‘নিষিদ্ধ’ দক্ষিণ আফ্রিকার বাসিল ডি’ অলিভিয়েরা ও বাংলাদেশ

ক্রিকেটের পাশাপাশি ফুটবলটাও খুব দারুণ খেলতে পারতেন তিনি। দক্ষিণ আফ্রিকা অশ্বেতাঙ্গ ফুটবল দলের সদস্যও ছিলেন তিনি। তবে শেষমেষ ক্রিকেটকেই বেছে নিয়েছিলেন।

বাসিল ডি অলিভিয়েরা। একজন কিংবদন্তীর গল্প বলব আজ। ঢাকার মাঠেও খেলে গেছেন তিনি। সাবেক দুই ক্রিকেটার রকিবুল হাসান ও শহীদ জুয়েলের সাথে তার একটা ছবিও পাওয়া যায়।

নিতান্তই ভুল সময়ে জন্মেছিলেন তিনি। জন্ম দক্ষিণ আফ্রিকায়। পুরোপুরি শ্বেতাঙ্গের অধিকারী না থাকায় জায়গা হয়নি দক্ষিণ আফ্রিকা দলে। এমনকি তিনি নিষিদ্ধ ছিলেন প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটেও! যখন বর্ণবাদে আক্রান্ত ছিল পুরো খেলার পৃথিবী তখন এই বর্ণবাদী গল্পের নায়ক ছিলেন এই বাসিল ডি অলিভিয়েরা।

সুযোগ হলোনা দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার। যে দেশের জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া তো দুরের কথা ঘরোয়া ক্রিকেটেও যখন তার জন্য নিষিদ্ধ, তখন কি আর সে দেশে থাকা চলে!

জন আরলট, তিনি ছিলেন তৎকালীন একজন খ্যাতনামা রেডিও ধারাভাষ্যকার। এই আরলটের পরামর্শেই দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে পাড়ি দিলেন ইংল্যান্ডে। ল্যাঙ্কাশায়ার বিভাগীয় লিগে খেলা শুরু করে পরবর্তীতে নাম লেখালেন উস্টারশায়ারে। ২ বছর না যেতেই জায়গা করে নিলেন ইংলিশ টেস্ট দলে। লর্ডসে অভিষেক ও হল ১৯৬৬ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। কিন্তু বিপত্তি হলো সেখানেই, যখন নিজ মাতৃভূমির বিপক্ষে খেলা। দক্ষিণ আফ্রিকা সফর। মাঠের বাইরে নানান রাজনৈতিক মারপ্যাচে দল থেকে বাদ বাসিল ডি অলিভিয়েরা। লোকে তাকে ‘ডলি’ নামে একটু বেশিই চিনত।

সুযোগ হয়নি দলের সঙ্গে থেকে মাতৃভূমি সফর করার। তবে সুযোগটা তখনই এল যখন টম কার্টরাইট ইনজুরিতে পড়লেন, দলে ডাক পেলেন ডলি। নাটকটি শুরু ঠিক এখান থেকেই। প্রতিপক্ষ দলে যখন দক্ষিণ আফ্রিকা দেখল তাদেরই দ্বারা নিষিদ্ধ এক ছেলে তাদের বিপক্ষে খেলবে তখন জন ভোরস্টারের দক্ষিণ আফ্রিকা শ্বেতাঙ্গ সরকার সিরিজটি বন্ধ ঘোষণা করে দিল। কাহিনীটা ঠিক এখানেই। এই ঘটনার সূত্র ধরে বর্ণবাদের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে দক্ষিণ আফ্রিকাকে নির্বাসন দেওয়া হলো।অনাদরে ফুলের কলিরা ঝরে যায়। শীতের কর্কশ থাবায় রিক্ত হয় গোলাপের সৌরভ। সুযোগের অভাবে তেমনি বিদীর্ণ হয় অসংখ্য দক্ষিণ আফ্রিকানদের হৃদয়! দক্ষিণ আফ্রিকাকে নির্বাসন দেওয়া হলো ঠিকই, তবে কপাল পুড়ল কিছু হতভাগার। কিছু দারুণ ক্রিকেটাদের ক্যারিয়ার ধংস হয়ে গেল। বাসিল ডি অলিভিয়েরা তো ইংল্যান্ডে গিয়ে আগেই নিজের নাম লিখিয়েছিলেন, কিন্তু যারা এমনটা করতে পারেননি তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোস ছিল ওই নির্বাসন। সেগুলোর স্মৃতিচারণে আজ কিছু হতভাগা ক্রিকেটারের নাম তুলে ধরব।

১৯৭০ এর নির্বাসন হবার শেষ সিরিজে ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়াকে ৪-০ তে হোয়াইটওয়াশ করল দক্ষিণ আফ্রিকা। জয়ের ব্যাবধান নগন্য ছিল না, বরং সেগুলো ছিল পাহাড়সম; ১৭০ রান, ইনিংস ও ১২৯ রান, ৩০৭ রান এবং ৩২৯ রানের ব্যাবধান!

ব্যারি রিচার্ডস। অস্ট্রেলিয়াকে হোয়াইটওয়াশ করা ঐ সিরিজে প্রায় ৭৩ গড়ে করেছিলেন ৫০৮ রান। দুইটি করে শতক আর অর্ধশতক ছিল তাঁর, খেলেছিলেন মাত্র সাতটি ইনিংস। এই ব্যাটসম্যানকে ক্যারিয়ার শেষ করতে হয়েছে ঐ চারটি টেস্টের স্মৃতি নিয়েই! ইতিহাসের অন্যতম দুর্ভাগা ব্যাটসম্যান বলা হয় তাঁকে, ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে তাঁর ৮০টি সেঞ্চুরি সেই দুর্ভাগ্যের প্রতীক হয়েই যেন সৌভাগ্যের দিকে বক্রহাসি হাসে। কিন্তু ভাগ্যের কাছে পরাস্থ তিনি।

টেস্ট ক্রিকেটের সেরা গড় ব্রাডম্যানের ৯৯.৯৪! ওই লিস্টের ৩ নম্বরে থাকা গ্রায়েম পোলকের কথা কি বলবেন? ২৩টি টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন, তাতেই সাতটি শতক আর ১১টি অর্ধশতক হাঁকিয়েছেন। কমপক্ষে ২০০০ রান করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে তাঁর উপর গড় আছে শুধু দুজনের ভোগেজ – ব্র্যাডম্যান! পোলক সেই হাতে গোণা কয়েকজন ব্যাটসম্যানদের একজন, যাঁর টেস্ট গড় ফার্স্ট ক্লাসের চাইতেও বেশি! অনভিজ্ঞ অবস্থায় খেলেই যার গড় ছিল ৬০.৯৭!  অভিজ্ঞ হয়ে খেলার সুযোগ পেলে তিনি কোথায় যেতেন কে জানে?

আর ক্লাইভ রাইস? নাহ, রাইস টেস্ট ক্রিকেট মিস করেননি, টেস্ট ক্রিকেটই এই অনন্য প্রতিভার ঝলক নিজের শতবর্ষী গায়ে মাখা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। পোলক অথবা রিচার্ডস তো তাও টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু রাইসের জীবনে সেই সুযোগটাও আসেনি। ৪৮২টি ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ খেলেছিলেন, রান করেছেন ২৬০০০ এর উপরে। সাথে যোগ করুন ফাস্ট বোলিং এ নেয়া ৯৩০ টি উইকেট। বলা হয় ক্লাইভ রাইস টেস্ট খেলার সুযোগ পেলে ইয়ান বোথাম কিংবা ইমরান খান নয়, ঐ যুগের সেরা অলরাউন্ডার হিসাবে তাঁর নামই ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকতো!

এখন তুলব বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক অন্যতম অভিভাবকের নাম। হুইল চেয়ারে বসে থেকে ভঙ্গুর নড়বড়ে বাংলাদেশ দলের কান্ডারী এডি বারলোর কথাই বা বাদ থাকবে কেন? মাত্র ৩০ টেস্টের ক্যারিয়ার। তাতেই প্রায় ৪৬ এর মতো গড়ে করেছেন আড়াই হাজার রান। ছিলেন দুর্দান্ত ফিল্ডার।

মাইক প্রক্টর? মাত্র সাত টেস্টের ক্যারিয়ার। কিন্তু শিকার করেছেন ৪১ উইকেট। প্রতিপক্ষকে নাকানি চুবানি খাইয়েছেন অসামান্য গতি দিয়ে। বোলিং এভারেজ ১৫ আর ইকোনমি রেট ২.৪৪ সেই সাক্ষ্যই তো দেয়। সাথে লোয়ার অর্ডারে নেমে ২৫ গড়ে করা ২২৬ রান যোগ করুন! কি অসামান্য বোলিং অলরাউন্ডার হবার প্রতিভাটাই না তাঁর ছিল! খেলার সুযোগ পেলে আজ ম্যাচ রেফারি হিসেবে শুধু নয়, ডেল স্টেইনদের পূর্বসূরী হিসেবে হয়তো তাঁর নামই আসতো!

দলটির অধিনায়ক আলী বাখের। এক ঝাঁক প্রতিভার নেতৃত্ব দেয়ার সকল ক্ষমতাই যে তাঁর ছিলো, তা পরবর্তীতে প্রশাসনিক দক্ষতার বহিঃপ্রকাশ দিয়েই তিনি সেটা প্রমাণ করে দিয়েছেন। আধুনিক ‘ক্রিকেট সাউথ আফ্রিকা’ গড়ে উঠার পিছনে তাঁর অবদান অসামান্য। ভাবুন তো একবার, এই দলটি যদি নিয়মিত খেলার সুযোগটা পেত তাহলে কি হতে পারতো? হয়তো প্রথম দুইটি বিশ্বকাপজয়ী হিসেবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের নাম আসতো না। হয়তো অস্ট্রেলিয়ার একচ্ছত্র আধিপত্য গোটা আশির দশক জুড়ে দেখতে হতো না। ক্রিকেট আরো রঙ পেতো, অন্যরকম থাকতো আজকের ক্রিকেট ইতিহাসটাও!

২২ বছর পর আইসিসি দক্ষিণ আফ্রিকার উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেও ততদিনে ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে বাসিল ডি অলিভিয়েরার। ইংল্যান্ডের হয়ে ৪৪ টেস্ট খেলে ৫ সেঞ্চুরী ও ১৫ ফিফটিতে ৪০.০৬ গড়ে ২৪৬৮ রান এবং বল হাতে ৪৭টি উইকেট নিয়েছেন তিনি। খেলেছেন ৪টি ওডিআই ও। ১ম শ্রেণীর ক্রিকেটে ২০ হাজারের মত রান ও ৫৫১ টি উইকেট নিয়েছেন এই কিংবদন্তী।

২০১১ সালে ওই ইংল্যান্ডেই মারা যান ডলি। তার মৃত্যুতে ক্রিকেট পাড়ায় শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। নিজ মাতৃভূমি দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে না খেললেও দক্ষিণ আফ্রিকান জনগন তাকে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটের অন্যতম নায়ক বানিয়েছে। ২০০০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার শতাব্দীর সেরা ১০ জন ক্রিকেটারের একজন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয় বাসিল ডি অলিভিয়েরার নাম। তার নামে ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার ভিতরে ‘বাসিল ডি অলিভিয়েরা ট্রফি’ নামের একটি টেস্ট সিরিজও চালু করা হয় ২০০৪ সালে।

আফ্রিকানরা এখন বাসিল ডি অলিভিয়েরার খুব কদর বুঝছে। বড়ই আফসোস লাগে ইসস তখন যদি তারা এই কদরটা বুঝতো, তাহলে দীর্ঘ ২২টি বছর তাদের নির্বাসনে থাকা লাগতোনা!

১৯৩১ সালের আজকের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন ডলি নামে খ্যাত এই অলরাউন্ডার। বাসিল ডি অলিভিয়েরা। তার জন্মদিনে তার প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। শ্রদ্ধা জানাই জন আরলটের প্রতিও।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।