জাভি সিমন্স: বার্সেলোনার ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি

বার্সেলোনার আজকের সাফল্যের পেছনে নেদারল্যান্ডসের অবদান নেহায়েত কম না। শুধু যে ইয়োহান ক্রুইফ, ইয়োহান নেসকিন্স, রোনাল্ড কোম্যান, ফ্রাঙ্ক ডি বোরের মত ডাচ কিংবদন্তি ফুটবলারেরা বার্সার ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছেন তা না, বার্সার খেলার কৌশলের বুনিয়াদ গড়ে দেয়ার পেছনেও সবচেয়ে বড় অবদান ছিল দুই ডাচের, রাইনাস মিশেলস ও ইয়োহান ক্রুইফ। ক্রুইফের হাত ধরেই প্রথম বিশ্বমঞ্চে আগমন বার্সার টিকি-টাকা স্টাইলের, পরবর্তীতে পেপ গার্দিওলার হাত ধরে যা পূর্ণতা পায়।

ক্রুইফই প্রথম আয়াক্স আমস্টারডামের আদলে বার্সাকে ইয়ুথ অ্যাকাডেমি করার পরিকল্পনা নিতে বলেছিলেন। ক্রুইফের দেয়া প্রেসক্রিপশন অনুযায়ীই নির্মিত হয় লা মাসিয়া, যা থেকে পরবর্তীতে উঠে আসেন লিওনেল মেসি, জাভি হার্নান্দেজ, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তাদের মত তারকারা। এতসব কিছু স্বত্বেও বার্সার অ্যাকাডেমিতে ডাচ যুব ফুটবলারের সংখ্যা একেবারেই হাতেগোনা। এই হাতেগোনা যে কয়েকজন আছেন, তাদের মধ্যেই অন্যতম একজন জাভি সিমন্স, যাকে এখন থেকেই ধরা হচ্ছে বার্সেলোনার ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি।

সিমন্সের নাম প্রথমবার শুনে যদি আপনার জাভি হার্নান্দেজের কথা মনে পড়ে গিয়ে থাকে, তাহলে আপনাকে অন্তত দোষ দেয়া যাবে না। বার্সা কিংবদন্তি জাভি হার্নান্দেজের নামেই যে রাখা হয়েছে সিমন্সের নাম! সিমন্সের বাবা সাবেক ডাচ ফুটবলার রেজিলিও সিমন্স বার্সেলোনার পাঁড় ভক্ত, আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে জাভি হার্নান্দেজের ভক্ত। শুধু রেজিলিও একা নন, তার স্ত্রী পেগির ও পছন্দের ফুটবলার জাভি। ব্যস, ২০০৩ সালে আমস্টারডামে জন্ম নেয়া ছেলের নাম রেখে দিলেন পছন্দের ফুটবলারের নামে!

জাভির জন্ম আমস্টারডামে হলেও বেড়ে ওঠা রোজালেস শহরে। অবসরের পর রেজিলিও এই শহরেই থিতু হন। সেখানেই ছোট্ট জাভির ফুটবল খেলা শুরু হয় দেপোর্তিভো থ্যাডার ক্লাবের হয়ে। এই ক্লাবের হয়ে খেলতে খেলতেই বার্সেলোনা স্কাউটদের নজরে পড়ে ব্লন্ডচুলো ছোট্ট এই ছেলেটি। ফলাফল, মাত্র ৭ বছর বয়সেই লা মাসিয়ায় জাভিকে ভর্তি করে নেন তৎকালীন লা মাসিয়া প্রধান গুলিয়ার্মো আমোর।

আমোর যে রত্ন চিনতে ভুল করেননি, সেটি বুঝতে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। বয়সে ছোট হলেও সিমন্সের খেলায় পরিপক্কতার ছাপ স্পষ্ট। সেরা ফুটবলার হয়ে উঠতে যা যা দরকার, তার সবই আছে জাভির মধ্যে। প্রচণ্ড পরিশ্রমী ফুটবলার, বল পায়ে না থাকলেও ছুটে বেড়ান মাঠ জুড়ে। আক্রমণ এবং রক্ষণে তার সমান পদচারণা। টেকনিক এবং ভিশন দারুণ, খেলাটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে জানেন দারুণভাবে। সিমন্সের আরেকটি প্লাস পয়েন্ট, সে একজন জাত নেতা। ক্লাবে আসার পর থেকেই অধিনায়কের আর্মব্যান্ড সিমন্সের বাহুতে। অধিনায়কের মতই খেলে তার যোগ্য প্রতিদান দিচ্ছেন সিমন্স।

২০১০-১১ মৌসুমে প্রি-বেঞ্জামিন স্কোয়াডে যোগ দেন জাভি, ওই মৌসুমেই দলকে লিগ শিরোপা জেতান। ২০১২-১৩ তে বেঞ্জামিন ‘এ’ তে আসার পর তার প্রতিভা আরও ভালোভাবে বিকশিত হতে শুরু করে। মৌসুমের শেষ ম্যাচে ৬-০ গোলে জিতে নগর প্রতিদ্বন্দ্বী এস্পানিওলের চেয়ে ২ পয়েন্ট এগিয়ে থেকে নিজ দলকে শিরোপা জেতান জাভি। এরপর কর্নেলাকে হারিয়ে কাতালান কাপ জিতে ডাবলও পূর্ণ করেন জাভি ও বেঞ্জামিন ‘এ’।

২০১৩-১৪ মৌসুমে যেদিন বার্সেলোনাকে হারিয়ে লিগ জিতল অ্যাটলেটিকো, সেদিনই অ্যালেভিন ‘সি’ এর হয়ে লিগ শিরোপা জেতেন জাভি। পরের মৌসুমে অ্যালেভিন ‘এ’ এর হয়ে আরও দুর্দান্ত জাভি ও তার টিমমেটরা। মৌসুমের ২৫ টি ম্যাচেই জিতে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয় জাভির দল। পুরো লিগ জুড়েই একছত্র আধিপত্য বজায় ছিল জাভির দলের, প্রমাণ, ২৫ ম্যাচে ১৬৪ গোল করে খেয়েছে মাত্র ১৪ টি! এই দলটিকে লা মাসিয়ার ইতিহাসেরই অন্যতম প্রতিভাবান দল হিসেবে মানা হচ্ছে।

একই মৌসুমে যুব ফুটবলের মর্যাদাপূর্ণ আসর এমআইসি ইন্টারন্যাশনাল কাপ এরও ফাইনালে পৌঁছায় অ্যালেভিন ‘সি’। ফাইনালে প্রতিদ্বন্দ্বী রিয়ালের কাছে হারলেও জাভি সিমন্স হন টুর্নামেন্টের ‘মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার’।

সিনিয়র জাভির সাথে এই জাভির খেলার স্টাইলে অবশ্য কিছুটা পার্থক্য আছে। ছোট জাভি মূলত অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার। সিনিয়র জাভিকে আদর্শ মেনেই বড় হচ্ছে জুনিয়র জাভি। নিজের মুখে সেটা জানাতেও কার্পণ্য করেনি সে, ‘আমি একবার ফিজিওর সাথে ছিলাম, তখন জাভি এলেন। আমি যখন তাঁকে বললাম আমার নামও জাভি, তিনি তখন হেসে ফেললেন। তিনিই আমার আদর্শ। আমি জানি তাঁর মত হওয়া কঠিন, কিন্তু আমি আমার সবটা দিয়ে চেষ্টা করব’।

সেই চেষ্টায় যে জাভি কোনো কমতি রাখছেন না, তা তার খেলা দেখলেই বুঝে যাওয়ার কথা। ইউটিউবে তার ভিডিওগুলো দেখলেই বোঝা যায়, কেন তাকে বার্সার ভবিষ্যতের কাণ্ডারি মনে করা হচ্ছে। বার্সার ম্যানেজমেন্টও তাদের এই রত্নকে হাতছাড়া করতে রাজি নয়। সে কারণে চেলসি থেকে জাভির জন্য বেশ কয়েকবার প্রস্তাব এলেও বার্সা তা ফিরিয়ে দিয়েছে। জাভির বাবা-মা কে বুঝিয়েছে, বার্সাতেই অপেক্ষা করছে জাভির উজ্জ্বল ক্যারিয়ার।

বার্সা ফ্যানেরাও সেই অপেক্ষাতেই আছেন। এক জাভির পর আরেক জাভির রাজত্ব দেখার অপেক্ষায়!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।