বাংলাদেশের ‘অফস্পিন’ সংকট

‘ক্রিজে বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যান এসেছে, বলটা তাহলে ডানহাতি অফ স্পিনারকেই দাও’ ক্রিকেটের ৪২টি লিখিত নিয়মের বাইরে এ যেন এক অলিখিত নিয়ম। বাংলাদেশের টপ অর্ডারে পাঁচ বাঁহাতি ব্যাটসম্যান, যেকোনো অফ স্পিনারের জিভে জল এনে দেয়ার মতোই ব্যাপার। আর বেশ কয়েক বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ার একমাত্র স্পিনার তো নাথান লিঁও-ই। এবারের বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার বোলিংয়ে নাথান লিঁওই হতেন ‘তুরুপের তাস’ তা আর আশ্চর্য কি! তবে চট্টগ্রাম টেস্টের প্রথম ইনিংসে টপ অর্ডারের পাঁচটিসহ সাত উইকেট পকেটে পোরার কথা বোধহয় তিনিও ভাবেননি।

ভাবেননি এটিও, টপ অর্ডারের প্রথম চারজনকে একই ধাঁচে, এলবিডব্লিউয়ের ফাঁদে ফেলে আউট করবেন। ভাববেন কি করে, টেস্ট ক্রিকেট এমন ঘটনার যে এবারই প্রথম সাক্ষী হলো।

প্যাট কামিন্সের আগুনে স্পেল কোনমতে পার করে দিলেও পার পাননি নাথান লিঁওর সোজা বলে। বলের লাইন মিস করে ড্রেসিংরুমে তামিম ইকবাল ফিরেছিলেন সাতসকালেই। তার কিছুপরে একই ফাঁদে কাটা পড়েছেন ইমরুল কায়েস। মুখোমুখি হওয়া ১১তম বলেই সুইপ করতে গিয়ে তিনিও ড্রেসিংরুমের পথে। দিনের ১ম সেশনজুড়ে করা সৌম্যের কষ্ট-ক্লেশ বিফলেই গেলো, লাঞ্চের আগে তিনিও ফিরলেন তামিমের কার্বনকপি হয়ে। সবশেষে ফিরলেন মুমিনুল হক। গত দুসপ্তাহে ব্যাপক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময় কাটানো এ বাঁ-হাতিও ফিরলেন লিঁও’র সোজা বলেই, উইকেটের আড়াআড়ি শট খেলতে গিয়ে।

অফ স্পিনের বিপক্ষে বাঁহাতিদের দুর্বলতার কথা তো আর নাথান লায়নের অজানা নয়। আর অফ স্পিনের বিপক্ষে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে, অস্ট্রেলিয়ার ম্যানেজমেন্ট এ তথ্য গত কয়েকটি টেস্ট ঘেঁটেই বোধহয় পেয়ে গেছে।

গত এক বছরে, বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানরা সেসব অফ স্পিনারকে উইকেট দিয়ে এসেছেন যাদের লাইন-লেংথের উপরে দারুণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। যারা গতির অদলবদল আর বোলিং বৈচিত্রে পারদর্শী। বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের নিয়ে অস্ট্রেলিয়ানরা যে হোমওয়ার্ক করেই এসেছে তা মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে যায়, চট্টগ্রাম টেস্টের প্রথম ইনিংসে লায়নের বোলিং দেখে। টানা অফ স্পিনের ফাঁকে প্যাড সোজাসুজি স্পিন না করা বলগুলোর গতির অদলবদলই এনে দিয়েছে উইকেট। দিনশেষে লায়ন তো জানিয়েই দিলেন, গোটা দিনে ২৮ ওভার বোলিংয়ে তিনি কেবল চারটি বলই স্পিন করাননি, চারটি বলেই ব্যাটসম্যানরা প্যাভিলিয়নে।

এবার সিরিজে নাথান লায়ন এখন পর্যন্ত ১৬ উইকেট বাগিয়ে নিয়েছেন। যদি ভেবে থাকেন, নাথান লিঁও বাংলাদেশের ‘জুজু’ তবে বলতে হচ্ছে গোটা অফ স্পিনার প্রজাতিই এখন বাংলাদেশের জুজু। গত বছর মঈন আলী ২ টেস্টে পেয়েছিলেন ১১ উইকেট, এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে রবিচন্দ্রন অশ্বিন তার স্পিন জালে আটকেছিলেন ৬ ব্যাটসম্যানকে। এবছরের শ্রীলঙ্কা সিরিজে দিলরুয়ান পেরেরাও বগলদাবা করেছিলেন ৮ উইকেট।

আর বাংলাদেশের বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যানদের জন্য অফ স্পিন তো রীতিমতো বিভীষিকা। মঈন আলীর ১১ উইকেটের ৮টি, অশ্বিনের ৬টির চারটি আর পেরেরার আট উইকেটের ছয়জন ব্যাটসম্যানই ছিলেন বাঁ-হাতি। অফ স্পিন তো নয়, যেন মরণফাঁদ।

এবারের সিরিজেও অফ স্পিনের বিপক্ষে কোনো পরিকল্পনার ছাপ দেখা যাচ্ছে না। নাথান লায়ন যে ১৬ উইকেট দখলে নিয়েছেন, তার ১০ জনই ছিলেন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। এ তথ্য দেখে প্রশ্ন জাগতে পারে, বাঁহাতিরা অফ স্পিনে দেদারসে উইকেট বিলানোর পরও কেন এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না?

দুটি বিষয় এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। প্রথমত, দায়টা ব্যাটসম্যানদের। তারা তাদের পূর্বেকার ভুল থেকে শিখছেন না। অফ স্পিনের বিপক্ষে তাদের আলাদা করে কোনো পরিকল্পনাই নেই। বলের স্পিন হাত থেকে না পড়ে তারা পিচে পড়ার পর স্পিন পড়ার চেষ্টা করছেন।

দ্বিতীয়ত. দোষ টিম ম্যানেজমেন্টেরও কম না। তারা এত বাঁহাতির ভিড়ে মুশফিকুর রহিম, নাসির হোসেন কিংবা সাব্বির রহমানের মতো একজন ডানহাতিকে পাঠানোর চিন্তাও তারা করেননি। একজন ডানহাতি ক্রিজে আসা মানেই ভিন্ন লাইনে বল করা, এই সামান্য ব্যাপারটিই তাদের মাথায় খেলেনি।

ম্যানেজমেন্ট পাল্টা বলতে পারেন, সাব্বির আর নাসিরকে তো খেলানোই হচ্ছে দ্রুত রান তোলার জন্য। তাদের একজনকে উপরে পাঠানো হিতে বিপরীত হতে পারে। প্রমাণ তো হাতের নাগালেই, মিরপুর টেস্ট। আর সৌম্য, মুমিনুল, ইমরুল কিংবা তামিম, তারা স্বভাবতই টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান। একজন ডানহাতিকে এদের কারও আগে দেয়া মানে কোনো একজনকে তার জায়গা হতে সরে যাওয়া। দলের জন্য তা ভালো ফল বয়ে আনবে কি?

তবে মুমিনুল হককে একটু নিচে নামিয়ে মুশফিককে তার জায়গায় নিয়ে আসা যেতেই পারে বোধহয়। গত এক বছর ধরে তিনি ব্যাটিং অর্ডারে বানভাসি হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তবুও ব্যাটে রানের জোয়ারে ভাটা পড়েনি। চট্টগ্রাম টেস্টে ১ম ইনিংসে নাথান লায়নের বলে আউট হলেও এর আগে তার ব্যয় করতে হয়েছে ২০ ওভার।

আর একজন ডানহাতিই হতে পারেন নাথান লিঁওকে মোকাবেলা করার কৌশল তা প্রমাণ করছে চট্টগ্রাম টেস্টই। ১১৭ রানে পাঁচ উইকেট পড়ার পরও যে প্রথম ইনিংসে দলের রান ৩০০ ছাড়িয়েছে তার মূলে ছিলো মুশফিকের সাথে সাব্বিরের ষষ্ঠ উইকেট জুটিতে ১০৫ রান। নাথান লিঁও’র বেলায় দুজনের পরিকল্পনাও ছিলো আলাদা। মুশফিক যেন পণ করেই নেমেছিলেন, পারতপক্ষে ওর বলে রান নেবো না। ১০৫ রানের জুটিতে লায়নের মুখোমুখি হয়েছিলেন ৩৯ বল। সে ৩৯ বলে মাত্র ১৩ রান নেয়া তো তা-ই প্রমাণ করে। অন্যদিকে সাব্বির রহমানের পরিকল্পনাই যেন ছিলো, ‘আক্রমণই সেরা রক্ষণ।’ যদিওবা লিঁও’র বলেই তিনি বাজেভাবে আউট হয়েছেন তবে ১১০.৫২ স্ট্রাইক রেটে নাথান লিঁও’কে পাল্টা আঘাত করে তিনি বোধহয় টপ অর্ডারের পাঁচজনকে এটিই দেখালেন, চাইলে ওকে পাল্টা আক্রমণও করতে পারো।

দ্বিতীয় দিনশেষে এই টেস্টের চালকের আসনে রয়েছে অস্ট্রেলিয়াই। এই টেস্টে ফিরতে হলে নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে সামর্থ্যের সেরাটা দিয়েই মোকাবেলা করতে হবে অস্ট্রেলিয়ার বোলিং এটাককে। আর প্রথম ইনিংসের মতো দ্বিতীয় ইনিংসেও অস্ট্রেলিয়ার বোলিংয়ের সিংহভাগ জুড়েই থাকবেন নাথান লিঁও। আর লায়নকে মোকাবেলা করতে হলে মুশফিককে চারে পাঠিয়ে কোনো একজন বাঁহাতিকে নিচে পাঠানোর কথা ম্যানেজমেন্ট ভেবে দেখতে পারে। তবে, প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়াকে টেস্ট সিরিজ হারানোর স্বাদ উপভোগ করা যখন সুবাস ছড়াচ্ছে, তখন ব্যাটিং অর্ডারে ওলটপালট করার মতো জুয়া ম্যানেজমেন্ট খেলবে কি? ‘আক্রমণই সেরা রক্ষণ’, এ আপ্তবচন মেনে চলা সাব্বির রহমানের ইনিংসের স্মৃতি কিন্তু এখনো টাটকাই।

-ইএসপিএন ক্রিকইনফো অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।