বাস কন্ডাক্টর থেকে সুপারস্টার ‘থালাইবা’

ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতা কে? দক্ষিণে গিয়ে এই প্রশ্নের জবাবে শাহরুখ-সালমান কিংবা অমিতাভ বচ্চনের নাম শোনার প্রত্যাশ্যা করলে ভুল করবেন। ওখানে সবাই এক যুগে এক যোগে বলবে – থালাইবা! যারা জবাব দেবেন না, তারা এমন ভাবে তাকাবেন যেন, থালাইবা থাকার পরও এমন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে আপনি মহা অপরাধ করে বসেছেন।

কে এই থালাইবা? তিনি হলেন শিবাজি রাও গায়েকড়। তাঁর এক তুড়িতে প্রতাপশালী খলনায়ক ঘায়েল হয়ে যান, যিনি চাইলে পিস্তলের একটি গুলিকে দু’টুকরো করে দু’জনের বুকে বিদ্ধ করতে পারেন, যিনি তুফানের চেয়েও দ্রুত গতিতে আসেন, আবার বাতাসের চেয়েও দ্রুত মিলিয়ে যান। তিনি পর্দায় অসংখ্য ‘অযৌক্তিক’ অ্যাকশন দৃশ্য অংশ নেওয়ার পরও সেসব দেখতে কখনো এক ঘেঁয়ে লাগে না – পর্দায় যার নাম রজনীকান্ত।

এত খ্যাতির চূড়ায় যিনি, সেই রজনীকান্ত একটা সময় কাজ ৭৫০ রুপির বেতনে বাস কনডাক্টরের কাজ করতেন। বন্ধু রাজ বাহাদুর রজনীকে উৎসাহ যোগাতেন। বলতেন, ‘তুমি তোমার স্বপ্ন পূরণ করো।’

কান্নাড়া ড্রামা থেকে রজনী শুরু করেন। সেসময় দেখা হয় পরিচালক কে. বালচান্দরের সাথে। তিনি রজনীকে তামিল ভাষা শেখার পরামর্শ দিয়ে চলে যান। দক্ষিণী সিনেমায় রজনী কাজ শুরু করেন এই বালচান্দরের হাত ধরেই, ১৯৭৫ সালে। নিজের দ্বিতীয় সিনেমা ‘শ্রিবিদ্যা’র জন্য প্রশংসিত হন। সিনেমাটি তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়।

মজার ব্যাপার হল, ক্যারিয়ারের শুরুতে থালাইবা নেতিবাচক চরিত্র করতেন। প্রথম ‘ভাল লোকের’ চরিত্র করেন এসপি মুথুরামানের ‘ভূবানা ওরু কেলভিক্কুরি’ সিনেমায়। সেখান থেকেই রজনীর নতুন ইনিংসের সূচনা।

১৯৭৮ সালে আসে প্রথম বড় বানিজ্যিক সাফল্যা। অমিতাভ বচ্চনের ডন সিনেমার রিমেক ‘বিল্লা’য় পর্দা কাঁপানো পারফরম্যান্সের পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি রজনীকে।

১৯৮৮ সালে একবার হলিউডে কাজ করেছিলেন রজনীকান্ত। ইংরেজি অ্যাকশন সিনেমাটির নাম ছিল ‘ব্লাডস্টোন’। বাংলা ভাষার সিনেমাতেও দেখা গেছে তাকে। সিনেমার নাম ‘ভাগ্য দেবতা’।

২০১০ আইএমডিবির শীর্ষ ৫০ টি সিনেমার তালিকায় তামিল ভাষার মোটে একটা সিনেমা ছিল। সেই  ‘এনথিরান’ সিনেমার মূল কাণ্ডারী ছিলেন রজনী।

ভারতের এই অভিনেতা-সমাজকর্মীর জন্ম ১৯৫০ সালের ১২ ডিসেম্বর – ব্যাঙ্গালুরুতে। সাদামাটা জীবনে বিশ্বাসী রজনী পর্দায় রোবটের মত সিনেমা করলেও এখনো স্মার্টফোনও ব্যবহার করেন না। বাস্তবে, হয়তো প্রথম দেখায় লোকটিকে আপনি প্রথমে চিনতেও ভুল করবেন, এতটাই মাটির মানুষ তিনি।

এই বয়সেও তিনি পুরদোস্তর নায়ক, না জোর করে না, চাহিদা আছে বলেই। ১৯৮৪ সালে রজনীর সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবে হাজির হয়েছিলেন তামিল নায়িকা মিনা। ১৯৯৫ সালে সেই মিনাই ছিলেন রজনীর নায়িকা। ভারতে এমন নজীর আর খুব সম্ভবত নেই!

২০০৮ সালে তার ভক্তরা মিলে ‘দেসিয়া দ্রাভাদার মাক্কাল মুন্নেত্রা কাজাঘাম’ নামের একটা রাজনৈতিক দল খুলেছিল। রজনীর ওপর রাজনীতিতে আসার চাপ ছিল। সেই চাপে মাথা নত করেননি। প্রস্তাব নাকোচ করে দেন। বলেন, ‘আমাকে জোর করে কেউ কিছু করাতে পারবে না!’

ঠিক পর্দায় যেমনটা বলে আসেন। এত স্টারডম যার, এত খ্যাতি যার সেই রজনী আজো সিনেমা মুক্তির সময় নার্ভাস হয়ে পড়েন। বাড়িতে থাকেন না ওই সময়টাতে। চলে যান হিমালয়ের পাদদেশে কিংবা ব্যাঙ্গালুরুতে বন্ধুর বাড়িতে। যদিও, সাম্প্রতিক সময়ে তার অধিকাংশ সিনেমায় বক্স অফিসে চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করেছে। এমন সাফল্য রজনীর হাঁটুর বয়সীদের জন্যও বিরল!

ওই যে, কথায় আছে না – ‘অসম্ভবকে সম্ভব করাই রজনীকান্তের কাজ!’ ওহ হ্যা, ২০০৭ সারে মুক্তি পাওয়া ‘শিবাজি’ সিনেমার সময় থেকে কিন্তু জ্যাকি চ্যানের পর রজনীই এশিয়ায় সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনয় শিল্পী।

আজো তিনি যখন হাঁটুর বয়সী নায়িকাদের সাথে পা মেলান, কিংবা প্রতাপশালী কোনো ভিলেনকে এক নিমিষে ঘায়েল করেন তখন থিয়েটারে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়, হু হু করে দর্শক আসে ছবিঘরে, শিশ বাজায়, প্রসন্ন চিত্তে ঘরে ফেরে। তাঁকে ও তাঁর জনপ্রিয়তা দেখে আজকের তরুণরাও ঈর্ষাকাতর হন – এটাই এই ভদ্রলোকের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।