বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা গোলরক্ষক

১.

কত সালের কথা? সঠিকভাবে মনে নেই। স্মৃতির উপর নির্ভর করেই লিখছি।

খুব সম্ভবত ১৯৮৯ সালের দিকে হবে। মনে আছে তখন বাংলাদেশে ফুটবল উম্মাদনা এমন ছিল যে আমরা বাংলাদেশের লিগ চ্যাম্পিয়ন কোন দল কত বার হয়েছে সেটা লিখে হিসেব করে রাখতাম। আমার বাবা ছিলেন মোহামেডানের সমর্থক, মামা আর চাচা (যারা আমাদের সাথেই থাকতেন) ছিলেন আবাহনীর সমর্থক। পরিবারের মাঝেই তাই তর্ক লেগেই থাকতো।

আমার প্রিয় খেলোয়াড় ছিলেন সাব্বির। অন্যদিকে আসলাম, কায়সার হামিদ খুবই বিখ্যাত ছিলেন। এক একজন সেই আমলে সুপার স্টার ছিলেন। মোহামেডানে একজন নাইজেরিয়ান খেলোয়াড় খেলতেন এমেকা নামে (পরবর্তীতে উনি বিশ্বকাপও খেলেছিলেন)।

তবে আইডল বলতে সেরকম কেউ ছিল না। এত ছোট বয়সে আইডল কি সেটাই বুঝতাম না।

বুঝতে পারলাম সেই টুর্নামেন্টের পর। আইডল মানে হচ্ছে সেই মানুষ আপনি যার মতো হতে চাইবেন।

সেই টুর্নামেন্টের পর আমার গোলরক্ষক হতে ইচ্ছে করতো।

সেই সময়ে বাংলাদেশের সেরা গোলরক্ষক ছিলেন দু’জন, মোহামেডানে খেলা কানন আর আবাহনীতে খেলা মহসিন। জাতীয় দলের প্রথম পছন্দ সম্ভবত কাননই ছিলেন। কিন্তু আমার আইডল এই দুজনের কেউই ছিলেন না।

সেই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের দুটি দল খেলায় দুই দলের দুই গোলরক্ষক খেলতে পেরেছিলেন। কানন সুযোগ পেয়েছিলেন বাংলাদেশ লাল দলে আর মহসিন বাংলাদেশ সবুজ দলে।

ফাইনালে বাংলাদেশ লাল দল সুযোগ পায়। কিন্তু সেমিতেই ইনজুরির জন্য দলের মূল গোলকিপার কানন ফাইনালে খেলতে পারেনি।

ফাইনালে বাংলাদেশ লাল দল মুখোমুখি হয়েছিল দক্ষিন কোরিয়ার। যে কোন বিচারেই দক্ষিন কোরিয়া ফেভারিট ছিল। আমরা জয়ের আশা করিনি। তবে ম্যাচটা যখন টাইব্রেকারে গেল তখন ভেবেছিলাম নিশ্চিত পরাজয় হতে যাচ্ছে। কারণ দলের গোলকিপার সেলিমকে আমরা কেউই চিনি না।

সেই সেলিমই নায়ক হয়ে উঠলো তিনটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে আর হয়ে উঠলো আমার আইডল।

এখন শুনলে অনেকে হাসতে পারে যে ফুটবলে আমার প্রথম আইডল এই সেলিমই ছিলেন।

তার মতো করেই প্র্যাকটিস করতাম, গোলকিপার হতে চাইতাম। পরবর্তীতে পারিবারিক এক ঘটনার কারণে গোলকিপিংটা ছেড়ে দিতে হয়েছিল কিন্তু মনের ভেতর গোলরক্ষকের প্রতি ভালোবাসাটা রয়েই গিয়েছিল।

২.

একটা সময় বাংলাদেশে ফুটবলের উম্মাদনা কমে যেতে লাগলো। আমি নিজেও দেশিও ফুটবল নিয়ে খোজ খবর রাখা কমিয়ে দিলাম।

তবে ঐ যে, গোলকিপারের প্রতি একটা আকর্ষন ছিল। সেই সুবাধে শুনতে পেলাম একজন গোলকিপার বাংলাদেশে বেশ ভালো খেলছেন। সেটাও ২০০০ সালের কথা।

আমিনুল ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন ১৯৯৪ সালে মোহামেডানের হয়ে। তবে ক্যারিয়ারের স্বর্ণ সময়টা কাটিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের হয়ে। মাঝে দুই সিজনের জন্য ব্রাদার্স ইউনিয়নের জন্যেও খেলেছিলেন।

তবে আমিনুলের ক্যারিয়ারের আক্ষেপ হয়ে থাকবে ২০০৪ সাল। সেবার ইংলিশ ক্লাব নিউক্যাসেল ইউনাইটেডের হয়ে খেলার প্রস্তাব পেয়েও ঠিকভাবে যোগাযোগ না হওয়ায় সুযোগ হাতছাড়া হয়। ইএসপিএনের শেবি সিং বলেছিলেন, ‘আমিনুল আরো ভাল লিগে খেলার সুযোগ দাবি করে, হয়তো ইংল্যান্ডে। সঠিক পরিচর্যা পেলে আমিনুল আরো উন্নতি করতে পারতো।’

১৯৯৬ সালেই বাংলাদেশের জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ পান কিন্তু প্রথম একাদশে সুযোগ পান ১৯৯৮ সালে। তিনি ১৯৯৯ আর ২০১০ এর সাউথ এশিয়ান গেমসে  স্বর্ণ জয় করেন।

তবে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় ম্যাচ ছিল সম্ভবত ২০০৩ সালের সাফ চ্যাম্পিয়ন্স ফাইনালে মালদ্বীপের বিপক্ষে ম্যাচটি।

সেই ম্যাচে একজন সত্যিকারের নেতার মতো আমিনুল লড়াই করে ম্যাচটাকে টাইব্রেকারে নিয়ে যান, ম্যাচে অসাধারণ কয়েকটি সেভ করেন। সেই সাফ চ্যাম্পিয়ন্স টুর্নামেন্টের সেরা গোলকিপারের পুরষ্কারটাও পান আমিনুল।

এক যুগে যেমন বাংলাদেশের গোলকিপিং পজিশনটা নিয়ে মহসিন আর কাননের মধ্যে প্রতিদ্বন্ধিতা হতো ঠিক তেমনি ভাবে আমিনুলের সময়েও তার শক্ত প্রতিদ্বন্ধি আরেক গোলকিপার বিপ্লব।

তবে নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা গোলকিপার এই আমিনুলই।

বাংলাদেশের সাবেক কোচ জর্জ কোটান আমিনুলকে তার নিজের দেখা অন্যতম সেরা গোলকিপারের স্বীকৃতি দিয়েছেন।

৩.

১৯৮০ সালের আজকের দিনেই জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে ৪৮ টি ম্যাচ খেলা এই ফুটবলারের। জন্মদিনে তাকে প্রাণঢালা শুভেচ্ছা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।