদম অহংকার নেই।

বিলাসিতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করেও এইসব পার্টিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেনা, আহা! কতো সাধারণ জীবন যাপন করে।

আর সবচাইতে বড় কথা আসিফ আনিকার সাথে কথা বলতে এসেছে আর যাই হোক টাকার জন্য অন্তত না। যার নিজের পকেটে আইফোন এক্স থাকে সে অবশ্যই সিম্ফনি ডি সিক্সটি ডুয়েল সিম উইথ টর্চের প্রতি আকৃষ্ট হবে না।

সুতরাং এর পরে নিজের লেমন জুস শেষ করে আসিফ যখন আবারো আনিকার সাথে আক্ষরিক অর্থেই গায়ে পড়ে কথা বলতে আসলো তখন আনিকার চোখেমুখে মুগ্ধতার হাসি। এবার তাদের কনভার্সেশন পুরোপুরি জমে গেল। দুজনে একঘণ্টা আড্ডা দিয়ে যখন পার্টি থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলো তখন একজনের ফোনের কন্টাক্টে আরেকজনের নাম্বার।

পরের সপ্তায় দামি রেস্টুরেন্টে ডেট। আসিফ যথারীতি লেমন জুসে চুমুক দিতে দিতে বললো, ‘এইসব বড়বড় রেস্টুরেন্টের লাল নীল আলো আমার কাছে বড্ড কৃত্রিম লাগে। এরচাইতে সবুজ পার্কের সাদা বেঞ্চ খুব সাধারণ, খুব আপন।’

এই কাহিনী ‘ইমপ্রেস টেলিফিল্মের’ সিনেমা না হওয়া সত্বেও আনিকা পুরোপুরি ইমপ্রেস হয়ে গেলো।

অতএব পরের সপ্তাহের ডেটিং পার্কের বেঞ্চিতে। আসিফ এবারে বাদামের খোসা ছড়াতে ছড়াতে বললো, ‘আমি ঠিক করেছি বাবার থেকে একটা পয়সাও নেব না। নিজে কিছু একটা করার চেষ্টা করবো। হয় ব্যাংক লোন নিয়ে স্ট্যার্টআপ বিজনেস করবো অথবা দরকার হলে অন্যের কোম্পানিতে চাকরি করবো।’

আনিকা আবারো ইমপ্রেস। সম্পদের কোনো মোহ নেই! এমন ছেলে আছে আজকের দিনেও হয়?

তাই পরের সপ্তার ডেটে আসিফ যখন বললো, ‘তার বাবা এক ব্যবসায়ীর মেয়ের সাথে আসিফের বিয়ে দিতে চাচ্ছেন’ তখন আনিকা একদম ভেঙে পড়লো। সাতপাঁচ না ভেবেই প্রপোজ করে দিলো আসিফকে। কাঁদতে কাঁদতে বললো, ‘আসিফ, আমি একদম ছোটবেলা থেকেই যা চেয়েছি সব পেয়েছি। আমার জীবনের একমাত্র অপূর্ণতা হলে তুমি। তোমাকে না পেলে আমি মরে যাবো। সত্যি মরে যাবো।’

আসিফ বললো, ‘বিশ্বাস করিনা, মরে দেখাও।’

আনিকা কান্না থামিয়ে চুপ করে গেল। অবাক হয়েছে ভীষণ।

আসিফ মুচকি হেসে বললো, ‘গাধা মেয়ে, মজাও বুঝো না? তুমি আমাকে অবশ্যই পাবে। প্রমিজ।’

– সত্যি?

– হুম, লাভ ইউ টু।

আনিকার বাবা শওকত আলী খবর শুনে প্রচন্ড খুশি হলেন। মেয়ে নিজেই এমন ছেলেকে নিয়ে এসেছে যাকে জামাই বানানোর স্বপ্ন দেশের প্রতিটা বিজনেসম্যান বাবার।

কিন্তু বাস্তব জীবন সহজ হলেও গল্প এতো সহজ না। একটা আদর্শ গল্পের শেষে ক্লাইম্যাক্স থাকাটা জরুরী।

আখলাকুর রহমানের পার্সোনাল অফিসকক্ষে শওকত আলী বসা। আখলাকুর রহমান আনিকার বাবার চোখে চোখ রেখে বললেন, ‘দেখুন শওকত সাহেব, আমার জানামতে আপনি বিজনেসটা ভালোই বোঝেন। সুতরাং আমার ছেলে আসিফের সাথে যদি আপনি মেয়ের বিয়ে দিয়ে আমার ব্যবসায় ভাগ বসাতে চান তো আপনার জন্য আমি দুঃখিত। আপনাকে বলে রাখি আমার পছন্দের মেয়ে বাদে অন্য কাউকে বিয়ে করলে আসিফ আমার সমস্ত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে। ওকে আমি ত্যাজ্যপুত্র করবো। এবং আমি একবার যা বলি নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে সেটা পূরণ করতে চেষ্টা করি। এখন আপনি আসতে পারেন।’

শওকত আলী চলে আসলেন। আসার সময় নিজের সম্মান বাঁচাতে বাংলা সিনেমার মতো করে বলে আসলেন, ‘শুনে রাখেন মিস্টার বিজনেসম্যান, এই শওকত আলী সবার আগে একজন বাবা। টাকার লোভ আমার নেই। আমি আমার মেয়ের খুশির জন্য যেকোনো কিছু করতে পারি।

শওকত আলী নিজে আসিফের সাথে আনিকার বিয়ে দিলো তার ঠিক চারদিন পর। অবশ্য উনার মনে কিঞ্চিৎ আশা আছে যে একসময় আখলাকুর রহমান নিজের ভুল বুঝতে পেরে ছেলেকে কাছে টেনে নেবেন।

বিয়ের একমাস পর হানিমুন থেকে ফিরে এসে একমাত্র মেয়ের জামাই হিসাবে আসিফ শওকত আলীর কোম্পানি, ‘আনিকা গ্রুপের’ এমডির আসন গ্রহন করলো। এখন থেকে শ্বশুরের ব্যবসা আসিফই দেখবে।

আরো কয়েকদিন পর।

আসিফ হাতের ব্রিফকেসটা আখলাকুর রহমানের সামনে রেখে বললো, ‘পুরো দুই কোটি টাকা আছে, স্যার।’

আখলাকুর রহমান মুচকি হাসলেন। বললেন, ‘কনগ্রাচুলেশন মিস্টার আসিফ। তুমি তাহলে শেষপর্যন্ত সফল হলে।’

আসিফও হাসি ফেরত দিলো, ‘আপনার সহযোগিতা ছাড়া কখনোই এটা সম্ভব হতো না।’

– আমি তোমাকে কোনো হেল্প করিনি ডিয়ার। আমি জাস্ট বিজনেস করেছি। তোমার উপর ভরসা রেখেছি। তোমার প্লানটা আমার শুধু পছন্দই হয়েছিলো তাই ই না, ইন্টারেস্টিংও লেগেছিলো। তাছাড়া আমি আপাদমস্তক বিজনেসম্যান। মাত্র পাঁচ মিনিটের অভিনয়ের জন্য দুই কোটি টাকার অফার ছাড়বো না কখনোই।

– থ্যাংকইউ স্যার। আজ আসি তাহলে।

– আচ্ছা আসো। ভালো থেকো।

আসিফ বের হয়ে গেল। আখলাকুর রহমান পেছন থেকে দেখলেন। মনে মনে বললেন, ‘বুদ্ধিমান ছেলে।’

ছেলেটা কয়েকমাস আগে তার সাথে দেখা করে একটা বিজনেস প্রপোজাল দেয়। মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য তাকে নিজের ছেলে পরিচয় দিয়ে স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী একটু অভিনয় করতে হবে। বিনিময়ে তিনি পাবেন দু’কোটি টাকা। শুধুমাত্র টাকার জন্য না, প্লানটা ইন্টারেস্টিং লাগার জন্যই রাজি হয়েছিলেন আখলাকুর রহমান। ছেলেটা সেই প্লান সফল করে দেখিয়েছে। নিজের মনেই হাসলেন তিনি। তারপর টেবিল থেকে আরেকটা ফাইল টেনে নিয়ে সেটাতে মগ্ন হয়ে গেলেন। আসিফের গল্প ভুলে গিয়ে মন দিলেন অন্য প্লানে। অরিন টেক্সটাইল থেকে এবছর আরো বেশি লাভ করার একটা নতুন আইডিয়া এসেছে মাথায়।

হ্যা, একজন আদর্শ বিজনেসম্যানকে সবসময় টাকা আয় করে যেতে হয়। যেকোনো মূল্যে। মরার আগ অবধি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।